অর্জুন উবাচ
এবং সততযুক্তা যে ভক্তাস্ত্বাং পর্যুপাসতে ।
যে চপ্যক্ষরমব্যক্তং তেষাং কে যোগবিত্তমাঃ ॥১॥
অনুবাদঃ অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন- এভাবেই নিরন্তর ভক্তিযুক্ত হয়ে যে সমস্ত ভক্তেরা য্থায্থভাবে তোমার আরাধনা করেন এবং যাঁরা ইন্দ্রিয়াতীত অব্যক্ত ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তাঁদের মধ্যে কারা শ্রেষ্ঠ যোগী।

শ্রীভগবানুবাচ
ময্যাবেশ্য মনো যে মাং নিত্যযুক্তা উপাসতে ।
শ্রদ্ধয়া পরয়োপেতাস্তে মে যুক্ততমা মতাঃ ॥২॥
অনুবাদঃ শ্রীভগবান বললেন- যাঁরা তাঁদের মনকে আমার সবিশেষ রূপে নিবিষ্ট করেন এবং অপ্রাকৃত শ্রদ্ধা সহকারে নিরন্তর আমার উপাসনা করেন, আমার মতে তাঁরাই সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী।

যে ত্বক্ষরমনির্দেশ্যমব্যক্তং পর্যুপাসতে ।
সর্বত্রগমঅচিন্তং চ কূটস্থমচলং ধ্রুবম্ ॥৩॥

সংনিয়ম্যেন্দ্রিয়গ্রামং সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ ।
তে প্রাপ্নুবন্তি মামেব সর্বভূতহিতে রতাঃ ॥৪॥
অনুবাদ (৩-৪): যাঁরা সমস্ত ইন্দ্রিয় সংযত করে, সকলের প্রতি সমভাবপন্ন হয়ে এবং সর্বভূতের কল্যাণে রত হয়ে আমার অক্ষর, অনির্দেশ্য, অব্যক্ত, সর্বত্রগ, অচিন্ত্য, কূটস্থ, অচল, ধ্রুব ও নির্বিশেষ স্বরূপকে উপাসনা করেন, তাঁরা অবশেষে আমাকেই প্রাপ্ত হন।

ক্লেশোহধিকতরস্তেষামব্যক্তাসক্তচেতসাম্ ।
অব্যক্তা হি গতির্দুঃখং দেহবদ্ভিরবাপ্যতে ॥৫॥
অনুবাদঃ যাদের মন ভগবানের অব্যক্ত নির্বেশেষ রূপের প্রতি আসক্ত, তাদের ক্লেশ অধিকতর৷ কারণ, অব্যক্তের উপাসনার ফলে দেহ্ধারী জীবদের কেবল দুঃখই লাভ হয়।

যে তু সর্বাণি কর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরাঃ ।
অনন্যেনৈব যোগেন মাং ধ্যায়ন্ত উপাসতে ॥৬॥

তেষামহং সমুদ্ধর্তা মৃত্যুসংসারসাগরাৎ ।
ভমামি ন চিরাৎ পার্থ ময্যাবেশিতচেতসাম্ ॥৭॥
অনুবাদ(৬-৭): যারা সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ করে, মৎপরায়ণ হয়ে অনন্য ভক্তিযোগের দ্বারা আমার ধ্যান করে উপাসনা করেন, হে পার্থ ! আমাতে আবিষ্টচিত্ত সেই সমস্ত ভক্তদের আমি মৃত্যুময় সংসার-সাগর থেকে অচিরেই উদ্ধার করি।

ময্যেব মন আধৎস্ব ময়ি বুদ্ধিং নিবেশয় ।
নিবসিষ্যসি ময্যেব অত ঊর্ধ্বং ন সংশয়ঃ ॥৮॥
অনুবাদঃ অতএব আমাতেই তুমি মন সমাহিত কর এবং আমাতেই বুদ্ধি অর্পণ কর। তার ফলে তুমি সর্বদাই আমার নিকটে বাস করবে, সেই সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নেই।

অথ চিত্তং সমাধাতুং ন শক্নোষি ময়ি স্থিরম্ ।
অভ্যাসযোগেন ততো মামিচ্ছাপ্তুং ধনঞ্জয় ॥৯॥
অনুবাদঃ হে ধনঞ্জয় ! যদি তুমি স্থিরভাবে আমাতে চিত্ত সমাহিত করতে সক্ষম না হও, তা হলে অভ্যাস যোগের দ্বারা আমাকে প্রাপ্ত হতে ইচ্ছা কর।

অভ্যাসেহ্প্যসমর্থোহসি মৎকর্মপরমো ভব ।
মদর্থমপি কর্মাণি কুর্বন্ সিদ্ধিমবাপ্স্যসি ॥১০॥
অনুবাদঃ যদি তুমি এমনকি অভ্যাস করতেও অসমর্থ হও, তা হলে আমার প্রতি কর্ম পরায়্ণ হও৷ আমার জন্য কর্ম করেও তুমি সিদ্ধি লাভ করবে।

অথৈতদপ্যশক্তোহসি কর্তুং মদ্ যোগমাশ্রিতঃ ।
সর্বকর্মফলত্যাগং ততঃ কুরু যতাত্মবান্ ॥১১॥
অনুবাদঃ আর যদি তাও করতে অক্ষম হও, তবে আমাতে সমস্ত কর্ম অর্পণ করে সংয্তচিত্তে কর্মের ফল ত্যাগ কর।

শ্রেয়ো হি জ্ঞানমভ্যাস্যাজ্ জ্ঞানাদ্ধ্যানং বিশিষ্যতে ।
ধ্যানাৎ কর্মফলত্যাগস্ত্যাগাচ্ছান্তিরনন্তরম্ ॥১২॥
অনুবাদঃ তুমি যদি সেই প্রকার অভ্যাস করতে সক্ষম না হও, তা হলে জ্ঞানের অনুশীলন কর। জ্ঞান থেকে ধ্যান শ্রেষ্ঠ এবং ধ্যান থেকে কর্মফল ত্যাগ শ্রেষ্ঠ, কেন না এই প্রকার কর্মফল ত্যাগে শান্তি লাভ হয়।

অদ্ধেষ্টা সর্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণ এব চ ।
নির্মমো নিরহঙ্কারঃ সমদুঃখসুখঃ ক্ষমী ॥১৩॥

সন্তুষ্টঃ সততং যোগী যতাত্মা দৃঢ়নিশ্চয়ঃ ।
ময্যর্পিতমনোবুদ্ধির্যো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ ॥১৪॥
অনুবাদ(১৩-১৪) : যিনি সমস্ত জীবের প্রতি দ্বেষশূন্য, বন্ধু-ভাবাপন্ন, কৃপালু, মমত্ববুদ্ধিশূন্য, নিরহঙ্কার, সুখ ও দুঃখে সম-ভাবাপন্ন, ক্ষমাশীল, সর্বদা সন্তুষ্ট, সর্বদা ভক্তিযোগে যুক্ত, সংযত স্বভাব, দৃঢ়সংকল্পযুক্ত এবং যাঁর মন ও বুদ্ধি সর্বদা আমাতে অর্পিত, তিনি আমার প্রিয় ভক্ত।

যস্মান্নোদ্বিজতে লোকো লোকান্নোদ্বিজতে চ যঃ ।
হর্ষামর্ষভয়োদ্বেগৈর্মুক্ত যঃ স চ মে প্রিয়ঃ ॥১৫॥
অনুবাদঃ যাঁর থেকে কেউ উদ্বেগ প্রাপ্ত হয় না, যিনি কারও দ্বারা উদ্বেগ প্রাপ্ত হন না এবং যিনি হর্ষ, ক্রোধ, ভয় ও উদ্বেগ থেকে মুক্ত, তিনি আমার অত্যন্ত প্রিয়।

অনপেক্ষঃ শুচির্দক্ষ উদাসীনো গতব্যথঃ ।
সর্বারম্ভপরিত্যাগী যো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ ॥১৬॥
অনুবাদঃ যিনি নিরপেক্ষ, শুচি, দক্ষ, উদাসীন, উদ্বেগশূন্য এবং সমস্ত কর্মের ফলত্যাগী, তিনি আমার প্রিয় ভক্ত।

যো ন হৃষ্যতি ন দ্বেষ্টি ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি ।
শুভাশুভপরিত্যাগী ভক্তিমান্ যঃ স মে প্রিয়ঃ ॥১৭॥
অনুবাদঃ যিনি প্রিয় বস্তুর প্রাপ্তিতে হৃষ্ট হন না এবং অপ্রিয় বস্তুর প্রাপ্তিতে দ্বেষ করেন না, যিনি প্রিয় বস্তুর বিয়োগে শোক করেন না, অপ্রাপ্ত ইষ্ট বস্তু আকাঙ্ক্ষা করেন না এবং শুভ ও অশুভ সমস্ত কর্ম পরিত্যাগ করেছেন এবং যিনি ভক্তিযুক্ত, তিনি আমার প্রিয় ভক্ত।

সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ তথা মানাপমানয়োঃ ।
শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু সমঃ সঙ্গবিবর্জিতঃ ॥১৮॥
অনুবাদঃ যিনি শত্রু ও মিত্রের প্রতি সমবুদ্ধি, যিনি সম্মানে ও অপমানে, শীতে ও গরমে, সুখে ও দুঃখে এবং নিন্দা ও স্তুতিতে সম-ভাবাপন্ন, যিনি কুসঙ্গ-বর্জিত, সংযতবাক্, যৎকিঞ্চিৎ লাভে সন্তষ্ট, গৃহাসক্তিশূন্য এবং যিনি স্থিরবুদ্ধি ও আমার প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত, সেই রকম ভক্ত আমার অত্যন্ত প্রিয়।

তুল্যনিন্দাস্তুতির্মৌনী সন্তুষ্টো যেন কেনচিৎ ।
অনিকেতঃ স্থিরমতির্ভক্তিমান্মে প্রিয়ো নরঃ ॥১৯॥

যে তু ধর্মামৃতমিদং যথোক্তং পর্যুপাসতে ।
শ্রদ্দধানা মৎপরমা ভক্তাস্তেহতীব মে প্রিয়াঃ ॥২০॥
অনুবাদঃ যাঁরা আমার দ্বারা কথিত এই ধর্মামৃতের উপাসনা করেন, সেই সকল শ্রদ্ধাবান মৎপরায়্ণ ভক্তগণ আমার অত্যন্ত প্রিয়।ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে ‘ভক্তিযোগো’ নাম দ্বাদশোঽধ্যায়ঃ

ভগবানকে লাভের অন্যতম উপায় হচ্ছে ভক্তি। ভক্তিধন যার আছে তিনিই ভক্ত। ভগবান ভক্তি রজ্জুতে বাধা পড়েন। তাই ভক্ত ভগবানের অতীব প্রিয়। এই ভক্তি এবং ভক্তের কথাই এই অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে বিধায় এ অধ্যায়ের নাম ভক্তিযোগ। মাত্র বিশটি শ্লোক বিশিষ্ট এ অধ্যায়ের শুরুতেই অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিকট জানতে চাইলেন, যিনি সতত যুক্ত হয়ে পরমেশ্বরের সগুণ রূপের উপাসনা করেন এবং যিনি নিরাকার অক্ষরব্রহ্মের উপাসনা করেন- এদের মধ্যে কে যোগবিত্তমা বা অধিকতর উত্তমযোগী। তদুত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন যে, আমাতে মন একাগ্র করে নিরন্তর আমার ভজন ও ধ্যানে মগ্ন হয়ে যে ভক্তগণ সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে আমার সগুণ রূপের উপাসনা করেন যোগীদের মধ্যে তারাই অতি উত্তম যোগী। অবশ্য যে পরম গুণ ইন্দ্রিয়সমূহকে বশীভূত করে মন ও বুদ্ধির অগোচরে সেই অক্ষর ব্রহ্মের উপাসনা করে থাকেন, তারাও আমাকেই লাভ করে থাকেন। সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনা পদ্ধতির তুলনামূলক আলোচনায় শ্রীকৃষ্ণকে অর্জুন শুধালেন যে, নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনা আসলে অত্যন্ত কঠিন। ধারণের জন্য এপথ অতি দুর্বোধ্য। কিন্তু সেতুলনায় ভক্তি পথ অপেক্ষাকৃত সরল। কারণ, অনাসক্তভাবে সকল কর্মই ভগবানের মনে করে কর্মসম্পাদন করাই ভক্তিপথের সাধনা। অভ্যাসের মাধ্যমে মনকে সেভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব। আর যদি অভ্যাস যোগেও কেউ অপারগ হন তবে সকল কর্মের ফলাকাংক্ষা ত্যাগ করে ভগবানের শরণাপন্ন হয়ে থাকা আরও ভাল। অতপর শ্রীকৃষ্ণ ফলাকাংক্ষা ত্যাগী ভক্তের লক্ষণ বর্ণনা করতে গিয়ে বললেন, তাঁর ভক্ত কাউকে হিংষা করেনা, তিনি সকলের প্রতি মিত্র ভাবাপন্ন, দয়ালু ও ক্ষমাবান। তিনি সমত্ববুদ্ধি সম্পন্ন ও অহংকার বর্জিত, তিনি শত্রু-মিত্র, মান-অপমান, শীত-উষ্ণ, শুভ-অশুভ, নিন্দা-স্তুতি, হর্ষ-বিষাদ ইত্যাদিতে কোন প্রভেদ করেন না। এসবই তার নিকট সমান। এহেন সমত্ববুদ্ধি সম্পন্ন ভক্তগণই তাঁর প্রিয়। অতএব, অনাসক্ত, অনহংকারী এবং সর্বত্র সমত্ব বুদ্ধিসম্পন্ন ভক্তের গুণবর্ণনের মাধ্যমেই এ অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনেছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। জয় শ্রীকৃষ্ণ ।।