লোকনাথ ব্রহ্মচারী (জন্ম : ১৭৩০ – মৃত্যু : ১৮৯০) আবার লোকনাথ বাবা নামেও পরিচিত। লোকনাথ ব্রহ্মচারী ছিলেন একজন হিন্দু ধর্মগুরু। তিনি লোকনাথ বাবা নামেও পরিচিত। জন্মাষ্টমী তিথিতেই জন্ম হয়েছিল লোকনাথ ব্রহ্মচারীর, ভক্তদের কাছে তিনি বাবা লোকনাথ নামেই তিনি পরিচিত। তাঁর বিখ্যাত বাণী ‘রণে বনে জলে জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিও, আমিই রক্ষা করিব।’ লোকনাথ ব্রহ্মচারী ১১৩৭ বঙ্গাব্দ বা ইংরেজি ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে তত্কালীন যশোহর জেলা আর বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত মহকুমার চৌরশী চাকলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম রামনারায়ণ ও মায়ের নাম কমলা দেবী। বাবা ছিলেন ধার্মিক ব্রাহ্মণ। পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান ছিলেন তিনি। লোকনাথকে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করানোর জন্য ১১ বছরে উপনয়ন দিয়ে পাশের গ্রামের ভগবান গাঙ্গুলীর হাতে তুলে দেন। এ সময় তাঁর সঙ্গী হন বাল্যবন্ধু বেনীমাধব। উপনয়ন শেষে লোকনাথ, বেনীমাধব ও ভগবান গাঙ্গুলী পদযাত্রা শুরু করেন। বিভিন্ন গ্রাম-শহর, নদ-নদী, জঙ্গল অতিক্রম করে প্রথমে কালীঘাটে এসে যোগ সাধনা শুরু করেন। এইরূপে গুরুর আদেশে বিভিন্ন স্থানে যোগ সাধনা ও ব্রত করে শেষ পর্যন্ত লোকনাথ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন।

ভ্রমণঃ
তারপর শুরু হয় দেশ ভ্রমণ। লোকনাথ পশ্চিম দিকে দিয়ে আফগানিস্তান, মক্কা, মদিনা ইত্যাদি স্থান অতিক্রম করে আটলান্টিক মহাসাগর উপকূল পর্যন্ত গমন করেছিলেন। প্রথমে হিমালয় থেকে কাবুল দেশে আসেন। সেখানে মোল্লা সাদী নামে এক মুসলমানের সঙ্গে কোরান, বেদ-সহ বিভিন্ন শাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করে ইসলামধর্মের তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেন। মক্কাদেশীয় মুসলিম জনগোষ্ঠী তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। সেখানে আবদুল গফুর নামে এক মহাপুরুষের সাথে পরিচিত হন। লোকনাথের ভাষ্যমতে যোগ-সিদ্ধ পুরুষ আব্দুল গফুরের বয়স ছিল ৪০০ বৎসর। লোকনাথ ভক্তদের বলতেন যে তিনি তিন জন ব্রাহ্মণ দেখেছেন-একজন ত্রৈলঙ্গ স্বামী, একজন মক্কার আব্দুল গফুর এবং আরেকজন তিনি নিজে। পরে তিনি বেণীমাধবকে সাথে নিয়ে উত্তরের পথে গমন করেন। তারা সুমেরু এলাকা গমনের ইচ্ছায় প্রাক-প্রস্তুতি উপলক্ষে শৈত্যপ্রধান এলাকা হিসেবে বদরিকা আশ্রমে অবস্থান করে সেখান থেকে আধুনিক পরিজ্ঞাত সীমা অতিক্রম করে উত্তরে বহুদূরে চলে যান। সেখানে সূর্যোদয় না হওয়ায় সময় নির্ণয় করা যায় নাই; তবে তারা সে পথে ২০ বার বরফ পড়তে ও গলতে দেখেছিলেন। শেষে হিমালয় শৃঙ্গে বাঁধা পেয়ে তারা পূর্ব দিকে গমন করে চীন দেশে উপস্থিত হন । তারপর উভয়ে চন্দ্রনাথে আগমন করে কিছুকাল থেকে বেণীমাধব কামাখ্যায় এবং লোকনাথ বারদী গ্রামে গমন করে বাস করতে থাকে। সে সময় থেকেই “বারদী’র ব্রহ্মচারী” হিসেবে লোকনাথ পরিচিতি পান।

লোকনাথ বাবার পুজোর উপকরণ:
• ফুল: লোকনাথ পুজোর প্রধান ফুল নীল শাপলা বা নীল শালুক এবং যে কোনো সাদা ফুল ও বেলপাতা।
• ফল: লোকনাথ বাবাকে তুষ্ট করতে চাইলে পুজোর উপাচারে তালশাঁস ও কালোজাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
• মিষ্টান্ন ভোগ: প্রয়োজন মিছরি, তালমিছরি, যে কোনও সাদা মিষ্টি।

বাবা লোকনাথকে ‘শিব লোকনাথ’ও বলা হয়, পিছনে থাকা ইতিহাস জেনে নিনঃ
গুরু শ্রী ভগবান গঙ্গোপাধ্যায়ের হাত ধরে সংসার থেকে বেরিয়ে যান। নানান ব্রত উদযাপন করে কঠোর তপস্যার জন্য চলে যান হিমালয়ে। চারিদিকে শুধু বরফ আর বরফ। বিশাল এই বরফের গুহার মধ্যে গুরু ভগবান গঙ্গোপাধ্যায় সাধনায় বসেন। কিন্তু সেই গুহা ছেড়ে মুক্ত আকাশের নীচে বরফের আসনে ধ্যানে মগ্ন হন বাবা লোকনাথ। দিন, সপ্তাহ, মাস কোথা দিয়ে সময় চলে গিয়েছিল তা কেউ বুঝতে পারেনি। বরফের মধ্যেই ধ্যানমগ্ন লোকনাথের শরীর ঢেকে যেত। যা গুরুদেব বরফের গুহার মধ্যে থেকে দেখতেন। দিন গণনার হিসেব ছিল না। তবে লোকনাথ বাবা’র শরীরে জমা বরফ নব্বই বার গলে জল হয়ে গিয়েছিল বলে দাবি তাঁর অনুগামীদের। আর এভাবেই গুরুদেব বুঝেছিলেন তাঁর নব্বইটি বছর পার করে দিয়েছেন। এর পরেই ঘটল সেই অবিস্বরনীয় সেই ঘটনা। পাহাড়ের গা বেয়ে ভোরের কাঁচা রোদ এসে পড়েছে বাবা লোকনাথের সিদ্ধাসনে। বরফের গুহার ভিতর থেকে গুরু ভগবান গঙ্গয়াপধ্যায় উঁকি দিয়ে দেখলেন সিদ্দ্বাসনে লোকনাথ বাবা নেই, সেখানে বসে আছেন দেবাদিদেব মহাদেব। গুরুদেব ভাবলেন “তাহলে কি ভুল দেখলাম?” এরপরেই তিনি বরফের গুহা থেকে বের হয়ে দেখেন সিদ্ধাসনে বাবা লোকনাথই বসে আছেন। পর-মহুর্তে দেখেন সেখানে আবার লোকনাথ বাবা নেই, বসে আছেন দেবাদিদেব মহাদেব। গুরুদেব বুঝলেন, বাবা লোকনাথ আজ সিদ্ধিলাভ করেছেন। তিনি গুরু হয়েও প্রনাম করলেন শিবকল্প মহাযোগী বাবা লোকনাথ কে…..! আর এরপর থেকে লোকমুখে প্রচার হয় শিব লোকনাথের কথা।

দুর্বল সময়ে বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী এক মাত্র ভরসা, জীবন সুন্দর নিমেষেইঃ
কঠিন সময়ে বাবা লোকনাথের শরণে আসেন অনেকেই বাবা লোকনাথ সাধারণ পরিবারেই জন্মেছেন পরবর্তীকালে কঠোর তপস্যা ও অধ্যাবসায় তিনি করুণার এক অপার রূপ ৷ বাবা লোকনাথ চাকলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেখানেই এক সাধারণ পরিবারের সাধারণ বালক হয়ে সবার প্রিয় বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীতে পরিণত হয়েছেন ৷ বাবা লোকনাথের পুজোয় যেন কোনও আড়ম্বর লাগেনা ৷ তিনি সাধারণ মানের জীবন যাপন করতে সব সময়েই পরামর্শ দিতেন ৷ বাবা লোকনাথ সব সময়েই রক্ষা করেন ৷ তিনিই প্রতিটি জীবের সব সমস্যা দূর করেন ৷ বাবা লোকনাথ দয়ার এক অন্য নাম ৷ কঠিন পরিস্থিতিতেও মানুষের জন্য জীবন বিপন্ন করার উদাহরণ রয়েছে বাবার ৷

বাবা লোকনাথের একটি আশ্চর্য প্রতিকৃতি। যার রহস্যের সমধান আজও হয়নিঃ
ভারতীয় আধ্যাত্মজগতে অন্যতম রহস্যময় ব্যক্তিত্ব লোকনাথ ব্রহ্মচারী। ‘রহস্যময়’ একারণেই যে, তাঁর সম্পর্কে তেমন বিশদ তথ্য পাওয়া যায় না। অসংখ্য অলৌকিক কাহিনি তাঁর জীবনকে ঘিরে আবর্তিত হয়। তাঁর উপদেশাবলিও খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু বাঙালির কাছে তাঁর ভাবমূর্তি নিয়ত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তাঁকে দৈব অবস্থানে বসাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি বাঙালি।

ঢাকার বারোদি গ্রামের শ্রীলোকনাথের একটি প্রতিকৃতিকে ঘিরে এমন এক রহস্যের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, যা সত্যিই রোমাঞ্চকর। বাবা লোকনাথের যে ছবিটি আমদের চোখের সামনে বিরাজ করে, তার উৎস একটি ফোটোগ্রাফ। সেই ছবিটি তুলেছিলেন দেশীয় রাজ্য ভাওয়ালের তৎকালীন রাজা। আজ থেকে ১৩০ বছর আগে সেই ফোটো থেকে একটি পেন্টিং তৈরির কথা ভাবেন রেণুকা নাগ। রেণুকাদেবী ঢাকার বিখ্যাত নাগ পরিবারের প্রেমরঞ্জন নাগের স্ত্রী। রেণুকাদেবী লোকনাথ বাবার সেই ছবিটি দেখেন, যেটি ভাওয়ালের রাজা তুলেছিলেন। সেই ছবিটি ছিল নেহাতই ছোট— মাত্র ৩ ইঞ্চি x ৫ ইঞ্চি। রেণুকাদেবী বাবার একটি বড় প্রতিকৃতি তৈরি করাতে মনস্থ করেন।

রেণুকাদেবী এর পরে ঢাকার এক প্রতিভাবান অথচ দরিদ্র শিল্পী দুর্গেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে শ্রীলোকনাথের একটি পেন্টিং আঁকার বরাত দেন। এবারেই শুরু হয় অতিলৌকিক কিছু ব্যাপার। দুর্গেশবাবু প্রথমে এ ফোর সাইজের একটি কাগজে প্রতিকৃতিটি আঁকতে শুরু করেন। সাদা কাগজে চাইনিজ ইঙ্কেই তিনি প্রাথমিক স্কেচটি করতে থাকেন। আসল প্রতিকৃতিটি তাঁর সামনে দেওয়ালে টাঙানো ছিল। স্কেচ কিছুদূর এগোনোর পরে এমন কিছু অনুভূতি দুর্গেশবাবুর হতে থাকে, যা ব্যাখ্যাতীত। তিনি জানান, আঁকতে আঁকতে তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পড়ছেন। এবং তার পরে কী ঘটছে, তিনি জানেন না।

প্রকৃতপক্ষে দুর্গেশবাবুর একটা ট্রান্সের মধ্য চলে যাচ্ছিলেন, জানালেন রেণুকাদেবীর দৌহিত্র অভিজিৎ রুদ্র। অভিজিৎবাবু বর্তমানে কলকাতার সল্টলেকের বাসিন্দা। তাঁর বক্তব্য অনুয়ায়ী, আবিষ্ট অবস্থায় দুর্গেশবাবুর হাত অবিশ্বাস্য গতিতে চলতে শুরু করে। একটি এ ফোর কাগজে বাবার মুখাবয়বটি আঁকা হয়। তাঁর শরীরের বাকি অংশ অন্য কয়েকটি এ ফোর-এ এঁকে একত্র করে পূর্ণাঙ্গ রূপ দান করা হবে ঠিক হয়। সব শেষে দুর্গেশবাবু প্রতিকৃতির চোখ আঁকবেন বলে স্থির করেছিলেন। কিন্তু চোখ আঁকতে গিয়ে বার বার বিপত্তি দেখা দেয়। চোখ আঁকতে গিয়ে তিনি অনুভব করেন, যে আবেশে তিনি পুরো ছবিটি এঁকেছেন, তা লুপ্ত হয়েছে। কিছুতেই তিনি প্রতিকৃতিতে প্রকৃত চক্ষুদান করে উঠতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের মতো করে প্রতিকৃতির চোখ আঁকেন।

নাগ পরিবারের এক প্রবীণ সদস্যকে নিয়ে এসে সেই প্রতিকৃতি দেখানো হয়। তিনি জানান, বাল্যকালে তিনি বাবা লোকনাথকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি দুর্গেশবাবুর আঁকা প্রতিকৃতির চোখের সঙ্গে বাবা লোকনাথের চোখের কোনও মিল নেই বলেন। বার বার দুর্গেশবাবু চোখ আঁকেন, বার বার সেই প্রবীণ ভদ্রলোকও হচ্ছে না বলে জানান দিতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত অবস্থায় সেই ছবি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পড়ে থাকে।

প্রায় দেড় বছর পরে এক শীতের রাতে দুর্গেশবাবু ঢাকায় বুড়িগঙ্গার ধারে একটি পার্কে বেড়াচ্ছিলেন। পার্কের দরজা দিয়ে বেরোতে গিয়ে তিনি টের পান সেটি বন্ধ এবং সামনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছেন বলে মনে হয় তাঁর। মুখ তুলে তিনি দেখতে পান, এক দীর্ঘাঙ্গ পুরুষ তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। একটি আচ্ছাদনে তাঁর মুখটি ঢাকা। ফ্রেমে সেই পুরুষ তাঁর মুখাবরণটি সরান। দুর্গেশবাবু দেখতে পান, অতি তীব্র আলোকজ্যোতিসম্পন্ন চক্ষুদ্বয় নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন স্বয়ং শ্রীলোকনাথ। দুর্গেশবাবু জ্ঞান হারান। জ্ঞান ফিরতে তিনি কারোকে আর দেখতে পাননি। এবারে তিনি একদৌড়ে রেণুকাদেবীর বাড়ি আসেন এবং দ্রুত হাতে প্রতিকৃতিতে চক্ষুদান করেন। পরের দিন সেই প্রবীণ ভদ্রেলোককে নিয়ে আসা হয়, তিনি প্রথম দর্শনেই চমকিত হন। ‘বাবা’ বলে উচ্চৈস্বরে ডেকে তিনি জ্ঞান হারান।

অভিজিৎবাবুর সল্টলেকের বাড়িতেই আজ সেই প্রতিকৃতির অধিষ্ঠান। প্রকৃতপক্ষে এটিই শ্রীলোকনাথের প্রথম পেন্টিং। তার চাইতেও বড় কথা, সত্যিই কী রয়েছে এই চোখের পিছনে? একটি মণি উর্ধ্বে আর একটি নিম্নে কেন? প্রশ্নের উত্তরে অভিজিৎবাবু জানালেন, উর্ধ্বগামী চোখটি মহাবিশ্ব এবং নিম্নমুখী চোখটি অন্তঃস্থ জগতের প্রতীক। যা সমগ্র অধ্যাত্মবাদের মূলকথা। কেউ বলেন ভাণ্ড-ব্রহ্মাণ্ড, কেউ বলেন— অ্যাজ অ্যাবভ সো বিলো। যোগদর্শন এই ম্যাক্রো-র সঙ্গে মাইক্রোকেই যুক্ত করার কথা বলে। মহাযোগী লোকনাথ কি তাঁর অতিলৌকিক দর্শন দ্বারা শিল্পী দুর্গেশবাবুকে সেই ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন সেই দিন? কে সমাধান করবে এই রহস্যের? – এবেলা, ইন্টারনেট

লোকনাথ বাবার আশীর্বাদ পেতে তিরোধান দিবসে মেনে চলুন এই নিয়মগুলি: 
আপনি কি ভগবানে বিশ্বাসী? তবে তো আজ আপনার খুবই ব্যস্ততার দিন৷ ভাবছেন তো কেন? ভাবনাচিন্তা ছেড়ে চোখ রাখুন ক্যালেন্ডারের পাতায়৷ এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আপনার ব্যস্ততার কারণ৷ হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন৷ লোকনাথ বাবার তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে পুজো৷ ভাবলেন আর পুজো করে ফেললেন, তা তো আর হবে না৷ বরং তার আগে জেনে নিন ভগবানের আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য সারাদিন কী কী করবেন? আর কোন কাজ ভুলেও করবেন না৷

প্রথমেই বলে রাখি লোকনাথ পুজোয় উপকরণ লাগে খুবই সামান্য৷ ঠিক কী কী উপকরণ প্রয়োজন সেই তালিকায় একবার চোখ বুলিয়ে নিন৷ লোকনাথ পুজোর প্রধান ফুল নীল শাপলা বা নীল শালুক এবং যে কোনো সাদা ফুল৷ বেলপাতা আনতে যেন ভুলবেন না। লোকনাথ বাবাকে তুষ্ট করতে চাইলে পুজোর উপাচারে তালশাঁস ও কালোজাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিষ্টান্ন ভোগ হিসাবে প্রয়োজন মিছরি, তালমিছরি, যে কোনও সাদা মিষ্টি।

‘রনে বনে জলে জঙ্গলে যেখানেই বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিও আমি তোমাকে রক্ষা করিব’৷ একথা বলেছিলেন শিবের অবতার বাবা লোকনাথ। তাই এই দিন সবার আগে শিবের পুজো করতে হবে। মহেশ্বরের আশীর্বাদ পেলেই বাবা লোকনাথের আশীর্বাদ পাওয়া যাবে। এই পুজোর দিন নীল শাপলা ফুল লোকনাথ বাবার চরণে দিন। মিছরি দিয়ে পুজো করার পর সেই মিছরি বাচ্চাদের দান করতে হবে। কারও জন্মকুণ্ডলীতে যদি দারিদ্রযোগ থাকে, তাহলে অবশ্যই লোকনাথ বাবার পুজো করুন। এই যোগগুলো থাকলে প্রচুর পরিমাণে আর্থিক সমস্যা দেখা দেয়। যদি লোকনাথ বাবার পুজো করা যায়, তাহলে শুভ ফল পাওয়া যাবে খুব তাড়াতাড়ি। বছরে শুধু একদিনই নয়৷ প্রতি সোমবার ‘জয় বাবা লোকনাথ, জয় ব্রহ্ম লোকনাথ, জয় শিব লোকনাথ, জয় গুরু লোকনাথ’ মন্ত্র উচ্চারণ করে লোকনাথ পুজো করুন৷ তাহলে দেখবে জীবনে চলার পথ সুগম হবে৷ সমস্ত বিপদ থেকে নিমেষেই রক্ষা পাবেন৷ পূর্ণ হবে মনোবাঞ্ছা৷

এই দিন কোন কাজগুলির মাধ্যমে লোকনাথ বাবাকে সন্তুষ্ট করে বিপদ মুক্ত হওয়া যায়:
• এই দিন সবার আগে দেবাদিদেব মহাদেবের পুজো করতে হবে। মহেশ্বররের আশীর্বাদ পেলেই বাবা লোকনাথের আশীর্বাদ পাওয়া যাবে।
• এই পুজোর দিন নীল শাপলা ফুল লোকনাথ বাবার চরণে অর্পণ করতে হবে।
• মিছরি দিয়ে পুজো করার পর সেই মিছরি বাচ্চাদের দান করতে হবে।
• কারও জন্মকুণ্ডলীতে যদি বিষযোগ, দারিদ্রযোগ বা কেন্দ্রদ্রুম যোগ থেকে থাকে, তা হলে অবশ্যই এই দিন লোকনাথ বাবার পুজো করুন। এই যোগগুলো থাকলে প্রচুর পরিমাণে আর্থিক সমস্যা দেখা দেয়। যদি লোকনাথ বাবার পুজো করা যায়, তা হলে শুভ ফল পাওয়া যাবে খুব তাড়াতাড়ি।
• জয় বাবা লোকনাথ। জয় ব্রহ্ম লোকনাথ। জয় শিব লোকনাথ। জয় গুরু লোকনাথ।
এই মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে প্রতি সোমবার যদি লোকনাথ বাবার পুজো করা যায়, তা হলে বাবার আশীর্বাদ ও সকল বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

জেনে নিন সিদ্ধপুরুষ জয় বাবা লোকনাথ এর অজানা কাহিনীঃ
হিমালয়ের পাদদেশে ভিন্ন ভিন্ন গুহায়; জঙ্গলে কঠিন সাধনায় অতিবাহিত করেন প্রায় ৪০ বছর। গুরুদেবের আদেশ ও নির্দেশ এক বাক্যে পালন করেন লোকনাথ ও বেণীমাধব; দুই ব্রহ্মচারী বন্ধু। হিমালয়ে থাকাকালীন প্রচন্ড ঠান্ডা উপেক্ষা করে; কঠিনতম তপস্যার মাধ্যমে লাভ করেন পরম সত্য। কিন্তু নিজের প্রচারবিমুখতার কারনে সেই কষ্টের কথা; কাউকে কিছু বলে যাননি। শুধু বলতেন-“মনে হয় এই বিরাট বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে আমি ওতপ্রোত হয়ে রয়েছি; আমার মধ্যেই বিরাজ করছে সমগ্র সৃষ্টি, আর সমগ্র সৃষ্টির আদি ও অন্তে আমিই শ্বাশত হয়ে রয়েছি”। তিনি বলতেন; “সমাধিস্থ অবস্থায় অবস্থানকালে কত বরফ এই শরীরের উপর জমেছে; আবার গলে বরফ হয়ে গেছে; তার খেয়াল করার মতন শরীর-মনের চেতনা তখন আমার কোথায়”।

বাবা লোকনাথ ও বেনীমাধবের বয়স যখন ৯০ তখন গুরুর বয়স ১৫০। গুরু ভগবান গাঙ্গুলীর দেহত্যাগের সময় চলে আসায়; তিনি তার দুই শিষ্যকে নিয়ে আসেন; ভারতের শ্রেষ্ট মহাযোগী তৈলঙ্গ স্বামীর কাছে। তারপর দেহত্যাগ করেন ভগবান গাঙ্গুলী। লোকনাথ ও বেণীমাধব প্রায় ২০ বছর কাটান; তৈলঙ্গ স্বামীর সঙ্গে তাঁর আশ্রমে। পৃথিবীর অনেক দেশ ভ্রমণ করে বেরান পায়ে হেঁটে। তৈলঙ্গ স্বামীর নির্দেশে – বেনীমাধবকে সঙ্গে নিয়ে বাবা লোকনাথ চলে যান তিব্বত। তিব্বত থেকে অরুনাচল; অরুনাচল থেকে আসাম। আসামেই থেকে যায় বেনীমাধব। এখানেই ১৪০ বছরের বন্ধুত্বের চিরবিদায় হয়। লোকনাথ বাবা চলে আসেন চন্দ্রনাথ পাহাড় (সীতাকুন্ডু), চট্টগ্রামে।

বাবা লোকনাথকে নিয়ে আছে অনেক গল্প। ধর্মপ্রচারক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী চন্দ্রনাথ পাহাড়ে গাছের নীচে ধ্যানমগ্ন ছিলেন; হঠাৎ চোখ খুলে দেখেন চারিদিকের আগুনের লেলিহান শিখা; প্রচন্ড ধোঁয়ায় নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অজ্ঞান হবার মুহুর্তে দেখতে পান; এক দীর্ঘদেহী উলঙ্গ মানুষ তাকে কোলে তুলে নিচ্ছেন। যখন জ্ঞান ফিরে পান দেখেন; আসে-পাশে কোন জনমানব নেই । তিনি একা পাহাড়ের নিচে শুয়ে আছেন। পরবর্তীকালে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী নামি ধর্মপ্রচারক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। ভারত এবং বাংলাদেশে তার অসংখ্য ভক্ত ছিল। তিনি যখন নারায়নগঞ্জ এর বারদী আসেন; তখন বাবা লোকনাথকে দেখে চিনতে পারেন। বুঝতে পারেন, ইনিই তার জীবন বাঁচিয়েছিলেন।

এরপর সারা ভারত এবং বাংলাদেশে প্রচারবিমুখ বাবা লোকনাথের অসামান্য যোগশক্তির কথা; প্রচার করে বেড়ান এই বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী। তখন থেকেই মানুষ বাবা লোকনাথ সম্পর্কে জানতে পারেন।

লোকনাথ বাবার বারদী আসা নিয়েও আছে গল্পঃ
সীতাকুন্ডু থেকে বাবা লোকনাথ চলে আসেন দাউদকান্দি। এখানেই পরিচয় হয় বারদী নিবাসী- ডেঙ্গু কর্মকারের সাথে। তিনি জোর করা বাবাকে নিয়ে আসেন বারদী। বাবা লোকনাথ বলেছিলেন, “ডেঙ্গু তুই আমাকে নিয়ে যেতে চাইছিস, আমি তোর সাথে যেতে প্রস্তুত, কিন্তু এই লেংটা পাগলাকে তুই কিভাবে ঘরে রাখবি। লোকে তোকে ছি ছি করবে। সহ্য করতে পারবি। ভেবে দেখ ?”। ডেঙ্গু উত্তরে বলেছিলেন; “আমি কিছু বুঝি না, আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে। লোকে যা বলে বলুক। শুধু আপনি কথা দেন – বারদী ছেড়ে কোথাও যাবেন না”।

ডেঙ্গুর সাথে বাবা লোকনাথ চলে আসেন বারদী। ছোট ছোট ছেলেরা বাবাকে পাগল ভেবে; পাথর মারতে থাকে। ডেঙ্গুর পরিবারে বাবাকে নিয়ে শুরু হয় অশান্তি। বারদীর ধনী জমিদার নাগ-পরিবার; তারা বাবাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাবা থাকার জায়গা বেছে নেন; ছাওয়াল বাঘিনীর নদীর পাড়ের শ্মশানভূমি। ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই শ্মশানভূমি। দিনের বেলায় গ্রামের মানুষ যেতে ভয় পেত। এইখানেই বাবা নিজ হাতে নিজের জন্য তৈরি করেন কুটির। যা আজ সারা বিশ্বের বাবা লোকনাথ ভক্তদের কাছে; এক মহান তীর্থভূমি। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় এই পূণ্যভূমিতে। কেঁদে, মাটিতে গড়াগড়ি খেতে খেতে; অসংখ্য মানুষ নিজেদের দুঃখের কথা জানায় বাবা লোকনাথের কাছে।

বাবা বলতেন -“ওরা বড় দুঃখী, ওরা বড় অসহায়। ছোট ছোট ওদের চাওয়া গুলো পূরণ করে দেওয়ার কেউ নেই; তাই তো ওরা আমার আছে ছুটে আসে; ওদের দুঃখের কথা; কষ্টের কথা আমাকে বলতে। ওদের দুঃখের কথা আমি শুনি বলেই; আমার কাছে ওদের যত আবদার, অধিকার। সংসারের কঠিন পথ চলতে চলতে ওরা ক্ষতবিক্ষত; ওদের বিশ্বাস আমিই ওদের দুঃখ দূর করে দিতে পারি”।

বাবার শিষ্যদের নিয়েও আছে অনেক গল্প। ফরিদপুর জেলার পালং থানার মহিসা গ্রামে রজনীকান্ত চক্রবর্তীর জন্ম। ঢাকা ওয়ারীতে তিনি ব্রহ্মচারী যোগাশ্রম প্রতিষ্টা করেন। পরে তা ফরিদাবাদে স্থানান্তর করেন। তিনি বাবা লোকনাথের স্মরণে আসেন; ১৮৮৬ থেকে ১৮৯০ সালের দিকে। বাবার একজন যোগ্য শিষ্য হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন।

বারদীর আশ্রমের কাছেই এক বৃদ্ধা, নাম-কমলা। সম্বল বলতে এক গরু ছাড়া কিছুই ছিল না। দুধ বিক্রি করে দিন চালাতেন। লোকমুখে বাবা লোকনাথের প্রশংসা শুনে; এক বাটি দুধ নিয়ে বাবাকে দেখার জন্য চলে আসেন। বাবা লোকনাথ তাঁকে মা বলে ডাকে কাছে টেনে নেন। লোকনাথ বাবা তাঁকে “মা” ডাকতেন বলে; পরবর্তীতে তিনি ‘গোয়ালিনী মা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি লোকনাথ বাবার আশ্রমেই কাটান।

ব্রহ্মানন্দ ভারতী ঢাকার বিক্রমপুরের পশ্চিমপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক নাম – তারাকান্ত গাঙ্গুলী। আইন পেশায় ও শিক্ষকতায় জড়িত ছিলেন। লোকমুখে বাবা লোকনাথের কথা শুনে; কৌতুহলবশতঃ দেখতে আসেন। পরে সমস্ত বিষয়-সম্পত্তি দান করে; বাবার আশ্রমে চলে আসেন। বাবা নতুন নামকরণ করেন-ব্রহ্মানন্দ ভারতী। তাঁর হাতেই প্রথম রচিত হয়- লোকনাথের জীবন কাহিনী ও দর্শন।

পরবর্তীতে কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক বিজয়কৃষ্ণের শিষ্যের লিখিত ” সদগুরু সঙ্গ” প্রামান্য সাধনগ্রন্থ রূপে সমাদৃত হয়। বাবা লোকনাথের অন্যতম প্রধান শিষ্য ছিলেন মথুরা মোহন চক্রবর্তী। “শক্তি ঔষধালয়” -এর প্রতিষ্টাতা। প্রথম জীবনে ঢাকার রোয়াইল গ্রামে; হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে কাজ করতে করতে আয়ুর্বেদ ঔষধের ব্যবসা শুরু করেন। ঢাকার দয়াগঞ্জে স্বামীবাগ-এ ” শক্তি ঔষধালয়ের” ভিতরে; প্রথম লোকনাথ ব্রহ্মচারীর মন্দির নির্মাণ করেন।

ব্রহ্মানন্দ ভারতীর মতন আরেক ঢাকার জজকোর্টের উকিল হরিহরণ চক্রবর্তীও; বাবার দর্শন করতে এসে বারদী থেকে যান। হরিহরণের গুরুভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে; বাবা লোকনাথ নিজের ব্যবহৃত পাদুকা দান করেন। তিনি কাশীতে বাবা লোকনাথের নামে মন্দির প্রতিষ্টা করেন।

সোনারগাঁর গোবিন্দপুর নিবাসী অখিলচন্দ্র সেন; উচ্ছৃখল জীবনযাপনে অভ্যস্ত এক জমিদার পুত্র। দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ কেন নিঃস্ব এক শ্মশানে থাকা মানুষের কাছে আসেন; তা জানার জন্য তিনি দেখতে আসেন। দূর থেকে দাড়িয়ে প্রায় মাঝে মাঝে এসে দেখে যান।

একদিন বাবার কাছাকাছি এসে নিজের অশান্তির কথা জানান। নিজের কারনে যেসব মানুষকে কষ্ট দিয়েছে; তাদের সে কষ্টের মোচন করার উপদেশ দেন লোকনাথ বাবা। অখিলচন্দ্র বাড়ি ফিরে গিয়ে; সব সম্পত্তি গ্রামের দুঃখী মানুষের নামে দান করে দেন; এবং নিঃস্ব এক কাপড়ে বাবা লোকনাথের আশ্রমে এসে উপস্থিত হন। বাবার আশীর্বাদে ও সাধনায় তিনি; “সুরথনাথ ব্রহ্মচারী” নামে খ্যাতি লাভ করেন।

বারদী নিবাসী কবিরাজ রামরতন চক্রবর্তীর ছেলে জানকীনাথ। যৌবনে দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হন । পিতা সন্তানকে আর বাঁচানোর আশা না দেখে; বাবা লোকনাথের আশ্রমে ছেলেকে দান করে যান। বাবা জানকীনাথকে বারদী আশ্রমের দেখাশুনার দায়িত্ব প্রদান করেন। গুরুকৃপায় জানকীনাথ ব্রহ্মচারী এক উচ্চ সাধক হিসাবে প্রতিষ্টিত হন। বাবার নয়নের মনি ছিলেন তিনি, অসম্ভব স্নেহ করতেন জানকীনাথকে। বাবা লোকনাথের সমাধির পাশেই সমাধিস্থ হন জানকীনাথ ব্রহ্মচারী।

বাবা লোকনাথের দেহত্যাগের পরে; ভক্তদের মনে বাবার অভাব পূরণের চেষ্টা চালিয়ে যান জানকীনাথ। কথিত আছে – বাবা দেহত্যাগের আগে; সমস্ত অলোকিক শক্তি জানকীনাথ ব্রহ্মচারীকে দান করে যান। এবং ভক্তদের বিশ্বাস ছিল যে; জানকীনাথের কাছে জানানো যে কোন আর্জি সরাসরি বাবা লোকনাথের কানে পৌঁছে যাবে। বাবার সমস্ত শিষ্যের মধ্যে; সর্বশ্রেষ্ট হলেন জানকীনাথ ব্রহ্মচারী। তাই তিনি বাবা লোকনাথের সাথে সমভাবে পূজিত হন।

একবার দুই উশৃঙ্খল যুবক আশ্রমবাসীদের অনিষ্ট করার উদ্দেশ্যে আসলে একটি বাঘ গর্জন করতে করতে আশ্রমের দিকে ছুটে আসে। বাঘের ভয়ে তারা পালিয়ে যায় আর বাঘটি ছুটে এসে লোকনাথ বাবার পায়ে লুটিয়ে পড়ে নিজের ভাষায় কী যেন বলতে থাকে। তখন বাবা বাঘটিকে পরম স্নেহভরে জঙ্গলে ফিরে যেতে বললে বাঘটি চলে যায়। আসলে মুক্ত-পুরুষগণ পশু ও মানুষে সমজ্ঞান করেন এমনকি তাঁরা পশুর ভাষাও বুঝতে পারেন। জীবনের শেষদিকে তিনি এক যক্ষ্মা-রোগীর প্রতি করুণা পরবশ হয়ে তার সমস্ত রোগ নিজ দেহে গ্রহণ করেন। ফলে ঐ রোগীটি সুস্থ হয়ে উঠেন এবং বাবার দেহে যক্ষ্মার লক্ষণ দেখা যায়।

মৃত্যু শরীরের ধর্ম। এই পরিবর্তনশীল জগতে যার জন্ম আছে তার মৃত্যু সুনিশ্চিত। আমরা বিশ্বাস করি আত্মা অবিনশ্বর। তার জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। লোকনাথ বাবা ব্রহ্মানন্দ ভারতীকে বলেছেন; “আমি মৃত্যুর সময় অতিক্রম করিয়া বাঁচিয়া রহিয়াছি। এই অবস্থায় নিদ্রা আসিলে আমার মৃত্যু ঘটিবে”।

মহাপ্রয়াণের কয়েকদিন আগে ভক্তদের কাছে প্রশ্ন করে বসেন; “বল দেখি, দেহ পতন হলে কিরূপ সৎকার হওয়া ভাল?”। এবং ভক্তদের অগ্নি দ্বারা দগ্ধ করার নির্দেশ দান করেন। বাবা লোকনাথ ১৯শে জ্যৈষ্ঠে দেহ ত্যাগ করবেন বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সেবার ১৯শে জ্যৈষ্ঠ ছিল রবিবার; সকাল হতে হাজার ভক্তের সমাগম হয় বারদীর আশ্রমে। দুঃখভারাক্রান্ত মনে গোয়ালিনী মা বাল্যভোগ তৈরি করে; নিজ হাতে খাইয়ে দেন লোকনাথ বাবাকে।

ভক্তদের কান্না শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে বাবা বলেন; “ওরে তোরা এত চিন্তায় কাতর হছিস কেন? আমি কি মরে যাব। কেবল এই জীর্ণ পুরাতন শরীরটা পাত হবে; কিন্তু আমি আছি; যেমন তোমাদের মাঝে ছিলাম; ঠিক তেমনই তোদের কাছেই থাকবো। আমার মৃত্যু নেই। তোরা ভক্তি বিশ্বাস নিয়ে আমাকে একটু আদর করে ডাকলে দেখবি; আমি তোদের কত কাছটিতে আছি; এখনও শুনছি, তখনও শুনব। এ কথা মিথ্যা হবে না”।

সকল ভক্তদের খাবার গ্রহনের নির্দেশ দিয়ে; তিনি আসন গ্রহন করেন। সময় সকাল ১১.৪৫। বেশ কিছুক্ষণ পর বাবার আর কোন নাড়াচড়া না দেখে; ভক্তগণ কান্নায় ভেঙে পড়েন। বোঝার আর বাকি থাকে না; বারদীর প্রাণপুরুষ আর নেই, শোকের ছায়া নেমে আসে বারদী আশ্রমে। সমবেত কন্ঠে তখন উচ্চারিত হয়; জয় বাবা লোকনাথ- জয় বারদীর ব্রহ্মচারী।

বাবা লোকনাথের কিছু স্মরণীয় উক্তি:
• “রনে বনে জলে জঙ্গলে যখন বিপদে পরিবে; আমাকে স্মরণ করিও আমিই রক্ষা করিব”
• “বাক্যবাণ ও বিচ্ছেদবাণ সহ্য করিতে পারিলে; মৃত্যুকেও হটাইয়া দেওয়া যায়”
• “এ আমার উপদেশের স্থল নয়, আদেশের স্থল”।
• “আমার বিনাশ নেই, শ্রাদ্ধও নেই, আমি নিত্য পদার্থ। অর্থাৎ এই ‘আমি’ হলাম গীতায় বর্ণিত ‘পরমাত্মা’”
• “দেখ-অর্থ উপার্জন করা , তা রক্ষা করা, আর তা ব্যয় করবার সময় বিষয় দু:খ ভোগ করতে হয়। অর্থ সকল অবস্থাতেই মানুষকে কষ্ট দেয়। তাই অর্থ ব্যয় হলে বা চুরি হলে তার জন্যে চিন্তা করে কোন লাভই হয় না।”
• “হস্ত দ্বারা কাম নিবারণ নারী হইতে বহুগুণশ্রেয়।”
• “সিদ্ধি(গাজা) স্বয়ং প্রভু শিবের আহার তবে আমার বারণ কিসের? তোদেরই বা কেন?”
• “গরজ করিব, কিন্তু আহাম্মক (নির্বোধ) হবি না। ক্রোধ করিব কিন্তু ক্রোধান্ধ হবি না।”
• “প্রতিদিন রাতে শোবার সময় সারাদিনের কাজের হিসাব-নিকাশ করবি অর্থাত্ ভাল কাজ কী কী করেছিস আর খারাপ কাজ কী কী করেছিস? যে সকল কাজ খারাপ বলে বিবেচনা করলি সে সকল কাজ আর যাতে না করতে হয় সেদিকে খেয়াল রাখবি।”
• “সূর্য উঠলে যেমন আঁধার পালিয়ে যায়। গৃহস্থের ঘুম ভেঙে গেলে যেমন চোর পালিয়ে যায়, ঠিক তেমনি বার-বার বিচার করলে খারাপ কাজ করবার প্রবৃত্তি পালিয়ে যাবে।”

ছবি ও তথ্যসূত্রঃ গুগল ও ইন্টারনেট