মানুষ স্বভাবতই সফল ও সার্থক করে জীবন আশা করে ।কিন্তু কর্মহীন,ধৈর্যহীন,জ্ঞানহীন ,সাধনাহীন জীবনে সাফল্য ও স্বার্থকথা অর্জন করা সম্ভব হয়না।জীবনের পূর্ণতা লাভের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা জরুরি।ধর্মগ্রন্থে বলা আছে, “আত্মমোক্ষায় জগদ্ধিতায় চ” অর্থাৎ নিজের মুক্তি এবং জগতের কল্যানে আমমা ধর্ম পালন করি।তাই মানব জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে আত্মিক মুক্তি ও জগতের জন্য কল্যানকর কাজ করা ।  

পার্থিব জীবনের কর্তব্য হিসেবে সনাতন ধর্ম প্রত্যেক মানুষের সামনে চারটি লক্ষ্য রেখেছে । এদের বলা হয় পুরুষার্থ । এই চারটি পুরুষার্থ হল ধর্ম, অর্থ, কাম ও মােক্ষ । এদের মধ্যে অর্থ ও কাম হল বৈষয়িক এবং ধর্ম ও মােক্ষ হল আধ্যাত্মিক । এই চার পুরুষার্থের মধ্যে মােক্ষই হল শ্রেষ্ঠ এবং সকল সনাতন ধর্মালবম্বীর  অন্তিম কামনাই হল মােক্ষ লাভ করা । বা বলা যায় যে, প্রতিটি হিন্দুর অন্তিম গতি হল মােক্ষ । মােক্ষ শব্দের অর্থ হল মুক্তি । বিশেষ অর্থে জন্ম ও পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তি । যখন মানুষের মনে এই উপলব্ধি হয় যে, এই বিশ্ব জগতে একমাত্র ব্রহ্মই আছেন এবং আমরা যা দেখছি, যা শুনছি তা সবই এক ব্রহ্মের বিভিন্ন রূপ মাত্র  এবং সেই হিসাবে সে নিজেও ব্রহ্ম, তখন তাকে বলে ব্রহ্মজ্ঞানী বা ব্রহ্মবিদ । মানুষ ব্ৰহ্মজ্ঞানী হলে কি হয় ? মানুষ ব্রহ্মজ্ঞানী হলে সে জন্ম ও পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তি পায় । মানুষ ভোগের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে পারেনা, ত্যাগের মধ্য দিয়েই তা সম্ভব । ত্যাগ, তিতিক্ষা ও নিরন্তর সাধনার দ্বারাই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করা সম্ভব । হিন্দু ধর্ম এর থেকেও অনেক বড় কথা বলে । হিন্দু ধর্ম বলে—“ব্ৰহ্মবিদ ব্রহ্মৈব ভবতি”। অর্থাৎ, ব্রহ্মজ্ঞানী নিজেই ব্রহ্ম হয়ে যায় ।

 

মোক্ষপ্রাপ্তির জন্য ধর্মগ্রন্থে চারটি সাধন পথের নির্দেশ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে,

১।কর্মযোগ

২।জ্ঞানযোগ

৩।ভক্তিযোগ 

৪।রাজযোগ 

এই সাধন পথের যেকোন একটি সঠিকভাবে নিষ্ঠার সাথে পালন করলে একজন সাধক মোক্ষলাভ করতে পারে। তবে আধুনিক যুগের জ্ঞানযোগ ও কর্মযোগ এর পথ ভিন্ন।বিশ্বজগত ঈশ্বরের বিরাট কর্মক্ষেত্র ।এই কর্মক্ষেত্রে নানা কর্ম ও সাধনার দ্বারা জীবনে গুন ও জ্ঞান অর্জন করতে হয়।বলা হয়ে থাকে মানব জীবন কর্মেরই ফল।বর্তমান জগতে জীবন ধারনের জন্য কর্মের বিকল্প কিছু নেই।ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায়(২/৪৭) নির্দেশ দিয়েছেন মোভমুক্ত কর্ম করার। যদিও মোক্ষপ্রাপ্তির জন্য ধর্মগ্রন্থে চারটি সাধন পথের নির্দেশ রয়েছে যেকোন একটি সঠিকভাবে সাথে পালন করলে একজন সাধক মোক্ষলাভ করতে পারে।তবুও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায়(৭/১৭) জ্ঞানীকে সর্বশ্রেষ্ট বলে আখ্যায়িত করেছেন।জ্ঞান লাভে আগ্রহী ব্যক্তিদের সম্পর্কে গীতায় বলা আছে—-

 

শ্রদ্ধবান্ লভতে জ্ঞানং তৎপরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ।

জ্ঞাং লব্ধ পরাং শান্তিমচিরেণাধিগচ্ছতি।। –গীতা(৪/৩৯)

 

অর্থাৎ যিনি শ্রদ্ধাবান,একনিষ্ঠ সাধন তৎপর এবং জিতেন্দ্রিয় তিনি জ্ঞান লাভ করেন।আত্মজ্ঞাম লাভ করে শীঘ্রই তিনি পরম শান্তি লাভ করেন।

 

বৈশাষিক দর্শনেও বলা আছে, “যতোহভ্যুদয়ো নিঃশ্রেয়সিদ্ধিঃ সঃ ধর্মঃ” অর্থাৎ যা থেকে অভ্যূদয় অর্থাৎ জাগতিক কল্যান এবং নিঃশ্রেয়স অর্থাৎ মোক্ষলাভ হয় তাই ধর্ম বলে গন্য হয়।হিন্দুধর্মে আত্মমুক্তি ও জাগতিক কল্যান এতোপ্রতভাবে জরিয়ে আছে। নিজের মুক্তি ছাড়া জাগতিক কল্যান অর্থহীন তেমনি জাগতিক কল্যান না করে ব্যক্তির মুক্তি অসম্ভব।বিশ্বজগতে মানব জীবনেকে সম্পূর্ণরুপে বিকশিত করা সম্ভব কর্মের দ্বারা তেমনি সাধনার দ্বারা খুব সহজে চরম লক্ষ্য যে মোক্ষলাভ তাও অর্জন করা সম্ভব।হিন্দুধর্মে জাগতিক কল্যান ও মোক্ষলাভ করার মাধ্যমে জীবনের পূর্ণতালাভের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বিশ্ববাসীদের সামনে এই সর্বশ্রেষ্ঠ বাণী উপস্থিত করতে পেরেছে একমাত্র  হিন্দু বা সনাতন ধর্মই । হিন্দু ধর্ম মানুষকে  পশুত্ব থেকে মনুষ্যত্বে এবং সেই মনুষ্যত্ব থেকে দেবত্বে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। কাজেই একজন মানুষের কাছে শ্রেষ্ঠ বা চরম আধ্যাত্মিক প্রাপ্তিহল ব্রহ্মজ্ঞান লাভের মাধ্যমে নিজেকে মনুষ্যত্ব থেকে দেবত্বে উন্নীত করা এবং মােক্ষ বা মুক্তিলাভ করা ।