সনাতন ধর্মে শনি একজন দেবতা, যিনি সূর্যদেব ও ছায়াদেবীর পুত্র, এজন্য তাকে ছায়াপুত্র-ও বলা হয়। শনিদেব, মৃত্যু ও ন্যায় বিচারের দেবতা ।বিশ্ব ব্রম্মান্ডে যখন  কিছুই ছিলনা তখন শুধু ত্রিদেব ব্রম্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আর সমস্ত দেবদেবী।আর ছিল  অসুরগণ। তখন দেবতাদের সাথে অসুরদের যুদ্ধ লেগেই থাকতো ,নিজেদের স্বার্থের জন্য। এই দেবাসুর যুদ্ধ এমনভাবে প্রকট হয়েছে তা অবিশ্মরণীয়। সেই যুদ্ধের সমাপ্তির জন্য স্বয়ং মহাদেবকেএগিয়ে আসতে হলো শেষ পর্যন্ত। মহাদেবই এই যুদ্ধ শেষ করেন। সেসময় যে যার কর্ম করতো কিন্তু কর্মফল বা ন্যায় দেওয়ার জন্য কেউ ছিলনা। স্বয়ং ব্রম্মা, বিষ্ণু ,মহাদেবই দায়িত্ব পালনের দ্বায়িত্ব নিলেন । কিন্ত এভাবে আর কতদিন চলবে, এর কোন উপায় বের করতে হবে। তখন ত্রিদেব মিলে কর্মফল দাতা বা ন্যায়ের দেবতা সৃষ্টি করার পদক্ষেপ নিলেন। তখন ত্রিদেব এই সিদ্ধান্ত নিলেন তার জন্ম হবে নিরপেক্ষ সূর্য্য দেব এর ঘরে যার নাম হবে শনি। কেননা সূর্য্য দেব তার তেজ  সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন কোন  প্রকার স্বার্থ ছাড়া।শনি খুব রাগী দেবতা হিসেবে পরিচিত। কারন কর্মফল দিতে গিয়ে তাকে অনেকের রোষানলেও পরতে হয়েছে, সে জন্য তিনি অনেকের কাছে অপ্রিয়ও বটে।তবুও তিনি  ন্যায়ের পক্ষেছিলেন অঠুট । অনেকে মনে করেন শনির বক্রদৃষ্টি খুব খারাপ আর যে তার বক্রদৃষ্টির ফাঁদে পরে সেই ধ্বংস হয়ে যায়। 

 

একথা উল্লেখ্য যে,তিনি মহাদেবের কাছ থেকে বক্রদৃষ্টির বর পেয়েছিলেন, যা ব্যক্তিকে সঠিক পথে নিয়ে আসে।

যে ব্যক্তি ভালোর পথে থাকে ভালো কাজ করে শনির বক্রদৃষ্টি তার কোন ক্ষতি করেনা। আর যে ব্যক্তি খারাপের পথে চলে মন্দ কাজ করে শনির বক্রদৃষ্টি তার ক্ষতি করে এবং তাকে সঠিক পথে নিয়ে আসে। শনি দেব ন্যায় কর্মের জন্য অনেকের কাছে তিনি ভয়ংকর দেবতা। শনিদেবকে অন্যদিকে মহাদেবের আরএক রূপ বলেও বিবেচনা করা হয়। আর সে জন্য যুগে যুগে শনি দেবের পূজা করা হয়।

শনি নবগ্রহের একটি অন্যতম গ্রহ, শনি গ্রহকে গ্রহরাজ-ও বলা হয়ে থাকে।জ্যোতিষ শাস্ত্রের মতে গ্রহরাজ শনিদেবের কুদৃষ্টি অশুভ ফল নিয়ে আসে। শনিদেব কে শনিশ্চর বা শনৈশ্চর নামেও ডাকা হয় তিনি কোনো ব্যক্তির উপর রুষ্ঠ থাকলে সেই ব্যক্তির জীবনে নানা রকম সমস্যায় জর্জরিত থাকে, বাধা আসে, জীবনে নানা রকম বিপদ ঘটে৷ হয়ে যাওয়া কাজেও বাধার সম্মুখীন হতে হয়৷ জ্যোতিষ শাস্ত্রের মতে কোনো ব্যক্তি আজকের দিনে শনি দেবের পূজা করলে শনিদেব সেই ব্যক্তি প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন৷ শনিদেব সন্তুষ্ট থাকলে নানা বিপদ কেটে যাবে৷

 

শনি পূজার বিশেষ নিয়মাবলিঃ 

 

প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় শনিদেবের পূজার্চনা করার বিধান আছে। সাধারনত শনিদেবের মন্দিরে অথবা গৃহের বাইরে খোলা জায়গায় শনিদেবের পূজা হয়। নীল বা কৃষ্ণগ বর্ণের ঘট, পুষ্প, বস্ত্র, লৌহ, মাষ কলাই , কালো তিল, দুগ্ধ, গঙ্গাজল, সরষের তেল প্রভৃতি বস্তু শনিদেবের ব্রতের জন্য আবশ্যিক। এ দিন নির্জলা উপবাস বা একাহারে থেকে এই ব্রত পালন করতে হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে নিত্যকর্ম সেরে স্নান করা উচিত।সারাদিন উপবাসী থাকিয়া সন্ধ্যায় শনিদেবের কাঠের পুজোবেদির ওপর পরিষ্কার কালো রংয়ের কাপড় বিছিয়ে তার ওপর শনির প্রতিমা বা চিত্র স্থাপন করতে হবে যদি প্রতিমা বা চিত্র না-থাকে, তা হলে একটি সুপুরির দুই পিঠে শুদ্ধ ঘি ও তেলের প্রদীপ জ্বালান।

পূজার শেষে ব্রতকথা শুনিয়া নির্মাল্য প্রসাদ গ্রহণ করিবেন।শনি পূজার প্রসাদ গৃহে নেওয়া নিষেধ আছে।বাইরে দাঁড়িয়েই সেই প্রসাদ ভক্ষণ করতে হয়। আবার অন্যান্য দেবতার প্রসাদ গ্রহণ করে, অনেকে মাথায় হাত দেন। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রসাদ খেয়ে তৎক্ষণাৎ জল দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হয়।

 

পূজার  উপকরণঃ

উৎকৃষ্ট ফল ৫টি, পান, সুপারী, কালােপাড় ধুতি, লােহার আসনাঙ্গুরীয়, মধুপর্কের বাটি, মাফকলাই, কালাে তিল, নীল অপরাজিতা ফুল, নৈবেদ্য, মিষ্টান্ন, ধুপ-দীপ, সিন্নির জন্য-আটা, দুদ্ধ, গুড়, কলা, বাতাসা, কালাে মাটির ঘট বা লােহার ঘট, পুষ্প, গঙ্গাজল ও গঙ্গামুক্তিকা ইত্যাদি।

 

পূজার নিয়মঃ

আচমনাদি সম্পন্ন করে স্বস্তি বাচন ও সঙ্কল্প করে গণেশাদি পঞ্চদেবতার পূজার পর যথাবিধি ঘটস্থাপন করে  শনিদেবের পূজা করতে হয়।

প্রণাম মন্ত্র—

ওঁ নীলাঞ্জনচয়ং প্রখ্যং রবিসূতং মহাগ্রহম।

 ছায়ায়া গর্ভসূমতং বন্দে ভক্ত্যা শনৈশ্চর। 

 

এই মন্ত্র পাঠ করে অতঃপর নবগ্রহ, দশদিকপাল, ছায়া, সবণা, কালী, শিব, যম ও প্রজাপতির পূজা করে পরে শনির পঞ্চোপচারে পূজা করিবেন।

 

পূজামন্ত্র: 

ওঁ ঐং হং শ্রীং শনৈশ্চরায় নমঃ। 

 

ধ্যানমন্ত্রঃ 

ওঁ সৌরাষ্টং কাশ্যপং শূদ্রং সূর্যাস্যং চতুরঙ্গুল।

 কৃষ্ণং কৃষ্ণান্থরং গুগতং সৌরিং চতুর্ভুজ। 

উদ্ববাণংশূল ধনুহস্তং সমাহয়েৎ।

 যমাধিদৈবতং দেবং প্রজাপতি প্রত্যধিদৈবতম্। 

 

শনিদেবের ব্রতকথাঃ 

 

শ্রীহরি নামেতে এক ছিল যে ব্রাহ্মণ। নিত্য ভিক্ষা করি উদর পুরণ।। 

দিবা রাত্র কৃষ্ণনাম জপে অকপটে। অন্তরে সদাই সুখী অন্ন নাহি পেটে৷৷ 

হেনকালে তার এক পুত্র জনমিল। পূত্র মুখ দেখি দ্বিজ বিবাদে ভাসিল।।

 ভিক্ষা করি দ্বিজসেবা পুত্র রক্ষা করে। সুমঙ্গল বলি নাম রাখিল পুত্রেরে।।

 অত্যন্ত মেধাবী পুত্র সবে গুণ গায়। অল্পদিন মধ্যে শিশু শিখে সমুদয়।। 

শাস্ত্র আলােচনা করি শাস্ত্রজ্ঞ হইল। পণ্ডিত বলিয়া তারে সকলে জানিল।।

 মনে মনে সুনঙ্গল হরিকে ডাকিল। গৃহ ছাড়ি নানা তীর্থে ঘুরিতে লাগিল।। 

আচম্বিতে এক স্থানে করিল শ্রবণ। পিতা-মাতা পরলােকে করেছে গমন। 

শুনি তাহা গয়াধামে করিয়া গমন। বিষ্ণুপাদ-পদ্মে শিশু করিল অর্পণকালবশে ঘটে যাহা কে করে খণ্ডন।

 শনির দৃষ্টিতে পড়ে দ্বিজের নন্দন।ভ্রমিতে ভ্রমিতে দ্বিজ যায় বহুদুরে। শেষে উপস্থিত হয় বিদর্ভ নগরে।রাজার সভায় দ্বিজ উপস্থিত হৈল ব্রাহ্মণ দেখিয়া রাজা অভ্যর্থনা লৈ৷ 

রাজার নিকটে দ্বিজ দেয় পরিচয়। সুমঙ্গল নাম মের ওহে মহাশয়।৷ 

অতি দুঃখী হই আমি নাহি পিতা-মাতা। নানা দেশ ভ্রমি আমি থাকি যথা তথা॥ 

শ্রীবৎস রাজন বলে, চিন্তা দুর কর। আমার আশ্রয়ে থাকি মােরে কৃপা কর। 

শাস্ত্রজ্ পণ্ডিত তুমি বুঝি অনুমানে। শাস্ত্রপাঠে তুষ্ট কর সভাসদগাণে। 

দুই পুত্র আছে মাের শুন হৈব্রাহ্মণ। পড়াইব তব কাছে করিয়াছি মন।।

রাজার বাক্যেতে দ্বিজসম্ভুট হইল। রাজার আশ্রয়ে বাস করিতে লাগিল।।

 দুই রাজপুত্রে দ্বিজ অতি যত্ন করে। নিত্যই পড়ায় দ্বিজ রাজার কুমারে।। 

এইরূপে কিছুদিন বিশ্বত হইল। 

পড়ুয়া বেশেতে শনি উপস্থিত হইল। 

শনিরে জিজ্ঞাসে দ্বিজ, শুন বাছাধন। কিবা হেতু হেথা তব হয় আগমন।।

 শনি বলে, এন শাস্ত্র অধ্যয়ন তরে। দ্বিজ বলে, যত করি পড়াব তােমারে। অল্পদিন মধ্যে শনি সুপণ্ডিত হৈল। সুমঙ্গল পরিচয় জানিতে চাহিল।। 

শনি বলে, পরিচয় কিবা দিব আর। শনৈশ্চর নাম মাের সূর্যের কুমার।।

সুমঙ্গল বলে যদি দেখা দিলে মােরে। কিসে দুঃখ দূরে যাবে বল হে আমারে।। 

আমার উপরে আছে তােমার কটাক্ষ। কিসে যাবে বল প্রভু হইয়া স্বপক্ষ৷শনি বলে, ভােগকাল ছয়মাস আছে। দশদণ্ড মধ্যে যাবে না আসিবে কাছে।। 

সপ্তম দিবসে গিয়া ভগীরথী তীরে।একান্ত মনেতে দ্বিজ ভজ মুরারীরে।। 

এত বলি শনিদেব অন্তর্ধান হৈল। সুমঙ্গল আর তার দেখা না পাইল।

 শনি আজ্ঞামত দ্বিজ গিয়া গঙ্গাতীরে। নারায়ণে ভজে দ্বিজ একান্ত অন্তরে।। 

দশদণ্ড পূর্ণ হৈল মনেতে বিচারি। উঠি দাঁড়াইল দ্বিজ বলিয়া শ্রীহরি। 

কিন্তু দশদণ্ড পূর্ণ না হয় তখন তার পূর্বে চলে আসে আপন ভবন।। 

তাহা দেখি শনিদেব কৃপিত হইল। দুই রাজপুত্রে শনি হরণ করিল৷ 

পুনঃ মায়া বলে দুই শিশু মুণ্ড গড়ি।দ্বিজের নিকটে শনি যান তাড়াতাড়ি।।

 হেথা দ্বিজ চক্ষু বুজি শ্রীহরিরে স্মরে।মুণ্ড দুটি ফেলে তার উরুর উপরে।

 হেথা নিদ্রা যােগে রাজা দুঃস্বপ্ন দেখিল। পাত্রমিত্র। গঙ্গাতীরে গেল। 

দেখিয়া দ্বিজের কোলে পুত্র মুণ্ডদ্বয়। হাহাকার করি রাজা ধুলায় লুটায়।॥

 রাজাদেশে দূতগণ বাঁধে ব্ৰণেরে। শৃঙ্খলে বন্ধন করি রাখে কারাগারে।।

 কারাগারে বসি দ্বিজ কাদিতে লাগিল। বিপদহস্তা মধুসুদনে স্মরিতে লাগিল। 

অতঃপর ঘটে এক বিচিত্র ঘটন। দশদণ্ড বেলা পূর্ণ হইল যখন।

 শােকেতে কাতর রাজা ছিলেন যেখানে। হেনকালে দুই পুত্র আসিল সেখানে।।

রাজা বালে, কোথা ছিলে হৃদয়ের ধন। শয্যা পরে ছিনু পিতা করিয়া শয়ন। 

পুত্রদের বাক্যে রাজা আশ্চর্য হইল। আদ্য অন্ত কিছু তার বুঝিতে নারিল।। 

ব্রাহ্মণের কথা এবে পড়ে গেল মনে। না বুঝিয়া কত কষ্ট দিনু সে ব্রাহ্মণে৷৷

 রাজাদেশে দূত গিয়া আনিল বিপ্রেরে। জীর্ণ শীর্ণ কলেবর কাদেন কাতরে।।

 বিনয় বচনে রাজা করে তার স্তুতি। সব অপরাধ ক্ষমা কর মহামতি। 

কৃপা করি কর মাের সন্দহ ভঞ্জন। তব ক্রোড়ে কার মুণ্ড করেছি দর্শন।।

 দ্বিজ বলে, মহারাজ কিছুই না জানি। শনি কোপে কষ্ট পাই এইমাত্র মানি।

রাজা বলে, যদি পাই শনি-দরশন। সােড়শােপচারে তার করিব পূজন।। 

নৃপবাক্য শুনি দ্বিজ করিল গমন। শনির নিকটে সব করে নিবেন। 

শুনিয়া সকল কথা শনিদেব এল। শনিদেবে দেখি রাজা প্রণাম করিল। 

রাজা বলে যদি প্রভু এলে কৃপা করে। পূজার বিধান তবে বল প্রভু মােরে। 

শনি বলে, পূজাবিধি শুনহে রাজন। যেরূপে করিবে মাের পূজা আয়ােজন। 

শুদ্ধভাবে শুদ্ধমনে আমার বারেতে। করিবে আমার পূজা একান্ত মনেতে। 

নীলবস্ত্র কৃষ্ণতিল আর তৈল দিবে। মাষকলাই আর মােষ সংগ্রহ করিবে। 

কৃষ্ণবর্ণ ঘট এক করিয়া স্থাপন। পঞ্চজাতি ফল-ফুলে করিবে অর্চন।। 

এই মাের পূজাবিধি কহিলাম সার। ভক্তিই প্রধান জেনাে কি কহিব আর।। 

পূজা-শেষে ভক্তিভরে করিবে প্রণাম। নবগ্রহ স্তোত্র পাঠে লইবেক নাম। 

আমার প্রসাদ খাবে করিয়া যতন। সর্বপাপ দূরে যাবে আমার বচন। 

অভক্তি করিয়া যেবা প্রসাদ খাইবে। অল্পদিনে শমনের ভবনে সে যাবে। 

আমার পূজায় যেবা করে অনাদর। চিরকাল দুঃখ পেয়ে হইবে কাতর। 

এত বলি শনিদেব হন অদর্শন। ভক্তিভরে করে রাজা শনির পূজন। 

প্রতি শনিবারে পূজা করে নৃপবর। বিপ্রগণে দান দিয়া তুষিল বিস্তর।। 

নৃপ-পাশে সুমঙ্গল বিদায় লইয়া। শনিদেবে পূজা করে গঙ্গাতীরে গিয়া।। 

এইরূপে পূজা প্রচারিল শনিদেবে। যাহার যেমন সাধ্য সে ভাবে পূজিবে।।

 শনির মাহাত্ম্য যত কে বর্ণিতে পারে। কিঞ্চিৎ রচিত হৈল শনিদেবের বরে।।

 সর্বদা শনির পদ থাকে যার মনে। উদ্ধারে বিপদ হতে পড়িলে শমনে। 

শনির পাঁচালী যেবা রাখিবে ভবনে। কখনও না পড়ে সে বিপদ বন্ধনে।। 

শনি প্রণমিয়া যেবা নিজ কার্য্যে যায়। সমাদর করে তারে রাজার সভায়।

 স্কন্দ পুরাণের কথা অন্যথা না হয়। যথাবিধি ব্যাসবাক্য কভু মিথ্যা নয়।। 

শুদ্ধাশুদ্ধ জ্ঞানহীন বলে নিবারণ। ভূমিতে লুটিয়া বন্দি শনির চরণ।। 

এতদূরে এই গ্রন্থ সমাপন করি। শনৈশ্চর প্রীতে সবে বল হরি হরি।।

সোর্সঃ উইকিপিডিয়া