শুক্রবার সন্তোষী মায়ের আবির্ভাবের দিন বলে এইদিন এই পূজা পালিত হয়। কোনও তিথি নক্ষত্রের বিধিনিষেধ নেই। যেকোনও বয়সী নারীপুরুষ এই ব্রত পালন করতে পারেন। প্রতি শুক্রবারে উপবাস করে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র, ধূপ-দীপ জ্বালিয়ে সন্তোষী মাতার ব্রত পাঠ করতে হবে। ব্রতপালনের একটাই মূল শর্ত হল‚ যিনি পালন করবেন‚ সেই ব্রতী এদিন টকজাতীয় কিচ্ছু খেতে পারবেন না।

ভক্তিভরে যে এই ব্রত উদযাপন করবে তার সব কামনা সিদ্ধ হবে। গৃহে অর্থাভাব থাকবে না।যে সব নারী ভক্তিভরে এই ব্রত উদযাপন করে সেইসব নারী বৈধব্য যন্ত্রণা পায় না ও তাদের সকল মনােবাসনা পূর্ণ হয়। তারা সারাজীবন স্বামী-পুত্র ও পরিজনবর্গসহ সুখে-স্বাচ্ছন্দে কাল কাটায়। তাদের গৃহে অর্থাভাব হয় না। যে কোনও বয়সের পুরুষ ও নারী এই ব্রত করতে পারে।

পূজার উপকরণ 

সন্তোষী মায়ের মূর্তি বা ছবি, ব্রতকথার বই, ঘট, পানপাতা, ফুল, কর্পূর, ধূপকাঠি, প্রদীপ, ঘি বা তেলে পূর্ণ হলুদ, সিঁদুর, ঘটে রাখার জন্য ফল(নারকেল),হলুদ মেশানো আতপ চাল, ছোলা, গুড় আর কলা হল প্রসাদ।

শ্রীশ্রীসন্তোষী মাতার পূজা পদ্ধতি

মা সন্তোষীর পূজাতে টক বস্তু, আমিষ দ্রব্য প্রদান নিষেধ । সাধারণত আমিষ দ্রব্যকে তমঃ গুন সম্পন্ন আহার বলা হয় । টক পদার্থ হল রজগুনী আহার । মিষ্ট দ্রব্য হল সত্ত্ব গুনী আহার ।তাই ভক্ত গন মাকে কেবল মিষ্ট দ্রব্য ভোগে অর্পণ করবেন। মায়ের প্রসাদ গো জাতীয় প্রানীকে প্রদান করার নিয়ম আছে। প্রতি শুক্রবারে মায়ের ব্রত করার নিয়ম। মায়ের পূজোতে সরিষার তৈল নিষেধ। ঘিয়ের প্রদীপ দিতে হবে।শুক্রবারে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্রে মায়ের পূজো করতে হবে। তিথি নক্ষত্র দোষ নেই এই পূজাতে।

সাধারণত এই পূজোতে পুরোহিতের প্রয়োজন পরে না। সবাই করতে পারবেন। খেয়াল রাখবেন এই দিন গৃহে কোন সদস্য বা যিনি ব্রত পূজা করবেন- ভুলেও যেনো টক পদার্থ বা আমিষ না গ্রহণ করেন।ঘট স্থাপন করবেন বট, কাঠাল,পাকুড় পল্লব দ্বারা। আম্র পল্লব দিবেন না এর নিয়ম নেই । পূজোতে সব ফুলই গ্রহনযোগ্য। বিল্বপত্র আবশ্যক । সিঁদুরে ঘি মিশিয়ে পুত্তলিকা অঙ্কন করবেন ঘটে। গোটা ফল হিসাবে কলা দিবেন । এরপর আচমন , বিষ্ণু স্মরণ, আসন শুদ্ধি, সূর্য অর্ঘ, সঙ্কল্প করে গুরুদেব ও পঞ্চ দেবতার পূজা করে মায়ের পূজা করবেন ।ধ্যান মন্ত্র, প্রনাম মন্ত্র পাঠ করবেন।মায়ের চরণে মনের প্রার্থনা জানাবেন। পূজা শেষে মায়ের প্রসাদ গোমাতা কে অল্প দিয়ে নিজে গ্রহণ করবেন ।

এই ভাবে ১৬ শুক্রবার ব্রত করবেন । ভোগে দিবেন ভেজানো ছোলা ও আঁখের গুড়। ইচ্ছা হলে মিষ্টি ফল নিবেদন করতে পারেন । শুক্রবার যিনি ব্রত করবেন সারা দিন উপবাস থাকবেন । দুধ, ছোলা ঘিতে আলু সহিত ভেজে, মিষ্ট ফল, জল গ্রহণ করবেন । অসমর্থ হলে একবেলা উপবাস রেখে অপর বেলা আলু সেদ্ধ, ঘি, আতপ অন্ন গ্রহণ করতে পারেন । পুজা উদযাপনের দিন মায়ের কাছে একটি নারকেল ফাটিয়ে নারকেলের জল মায়ের চরণে দেবেন ।মায়ের সামনে নারকেল ফাটাবেন এক আঘাতে। ফাটানোর সময় মায়ের নামে জয়ধ্বনি দেবেন । এই ভাবে মা সন্তোষীর ব্রত করুন। দেখবেন মায়ের কৃপায় আপনার জীবন সুখে শান্তিতে ভরে যাবে । মায়ের কৃপায় সকল দুঃখ,কষ্ট,অমঙ্গল জীবন থেকে বিনষ্ট হবে।

 

ব্রতকথা

এক বণিক করিত বাস কোন এক গ্রামে। সাতপুত্র ও পত্নী রাখি গেল স্বর্গধামে।। 

ছয় ভাই কর্ম করে আনন্দিত হয়ে। অর্থ যাহা পায় তাহা আনি দেয় মায়ে।।

 ছােটছেলে রামুর ছিল বেকার জীবন।করিতে না পারে কিছু অর্থ উপার্জন।।

 সাবিত্রী নামেতে ছিল রামুর রমণী। সতী সাধ্বী পতিব্রতা স্বামী সােহাগিনী।।

 বিবিধ সুখাদ্য মাতা করিয়া রন্ধন। আগে দিত ছয় পুত্রে করিতে ভােজন।। 

ভাইদের উচ্ছিষ্ট রামুকে খেতে দেয়। বধুদের উচ্ছিষ্ট লয়ে সাবিত্রীকে দেয়।

 একদা সাবিত্রী তার স্বামীর গােচরে। সব কথা জানাইল ব্যথিত অন্তরে।। 

পরীক্ষা করিয়া রামু জানিতে পারিল। সব সত্য কথা যাহা সাবিত্রী বলিল।।

 বুঝিতে পারিল রামু অর্থ নাহি যার। এ সংসারে জন্ম বিফল হয় তার।

 বিদেশে যাইব রামু সাবিত্রীরে বলে। শুনিয়া সাবিত্রী তাহা ভাসে আঁখিজলে।।

 দেশে দেশে ঘুরি রামু এক দেশে এল। ধনী সদাগর সঙ্গে তার দেখা হল।।

রামুকে সে সদাগর চাকুরী যে দিল। রামুর বুদ্ধিতে ব্যবসা প্রচুর বাড়িল।।

 ব্যবসায় অংশীদার রামুকে করিল। ক্রমশঃ উন্নতি তার হইতে লাগিল। 

প্রত্যেক মাসেই রামু সাবিত্রীর নামেতে। পাঠাতে লাগিল টাকা আপনবাড়ীতে৷৷ 

সেই টাকা সাবিত্রী কখনাে নাহি পেত। ছয় ভাই সে টাকা গােপনে লইত।।

 ছ’ জায়ের কথামত সাবিত্রী খাটিত। তবুও সে পেট ভরে খেতে নাহি পেত। 

শাশুড়ীর অত্যাচার নাহি আর সয়। কাষ্ঠলাগি রােজ তারে বনে যেতে হয়। 

একদিন নিদ্রা তার আসে আচম্বিতে। জ্যোতির্ময়ী দেবী এক দেখিল স্বপ্নেতে।। 

বলে আমি মা সন্তোষী পূজা কর মােরে। তার ফলে দুঃখ কষ্ট সব যাবে দূরে।

 পতি ফিরে পাবে বলি অন্তর্ধান কৈল। স্বপ্নভঙ্গে সাবিত্রী যে উঠিয়া বসিল।।

 মন্দির দেখি সাবিত্রী সেই স্থানে যায়। দেখে স্বপ্নে দেখা দেবী বিরাজে তথায়। 

ব্রতবিধি জানিয়া সাবিত্রী ব্রত করে। সন্তোষী মা প্রসন্না হলেন তার পরে৷ 

হেথা স্বপ্নাদেশ দেবী করেন রামুরে। শীঘ্র করি ওরে রামু ফিরে যাও ঘরে।। 

দেবীর আদেশে রামু দোকানেতে গেল। সেই দিন লাভ তার দশগুণ হল।।

 বহু অর্থ লয়ে রামু ফিরে আসে ঘরে। ভক্তিভরে প্রণাম সে করিল মাতারে। 

পত্নীরে দেখিয়া রামু হইল বিস্মিত। পত্নীমুখে সব শুনি হইল দুঃখিত।। 

রামু ও সাবিত্রী পূজে সন্তোষী মাতারে। ধনৈশ্বর্য তাহাদের দিনে দিনে বাড়ে।

 ব্যবসা করিয়া রামু উন্নতি করিল। যথাকালে তাহাদের এক পুত্র সন্তান হল।।

 ছয় ভাই ছয় জায় মন্ত্রণা করিল। রামুকে বিপদে ফেলিবার চেষ্টা করিল।।

সত্তোষী মাতার কৃপা ছিল তার পরে। সে কারণে ক্ষতি কেহ করিতে না পারে। 

সন্তোষী মাতার ব্রত করে যেই জন।ধনে পুত্রে লক্ষ্মীলাভ করে সেই জন।।

 টক দ্রব্য শুক্রবারে কভু না খাইবে। সন্তোষী মাতার কৃপা অবশ্য পাইবে।

 সন্তোষীর ব্রতকথা হৈল সমাপন। উলুধ্বনি দাও সবে যত বামাগণ।। 

জয় জয় সন্তোষী মাতা তুমি গাে কল্যাণী। তােমার কৃপায় সব সুখী হয় জানি।

 

সোর্সঃ

  • পূজার নিয়মাবলী প্রচারে নগর চাপরাইল সার্বজনীন পূজা মন্দির,কালিগঞ্জ,ঝিনাইদাহ।
  • উইকিপিডিয়া