রুদ্রাক্ষ (Rudraksha) সকলের খুব পরিচিত একটা বস্তু।রুদ্রাক্ষ হল ‘এলাইওকার্পাস গণিট্রাস’ গাছের বীজ যা হাজার বছর ধরে রুদ্রাক্ষের মালা সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ বৈদ্ধ ভিক্ষু ও বাউলদেরও এটা ব্যবহার করতে দেখা যায়।ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, যে বাড়িতে নিয়মিত রুদ্রাক্ষের পুজো করা হয়, সেখানে কখনও খাদ্য, পোশাক, অর্থ এবং শস্যের ঘাটতি হয় না। এটি আধ্যাত্মিক সাধকের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।প্রাচীন মুনি-ঋষিরা রুদ্রাক্ষকে অমৃত ফলের আখ্যা দিয়েছিলেন। কারণ রুদ্রাক্ষ গাছের শিকড়, ছাল, বীজ বা রুদ্রাক্ষ ভেজানো জল, চুন মিশ্রণ, ঘষা, ক্কাথ ইত্যাদি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী সেবন করলে বা প্রলেপ দিলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি, চর্মরোগ দূর, নিঃসন্তানের সন্তান লাভ সহ নানা রোগ থেকে মুক্তিলাভ ঘটে থাকে।

 

তবে কীভাবে জন্ম হয়েছিল এই পবিত্র রুদ্রাক্ষের? সেকথা এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরাণের নানা কথা এবং গুরুত্ব অনেকেরই অজানা।  

 

শিব পুরাণে রুদ্রাক্ষের  জন্মকথার উল্লেখ আছে। রুদ্র শব্দের অর্থ হলো শিব, অক্ষ অর্থ চোখ বা চক্ষুজল।শিবের অশ্রু থেকে রুদ্রাক্ষের উদ্ভব হয়েছিল। পৌরাণিক কাহিনীর একটিতে আছে, দুর্বিনীত অসুর ত্রিপুরকে বধ করতে গিয়ে শিব দীর্ঘকাল অপলক চোখে যুদ্ধ করার কারণে তার অবসাদগ্রস্ত চোখ থেকে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা অশ্রু।এই ঘটনার পর পদ্মযোনি ব্রহ্মা (Brahma) সেই অশ্রুজলকে বৃক্ষে পরিণত হওয়ার আদেশ দেন। এরপর এই গাছটি বড় হলে তার ফল ও ফুল হতে শুরু করে। সেই ফলই রুদ্রাক্ষ নামে পরিচিত।রুদ্রাক্ষ শিবের চোখের প্রতিরূপ।শিবের অত্যন্ত প্রিয় বস্তু।তার মধ্যে বহু প্রকার শক্তি একিভুত থাকে।প্রতিটি রুদ্রাক্ষের মধ্যে শিবের প্রভাব উপস্থিত রয়েছে বলে মনে করা হয়। অবশ্য শিবের সঙ্গে সঙ্গে অন্য দেবগণেরও প্রভাব থাকে। 

বিভিন্ন রুদ্রাক্ষের রয়েছে পৃথক গুরুত্ব

সব রুদ্রাক্ষে একইরকম গুনাগুন  না থাকলেও বিশেষ বিশেষ কয়েকটি রুদ্রাক্ষে বিশেষ গুনাগুন লক্ষ্য করা যায়।রুদ্রাক্ষের ক্ষেত্রে এর মুখিতা সম্পর্কে জানা অতি প্রয়োজনীয় বিষয়। লোকিউল বা বীজকোষের বিভাজন রেখার গভীর দাগ থেকেই এর মুখ-সংখ্যা নির্নয় করা যায়। সাধারণত পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষই দেখতে পাওয়া যায় সবচে বেশি। তবে ১ থেকে শুরু করে ৩৮ মুখী পর্যন্ত রুদ্রাক্ষের সন্ধানও পাওয়া গেছে। সহজলভ্য নয় বলে ১৪ থেকে ২১ মুখী রুদ্রাক্ষের মূল্যও বেশি।

শাস্ত্রে ১ থেকে ১৪ মুখী রুদ্রাক্ষের কথা বলা আছে।গৌরীশঙ্কর রুদ্রাক্ষ দেখতে দুটি রুদ্রাক্ষ-বীজ একসঙ্গে জোড়া দেয়া মনে হয়, যাকে শিব ও পার্বতীর প্রতীক বলে মনে করা হয়। যাবতীয় নানামুখী রুদ্রাক্ষের মধ্যে সবচেয়ে দুর্লভ বোধ হয় সুশ্রী এবং গোলাকার একমুখী রুদ্রাক্ষ যা আজকাল অতিশয় দুর্লভ। এই গুণগুলি বেশি থাকে একমুখী রুদ্রাক্ষে, তাই একমুখী রুদ্রাক্ষ ভীষণ দুর্লভ। কেউ যদি সেটা সঞ্চয় করে ঠিকমত ধারণ করতে পারে তাহলে শিবের সঙ্গে সঙ্গে অন্য দেবতার আশীর্বাদ ও মহাশক্তি সেই ব্যক্তি লাভ করতে পারে।  

 

রুদ্রাক্ষের গুনাগুন সম্পর্কে বিজ্ঞান কী বলে?

রুদ্রাক্ষ সম্পর্কে প্রথম বৈজ্ঞানিক আলোচনা দেখা যায় বিগত ষাটের দশকে লস এঞ্জেলস-এর ‘সেলফ রিয়ালাইজেশান’ পত্রিকায় রুদ্রাক্ষের ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক স্বভাব সম্পর্কে। এরপর ডক্টর সুভাষ রায় বেনারস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির একটি গবেষণালব্ধ পুস্তক প্রকাশ করেন, সেখানে তিনি রুদ্রাক্ষের বিভিন্ন কার্যকারিতার দিক উম্মোচন করেন। মানব দেহের রক্ত সংবহনতন্ত্রে এর কাজ অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। এই তন্ত্র ঠিকমত কাজ না করলে দেহমনে নানা ধরনের রোগের বিস্তার শুরু হয়। রুদ্রাক্ষের চৌম্বকীয় আবেশের জন্যে দেহের কিছু ধমনী ও শিরা স্ফীত হয়ে রক্ত সঞ্চালনে সহায়তা করে।

জীবিকা ও উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা আমাদের অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারন। চাপের কারণে হৃদযন্ত্রের স্পন্দনের মাত্রা বেড়ে যায় ফলে দেহে অতিরিক্ত জীববিদ্যুৎ তৈরি হতে শুরু করে। রুদ্রাক্ষ এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎকে ধারণ করে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করে। অতএব রক্ত সংবহনে এবং হৃদযন্ত্রের স্পন্দন নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা অনেক।

সোর্সঃ উইকিপিডিয়া