বিপদতাড়িনী

কথায় আছে “বিপদ, সে তো বলে কয়ে আসে না।” দেশের হোক বা দশের, বিপদে পড়়লে মাথায় দুঃশ্চিন্তা ছাড়া কিছুই আসে না। বিপদের সময় কিছুই যেন কাজ করতে চায় না। অনেকে বলেন হাল ছেড়ো না, বিশ্বাস রাখে। বিশ্বাস, সে নিজের ওপর হোক বা ঈশ্বরের উপর, বিপদে পড়়লে ত্রাহি ত্রাহি রব করেন সকলেই। বাংলার মঙ্গলকাব্যের পৃষ্ঠায় রয়েছে সেই বিপদের সময় মনের জোর পাওয়ার টোটকা। লোকজ দেবী মা বিপত্তারিণীর পায়ে হত্যে দিয়ে পড়়েন মা বোনেরা। হিন্দু ধর্মের ৩৩ কোটি দেবদেবীর মধ্যে কে এই বিপত্তারিণী চণ্ডী মাতা?

যিঁনি সমগ্র বিপদ থেকে রক্ষা করেন বা যিঁনি বিপদ সমূহ নাশ করেন তিনিই বিপদতারিনী । যিঁনি দুর্গা তিনিই বিপদতারিনী । তিঁনি পুরাণে কৌষিকীদেবী নামে খ্যাতা । আবার তিনিই জয়়দুর্গা । দেবীর উৎপত্তি হয়েছিলো ভগবান শিবের অর্ধাঙ্গিনী দেবী পার্বতীর কোষিকা থেকে- তাই তিনি কৌষিকী । বিপত্তারিণী হলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ডে ও ওড়িশা রাজ্য এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পূজিত এক হিন্দু দেবী। তিনি দেবী সঙ্কটনাশিনীর একটি রূপ এবং দেবী দুর্গা ১০৮ অবতারের অন্যতম। হিন্দুরা মূলত বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য এই দেবীর পূজা করেন।

বারো মাসে যত ব্রত আছে, তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিপত্তারিণী ব্রত। এই ব্রত পালন করলে জীবনে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি বজায় থাকে। শ্রী শ্রী নারদমুনি দেবাদিদেব মহাদেবকে জিজ্ঞাসা করায় উত্তর পেয়েছিলেন, আমাদের বিভিন্ন রূপের পুজো করা দেব-দেবীর মধ্যে এই ‘দুর্গে দুর্গতি নাশিনী অভয়বিনাশিনী বিপদতারিণী মা দুর্গে’, এই মা দুর্গারই একটা রূপ বিপত্তারিণী’। যে নারী ভক্তিভরে এই ব্রত পালন করেন, ভবসুন্দরী তার সব বিপদ দূর করেন। সে নারীকে কখনও বৈধব্য যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় না। মামলা, মোকদ্দমা, বিরহ যন্ত্রণা ইত্যাদি সকল বিপদ থেকে মা উদ্ধার করেন। গ্রামাঞ্চলে বিপত্তারিণী পূজা চারদিন ধরে চলে। প্রথম দিনে দেবীর “আরাধনা” (পূজা) করা হত। মেয়েরা দণ্ডী কাটে। তারপর দুই রাত্রি ধরে রাতে বাংলা লোকগান, ভজন ও কীর্তন চলে। চতুর্থ দিনে বিসর্জন হয়। বিপত্তারিণী পূজা উপলক্ষে মেয়েরা উপবাস করে। প্রথা অনুসারে হাতে “তাগা” (এক গুচ্ছ পবিত্র লাল সুতো ও দূর্বাঘাস) বাঁধে।

বিপদতাড়িনী

কখন এই ব্রত করতে হয়?

আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে জগন্নাথ দেব রথযাত্রা করেন। এই সময় সারা দেশ জুড়ে চলে গুপ্ত নবরাত্রী। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষে রথযাত্রা থেকে উল্টোরথ পর্যন্ত তৃতীয়া থেকে নবমী তিথির মধ্যে যে কোন শনিবার ও মঙ্গলবার পড়়ে সেই দিনেই বিপত্তারিণী পুজা হয়। এই ব্রত পালিত হয়। বিপত্তারিনী ব্রত পালন করা হয় সংসারকে সব বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ।

বিপদতারিনী বা বিপদনাশিনী পূজার প্রারম্ভিকতা

পুরাণ মতে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক দুই অসুরের হাতে দেবতারা পরাজিত হয়ে হিমালয়ে গিয়ে মহামায়ার স্তব করতে লাগলেন । সেই সময় ভগবতী পার্বতী সেই স্থান দিয়ে যাচ্ছিল্লেন। দেবী তাদের স্তব শুনে বললেন – “ আপনারা এখানে কার স্তব করিতেছেন ? ” সেই সময় ভগবতী পার্বতীর শরীর থেকে তার মতন দেখতে আর এক জন দেবী বের হয়ে আসলেন । সেই নব আবির্ভূতা দেবী জানালেন – “ ইহারা আমারাই স্তব করিতেছেন ।” এই দেবী যুদ্ধে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক অসুরের বধ করেছিলেন ।

দেবী মোহাচ্ছন্ন শুম্ভাসুরকে অদ্বৈত জ্ঞান দান করে বলেছিলেন- “ ঐকেবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা । পশ্যৈতা দুষ্ট ময্যেব বিশন্তো মদবিভূতয়ঃ ।। ” (এই জগতে এক আমিই আছি । আমি ছাড়া আমার সাহায্যকারিনী আর কে আছে ? ওরে দুষ্ট ভাল করে দেখ , ব্রহ্মাণী প্রভৃতি শক্তি আমারই অভিন্না বিভুতি বা শক্তি । এই দেখ তারা আমার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ।”) আর একটি পৌরাণিক গাঁথানুসারে একদা ভগবান মহাদেব রহস্যচ্ছলে দেবী পার্বতীকে ‘কালী’ বলে উপহাস করেন। এতে দেবী ক্রুদ্ধ হয়ে তপস্যার মাধ্যমে নিজের “কৃষ্ণবর্ণা” রূপ পরিত্যাগ করলেন । সেই কৃষ্ণবর্ণা স্বরূপ দেবীই হলেন , দেবীর পার্বতীর অঙ্গ থেকে সৃষ্টা জয়়দুর্গা বা কৌষিকীদেবী, বিপদতারিনীদুর্গা ।

দেবীর ধ্যান মন্ত্রঃ- ওঁ কালাভ্রাভাং কটাক্ষৈররিকুলভয়দাং মৌলীবন্ধেন্দুরেখাম্ । শঙ্খং চক্রং কৃপাণং ত্রিশিখমপি করৈরুদ্বহন্তীং ত্রিনেত্রাম্ । সিংহাস্কন্ধাধিরুঢ়াং ত্রিভুবন – মখিলং তেজসা পুরয়ন্তীম্ । ধ্যায়েদ্ দুর্গাং জয়়াখ্যাং ত্রিদশপরিবৃতাং সেবিতাং সিদ্ধিকামৈঃ ।।

এর অর্থ- কালাভ্র আভাং ( এর অর্থ দুই প্রকার হয়, একটি স্বর্ণ বর্ণা অপরটি কালো মেঘের ন্যায় ) , কটাক্ষে শত্রুকূলত্রাসিণী , কপালে চন্দ্রকলা শোভিতা, চারি হস্তে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ ও ত্রিশূল ধারিণী, ত্রিনয়না, সিংহোপরি সংস্থিতা , সমগ্র ত্রিভুবন স্বীয় তেজে পূর্ণকারিণী , দেবগণ- পরিবৃতা , সিদ্ধসঙ্ঘ সেবিতা জয়়াখ্যা দুর্গার ধ্যন করি ।

এই জয়়দুর্গা বা কৌষিকীদেবী, বিপদতারিনীদুর্গা । পঞ্চদেবতার একজন । দেবীর অনেক রূপ দেখা যায়। উত্তর ভারতে অষ্টাদশ রূপের ধ্যান ও পূজা হয়, কোথাও দশভুজা রূপে পূজা হয়, কোথাও আবার চতুর্ভুজা স্বর্ণ বর্ণা আবার কোথাও কৃষ্ণ বর্ণা রূপে পূজিতা হয় । জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে মঙ্গল ও শনিবারে মায়ের পূজো হয় ।

অন্যএক জনশ্রুতি বা ব্রতমাহাত্ম্যে পাওয়া যায়

এই ব্রতে পাঁচালি আকারে বিপত্তারিণীর কিংবদন্তিটি পাঠ করা হয়। মল্লভূম রাজ্যের (অধুনা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত বিষ্ণুপুর, খ্রিস্টীয় ৭ম থেকে ১৮শ শতাব্দী পর্যন্ত এই রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল) রানির এক সখী ছিলেন নিম্নবর্ণীয় মুচির ঘরের মেয়ে। মুচিরা মাঝে মাঝে গোমাংস খেত। এই কথা শুনে রানি খুব ভয় পেয়ে যান। কারণ, হিন্দুধর্মে গোমাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। তবে একবার কৌতূহলী হয়ে রানি গোমাংস কেমন হয় তা দেখতে চান। একদিন রানি তার সখীকে তাঁর এই ইচ্ছার কথা জানান।

সখী প্রথমে দেখাতে অস্বীকার করেন। কারণ এতে ধর্মপ্রাণ রাজা রেগে যেতে পারেন বলে তাঁর ভয় হয়। কিন্তু পরে বাধ্য হয়ে তাকে রানির অনুরোধ রাখতেই হয়। কিন্তু কেউ রাজাকে এই খবর জানিয়ে দেয়। রাজা রানিকে হত্যা করতে আসেন। রানি নিজের কাপড়ে তলায় গোমাংস লুকিয়ে রেখে দেবী দুর্গার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। রাজা এসে তাঁর কাপড় ছিঁড়ে দেখতে চান ভিতরে কি আছে। তিনি দেখেন, সেখানে একটি লাল জবা ফুল রাখা আছে। সেই থেকে আজও বিপত্তারিণী পূজা পারিবারিক সঙ্কট মোচনের জন্য হয়ে থাকে। স্থানীয় মন্দিরগুলিতে বার্ষিক বিপত্তারিণী পূজা একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। সোর্সঃ kolkata24x7.com

ব্রতের উপকরণ:

ব্রতপালনের উপকরণ সামান্য । পুজোর উপকরণের পুষ্প, ফল, ইত্যাদি। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে এই সবকিছুই ১৩টি করে নিবেদন করতে হয়। হাতে ধারণ করার লালসুতোটিতেও ১৩টি গ্যাট / গ্রন্থি দেওয়ার বিধান রয়েছে। ঘট‚ আমের পল্লব‚ শীষ সমেত ডাব‚ একটি নৈবেদ্য‚ তেরো রকম ফুল, তেরো রকম ফল (আনারস নয় ভাগ করে অবশ‍্য‌ই)‚ দু ভাগে কাটা তেরো রকম ফল । আলাদা চুবড়়িতে তেরোটা গোটা ফল‚ তেরো গাছি লালসুতো‚ তেরোটি দুর্বা‚ তেরোটি পান ও তেরোটি সুপুরি দিতে হয় । তেরো গাছি লাল কস্তাসুতো, তেরোটি পৈতা, তেরোটি লবঙ্গ, তেরোটি ছোট এলাচ, তেরোটি বড় এলাচ এবং পুজোর শেষে পুরোহিতকে যথাসাধ্য দান-ধ্যান ও দক্ষিণা দিতে হয় এবং পুজোর শেষে মন দিয়ে ব্রত কথা শুনতে হবে।

বিপত্তারিণী ব্রতের মন্ত্র:

মাসি পূণ্যতমেবিপ্রমাধবে মাধবপ্রিয়ে। ন বম্যাং শুক্লপক্ষে চবাসরে মঙ্গল শুভে। সর্পঋক্ষে চ মধ্যাহ্নেজানকী জনকালয়ে। আবির্ভূতা স্বয়ং দেবীযোগেষু শোভনেষুচ।নমঃ সর্ব মঙ্গল্যেশিবে সর্বার্থসাধিকে শরণ্যে ত্রম্বক্যে গৌরী নারায়ণী নমস্তুতে।।

বিপত্তারিনী ব্রত পালনের নিয়ম

১. ব্রতের আগের দিন নিরামিষ খাবার খেতে হয়।
২. ব্রতের দিন ফুল, মিস্টি, তেরটি লুচি, খেয়ে উপবাস ভাঙতে হয়।
৩. পূজা দিতে হয় তেরো প্রকার ফল আর তোরো প্রকার ফুল দিয়ে।
৪. লাল সুতোয় তেরোটি গাঁট ও আট পাতার দুর্বা (অষ্টদুর্বা)দিয়ে বেঁধে একটা ডুরি তৈরি করে মেয়েদের বাম হাতে ও ছেলেদের ডান হাতে বাঁধতে হয়। এটাকে সবাই মনে করেন বিপদে রক্ষাকবচ।
৫. যজমানেরা সাধ্যমতো দানদক্ষিণা দেন পুজারী ব্রাহ্মণকে।
৬. প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লা তৃতীয়া থেকে নবমী তিথির মধ্যে যে কোনও শনিবার বা মঙ্গলবার এই ব্রত পালন করা হয়।
৭. এই ব্রত শুরু করলে তিন বছর, পাঁচ বছর, নয় বছর পালন করা উচিত।
৮. ব্রতের আগের দিন নিরামিষ বা একবার হবিষ্যান্ন গ্রহণ করা উচিত।
৯. দেবী ভগবতী / মা কালী শুধু জবা ফুলেই তুষ্ট থাকেন, তাই মায়ের পুজোয় লাল জবা অতি আবশ্যক, লাল জবা ফুলের পুষ্পাঞ্জলি দ্বারাই মায়ের পুজো সম্পন্ন হয়
১০. এই ব্রতর প্রভাবে পূজারি ব্রাহ্মণকে দিয়ে ঘট স্থাপন করে হলুদ সুতো দিয়ে দুর্বা-সহ ঘটের মুখে বাঁধতে হয়। তারপর স্বস্তিবাচন করে নামগোত্র ধরে সংকল্প সৃক্ত উচ্চারণ করতে হবে। অঙ্গশুদ্ধি, করশুদ্ধি করে পঞ্চদেবতার পাদ্যার্ঘ দিয়ে পুজো করতে হবে বিপত্তারিণী রূপী দুর্গার।

লাল সূতা

গুরুত্বপূর্ণ মন্দির

১. বিপত্তারিণী মন্দির, গড়িয়া, কলকাতা
২. বিপত্তারিণী মন্দির, রাজপুর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা, পশ্চিমবঙ্গ

মা বিপত্তারিণী চণ্ডী মাতার ব্রত কথা

একদিন গঙ্গাস্নান করিবার তরে।
দেবর্ষি গমন করেন জাহ্নবীর নীড়ে।।
তথায় তীরেতে বসি দেবকণ্যাগণ।
জিজ্ঞাসিলে ঋষিবরে করিয়া দর্শন।।
বিল্বপত্র ধা্ন্য দূর্ব্বা পুষ্প রাশি রাশি।
কোথা হোতে আসি দেব যাইতেছ ভাসি।।
প্রতিদিন হেতা মোরা স্নান করি যাই।
কোনো দিন এই রূপ দেখিতে না পাই।।
ত্রিকালজ্ঞ হও তুমি ওহে ঋষিবর।
তুষ্ট কর দিয়া তুমি প্রশ্নের উত্তর।।
নারদ বলেন সবে শুন মন দিয়া।
বলিতেছি সব আমি বিস্তার করিয়া।।
সৃষ্টি স্থিতি লয় হয় কটাক্ষেতে যাঁর।
তাহার স্বরূপ বর্ণনে শক্তি আছে কার।।
অনন্ত স্বরূপ তার অনন্ত মহিমা।
কে পাইবে বল তার মহিমার সীমা।।
ভিন্ন ভিন্ন রূপ ভিন্ন পূজার বিধান।
ভিন্ন ভিন্ন রূপ দিয়া করে ভক্তে ত্রাণ।।
দুই তিন লীলা তার করিব বর্ণন।
মন দিয়া সবে তাহা করহ শ্রবণ।।
দুর্গারূপে যেই ভাবে সুরত রাজায়।
রক্ষা দেবী করে এরে বর্ণ আমি তায়।।
পরম ধার্মিক রাজা সুরত রাজন।
চন্দ্রবংশে জন্ম তিনি করেন ধারন।।
শত্রুগ তার রাজ্য করিল হরণ।
গোপনে করেন তিনি অরণ্যে গমন।।
তথায় বেধস মুনি তারে মন্ত্র দিল।
দূর্গারূপ ধ্যান করি দেবীকে তূষিল।।
তুষ্ট হয়ে নৃপতিকে দিলা দেবী বর।
বর পেয়ে রাজা অতি প্রফুল্ল অন্তর।।
নিজ শত্রুগণে করি সমূলে সংহার।
নষ্ট রা্জ্য পাইলেন তিনি পুনর্ব্বার।।
মঙ্গলচন্ডীকার রূপ করিয়া ধারন।
যে লীলা করিলা দেবী শুনহ এখন।।
সদাগর ছিল এক নাম ধণপতি।
লহনা খুল্লনা তার দুইতি যুবতী।।
খুল্লনার প্রতি স্বামী ছিল পতিকূল।
স্বামীর ভয়েতে ধণী সর্বদা ব্যাকুল।।
মঙ্গলচন্ডীকা দেবী করি আরাধন।
স্বামীকে আপন বশে করে আনয়ন।।
তৎপর বাণি্জ্যে যাত্রা করে সওদাগর।
খুল্লনাকে বলে তথা আসিতে সত্বর।।
দেবীর পূজায় ছিল খুল্লনা তখন।
আসিতে পারিল না সে ত্বরা সে কারণ।।
সদাগর যেয়ে তথা বিলম্ব দেখিয়া।
ভাঙ্গিঁল দেবীর ঘট ক্রোধে দন্ড দিয়া।।
বাণিজ্যে যাইয়া কষ্ট বিস্তর পাইল।
খুল্লনার পূ্ণ্যফলে প্রাণেতে বাঁচিল।।
হেথায় খুল্লনা ল’য়ে ভাঙ্গাঁ ঘট শিরে।
দেবীর নিকট ক্ষমা চাহে সকাতরে।।
বহু বর্ষ সদাগর আসিল না দেশ।
খুল্লনা দেবীর পূজা করি সবিশেষ।।
শ্রীমন্ত বালক পুত্রে নৌকা আরোহণে।
পাঠাইয়া দিল স্বীয় পিতৃ অন্বেষণে।।
সেও বহুতর কষ্ট বিদেশে পাইয়া।
জণনী পূণ্যে ফিরে পিতাকে পাইয়া।।
দেবীর চরিত্র অন্য করিব ব্যাখ্যান।
শ্রবণ করহ তাহা সবে দিয়া কান।।
বৃন্দাবনে কাত্যায়ণী রূপে তার স্থিতি।
পুন্যাত্মা হয় পূজি ব্রজের যুবতী।।
কৃষ্ণ যাতে পতি হন এ কামনা করি।
কাত্যায়ণী ব্রত করে ব্রজের কুমারী।।
একমাস যমুনায় করে পাতঃস্নান।
তীরে উঠি দেবী মূর্তি করিয়া নির্ম্মাণ।।
অগুরু চন্দন আদি সুগন্ধি সকল।
বিবিধ প্রকার মিষ্ট নানাবিধ ফল।।
দেবীর পূজায় সব করিয়া অর্পন।
দেবীর ধ্যানে সবে হয় নিমগন।।
তারপর হবিষ্যান্ন করিয়া সকলে।
রাত্রিতে শয়ন করি থাকয়ে ভূতলে।।
এরূপ কঠিন ব্রত করে একমাস।
তাহাতে সম্পূর্ণ হয় সকলের আশ।।
সবাকারে বর দিল শ্রীনন্দন।
অচিরে সবার হবে বাসনা পূরণ।।
এইরূপ নানা স্থানে ধরি রূপ নানা।
পূর্ণ করে মহাদেবী ভক্তের বাসনা।।
দেবর্ষী বলেন শুন দেবকণ্যাগণ।
হইল দেবীর তিন লীলা বর্ণন।।
তাঁহার অনন্ত লীলা অনন্ত মহিমা।
অনন্ত বলিয়া যার না পাইল সীমা।।
বিপদ্-তারিণী ব্রত হয় যে প্রকার।
এখন বর্ণিব সেই লীলা চমৎকার।।
একদিন নানা স্থানে করিয়া ভ্রমণ।
উপণীত হইলাম কৈলাস ভুবন।।
দেখিলাম হর গৌরী বসি একাসন।
নানাবিধ তত্ব কথা করে আলাপন।।
হেনকালে পদ্মা আসি জিজ্ঞাসিল মায়।
বল দেবী কি কারণে সকলে তোমায়।।
বিপদ্-তারিণী নামে অভিহিত করে।
তোমাকে পূজিয়া কার দুঃখ গেল দূরে।।
পদ্মার মুখের প্রশ্ন শুনি ভগবতী।
বলিতে লাগিল তবে শঙ্করের প্রতি।।
দেখ নাথ পদ্মা মোর দাসীর প্রধান।
কৃপা করি প্রশ্নে কর উওর প্রদান।।
শ্রীমুখে করিল যাহা শঙ্কর বর্ণন।
বলিতেছি তাহা সবে করহ শ্রবণ।।
আষাড়ের শুক্ল পক্ষে দ্বিতীয়ার পরে।
শণি বা মঙ্গলবার যেই দিন পড়়ে।।
সেই দিন অতিশয় হয়ে সাবধান।
যথাবিধি দেবী পূজা কর সমাধান।।
পূর্ব্বদিনে হবিষ্যান্ন করি যথারীতি।
পরদিন শুদ্ধভাবে ব্রতে হবে ব্রতী।।
সফল পল্লব দিয়া ঘটের উপর।
সঙ্কল্প করিয় ঘট স্থাপ তারপর।।
বিবিধ নৈবেদ্য ফল বিবিধ প্রকার।
তন্ডূল নির্মিত রম্য পিষ্টকাদি আর।।
অখন্ডিত গুয়া পান আর তাতে ধরি।
প্রতি দ্রব্য সাজাইবে ত্রয়োদশ করি।।
এই ভাবে দ্রব্য সব করি নিবেদন।
বিপদ্-তারিণী মায়ে করি আয়োজন।।
বিপদ্-তারিণী মায়ে কর নিবেদন।
অনন্তর যত্নে বিপ্রে করায়ে ভোজন।
উপবীত সহ কর দক্ষিণা অর্পণ।।
ভক্তিভাবে এই ব্রত করে যে রমণী।
সদা রক্ষা করে তারে বিপদ্-তারিণী।।
পুত্রবতী হয়ে সেই সুখে কাঁটে কাল।
কখনো ভুগে না কোন আপদ জঞ্জাল।।

বিপদতাড়িনী পূজার উপকরণ

বিপত্তারিনী ব্রতের প্রচলিত কাহিনী

রাজপুরে মা বিপত্তারিনী চন্ডী বাড়়িতে মায়ের অন্নকূট উৎসব পালিত হয় বছরের একমাত্র একদিন শ্যামাপূজার রাত্রে,মায়ের বাড়়িতে বছরের অন্য কোনদিন মাকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না। এই অন্নকূট উৎসবের রাতে মা চন্ডী তথা মা বিপত্তারিনী চন্ডী মায়ের সম্মতিতে মায়ের এই রুপের প্রধান সেবায়েত ও সাধক সিদ্ধপুরুষ বাবা দুলাল নিজের হাতে মায়ের জন্য খিচুডি, পায়েস ও বেশ কযেকরকম তরকারি ও নাড়ু তৈরি করে মা চন্ডীকে নিবেদন করতেন এবং প্রতি বছর একমাত্র এই কালীপুজোর রাতে মাকে অন্ন ভোগ নিবেদন করা হত।

বাবা দুলাল নিজে মা বিপত্তারিনী চন্ডীকে এই ভোগ নিবেদন করবার আগে অমাবস্যা তিথিতে তিনি যে বেল গাছের তলায় তাঁর নিজের হাতে রচিত সাধনবেদীতে মা চন্ডীর আরাধনা করে মা চন্ডীকে দর্শন করে, সিদ্ধীলাভ করেছিলেন সেই সাধনবেদীতে গিয়ে মায়ের আরাধনা করে মাকে আহ্বান করে মা চন্ডীকে নিয়ে এসে মা চন্ডীর মৃন্ময়ী মাতৃমূর্তিকে জাগ্রত করে মায়ের সামনে রাখা নিজের হাতে তৈরি করা অন্নভোগ নানান ব্যানজন সহ মাকে নিবেদন করতেন এবং সেই প্রসাদ মাকে নিবেদন করবার বেশ কিছুক্ষন পরে মা বিপত্তারিনী চন্ডীকে নিবেদিত প্রসাদ মন্দিরে আগত দর্শনার্থীদের পরিবেশন করতেন।

পরের দিকে ভক্ত সমাগম বেড়ে যাওযায় আরও বেশি পরিমানে ভোগ যখন মাকে নিবেদন করতেন সেই সময় উনার সমবয়সী বন্ধু স্থানীয় কিছু মুসলমান ছেলেরাও এসে উনাকে রান্নার কাজে সাহায্য করতেন এবং সেই খাওয়ার উনি মাকে ভোগ নিবেদন করবার পরে মায়ের প্রসাদ তাঁরাও খেতেন। এইভাবেই মা চন্ডী নিজেই এখানে চিনমযী রুপে আজও বিরাজ করছেন,বাবা দুলালকে দেওয়া কথা রাখতে এবং ভক্তদের সকল বিপদ থেকে রক্ষা করবার জন্য।এখানে মা বিপত্তারিনী চন্ডী প্রতি সন্ধ্যায় গোধূলি লগ্নে আরতির সময় মৃন্ময়ী মূর্তির আড়ালে চিনমযী রুপে বিরাজ করেন এবং তখন ভক্তরা তাঁদের সমস্যার কথা আন্তরিক ভাবে তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁকে জানালে তিনি সমস্যা অনুধাবন করে তার প্রতিকার করেন। এখনও মায়ের বাড়়িতে বাবা দুলালের শেখানো পদ্ধতিতেই মায়ের ভক্তরা(সেবায়েতরা)তাঁকে উপাসনা করেন, একইভাবে।

তাই উনার প্রবর্তন করা পদ্ধতিতে এখনও কালীপুজোর রাতে উনার ভক্তরা মা বিপত্তারিনী চন্ডী মায়ের উপাসনা করেন এবং মায়ের অন্নকূট উতসব পালন করেন। “জয় মা বিপত্তারিনী চন্ডী মায়ের জয় জয় মা বিপত্তারিনী চন্ডী মায়ের জয় জয় মা বিপত্তারিনী চন্ডী মায়ের জয়” মা বিপত্তারিনী চন্ডী মায়ের অন্নকূট উতসবের কথা আপনাদের অবগত করা হল।

গড়িয়ার কাছে রাজপুরে আছে বাবা দুলাল প্রতিষ্ঠিত মা বিপত্তারিণী চন্ডী মন্দির। বাবা দুলাল স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে মাকে প্রতিষ্ঠা করেন। মা এখানে সিংহবাহিনী, কৃষ্ণবর্ণা এবং লোলরসনা বিস্তার করে আছেন। চতুর্ভূজে খড়্গ, পঞ্চশূল, বর ও অভয়মুদ্রা ধারিণী। আষাঢ়ের শুক্লা তৃতীয়া আর দশমীর মধ্যেকার মঙ্গলবারে এখানে মায়ের বাৎসরিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মা মহামায়ার রূপবৈচিত্র্যের বিস্তার যে অপরিসীম, তা এই মন্দিরের মাতৃবিগ্রহ দেখলে আবার মনে পড়়ে যায়। ভক্তদের বিশ্বাস মা এখানে খুব জাগ্রতা। সকলের সকল মনোকামনা পূর্ণ করেন এবং সকল বিপদ থেকে রক্ষা করেন।

মা বিপত্তারিনী চন্ডী ও সোনারপুর,রাজপুর নিবাসী গৃহী সন্ন্যাসী সিদ্ধপুরুষ বাবা দুলাল (দুলাল চন্দ্র দাস) এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন।

জয়় মা বিপত্তারিণী বঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সোনারপুর থানার অন্তর্ভুক্ত রাজপুরের মযরা পাড়ায়,রাজপুর বাজারের কাছে মা বিপত্তারিনী চন্ডী বাড়়ি। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন বাবা দুলাল(দুলাল চন্দ্র দাস)।

ইনি বিগত তেরো শত তেইশ সনের কার্তিক মাসে কার্তিক পুজোর দিন ভোরে জন্ম নেন। ইনি জন্মানোর কিছুক্ষন পরেই ঐ ভোরের বেলায় কযেকজন অপরিচিত কীর্তনীয়া রাজপুর গ্রামের রাস্তা দিয়ে কীর্তন গেযে যেতে থাকেন এবং যেতে যেতেই তাঁরা হঠাত করে বাবা দুলালের পিতা মাননীয় শ্রী সাধন চন্দ্র দাসের বাড়ির সদর দরজা খুলে বাড়ির ভিতরে ঢুকে কারও সঙ্গে কোন কথা না বলে সরাসরি বাবা দুলাল যে ঘরে জন্মান সেই ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কীর্তন গাইতে লাগলেন, ” যশোদা নন্দন,নন্দের দুলাল এলো রে, রাজপুর ধামেতে বাবা দুলাল এলো রে ”

এইভাবে বেশ কিছুক্ষন কীর্তন গাইবার পরে নিজেরাই কারও সঙ্গে কোন কথা না বলে সদর দরজা দিয়ে বাহিরের দিকে চলে গেল গ্রামের রাস্তা পার হয়ে এরপর ধীরে ধীরে শিশু ক্রমান্বয়ে বড় হতে লাগল ও শিশুটা বাড়ির সকলের ছোট ও দেখতে সুন্দর ও ফরসা মুখশ্রী হওয়ায বাড়িতে বড়দের সবার আদর পেয়ে বড় হতে লাগল। এইভাবে যখন পাঁচ বছর বযসেই বাবা সাধনবাবু তাকে গ্রামের পাঠশালায় পন্ডিত মশাইয়ের টোলে ভর্তি করে দিলেন।শিশু দুলাল প্রতিদিন পাঠশালায় নিজে নিজে যেতে লাগল,গ্রামের সবার প্রিয় হওয়ায় তার কোন অসুবিধা হত না।একদিন পাঠশালায় পড়ার শেষে বাড়়ি ফিরে আসার সময় দেখলেন,গ্রামের মা রক্ষাকালীর থানে কিছু লোক প্যান্ডেল বাঁধছে,তিনি বুঝতে পারলেন না কেন প্যান্ডেল বাঁধছে, যাইহোক, নিঃশব্দে তিনি বাড়়িতে ফিরে এলেন।রাত্রিতে বাবা সাধনবাবু বাড়়ি ফিরলে জিজ্ঞাসা করলেন”রক্ষাকালীর থানে” প্যান্ডেল বাঁধছিল কেন ?সাধনবাবু জানালেন,”আগামী কাল মা রক্ষাকালীর থানে গ্রামবাসীদের কল্যান কামনায় অমাবস্যা তিথিতে মা রক্ষাকালীর পূজা হবে”।

এইকথা শুনে শিশু দুলাল বাযনা করলেন,”মা রক্ষাকালীর পূজা দেখব”। কিন্তু সাধনবাবু ছেলেকে বললেন,আমরা বংশগত বিচারে ব্রাহ্মণ নয,আমরা নীচ জাতির, মাহিষ সম্প্রদায়ের, তাই আমাদের ঐ পূজা দেখা ঠিক নয,” কারন তিনি ভাবলেন,যদি ছেলে বাযনা ধরে, গভীর রাত্রে মায়ের পূজা দেখতে যাবে শীতের ঠান্ডায়,তাহলে হয়ত ছেলের ঠান্ডা লেগে যাবে।কিন্তু শিশু দুলাল নাছোড়বান্দা হয়ে বাবার কাছে বাযনা করলেন,”হোক ঠান্ডা, আমি রক্ষাকালী মায পূজা দেখব। আমার যাওয়ার খুব ইচ্ছা।” বাবা সাধনবাবু ছেলের বাযনার কাছে হেরে গিয়ে বললেন, “ঠিক আছে,নিয়ে যেতেই পারি,কিন্তু তোমাকে প্রচুর শীত বস্ত্র পড়তে হবে, নাহলে শীতের রাতে ঠান্ডা লেগে যাবে। শিশু দুলাল বাবার বাযনা মেনে তাতেই রাজি হয়ে গেল এবং পরদিন রাত্রে সাধনবাবু গভীর রাত্রে বারোটার পরে শিশু দুলালকে ঘুমথেকে যখন ডাকলেন,তখন শিশু দুলাল জাগাই ছিলেন এবং তিনি সাথে সাথে উঠে বাবার কথামতো শীত বস্ত্র পড়ে তৈরি হয়ে নিলেন।

এরপর ধীরে ধীরে রক্ষাকালীর থানের দিকে যত এগোতে থাকেন ততই ঢাক ও কাঁসরের আওয়াজ জোরে জোরে কানে বাজতে থাকে ততই তাঁরাও এগিয়ে চলেন,এইভাবে কিছুটা এগিয়ে তাঁরা মা রক্ষাকালীর থানে পৌছলেন। সেখানে পৌছিযে মা চন্ডীকে দর্শন করেই তাঁর(শিশু দুলালের)মন শিহরিত হয়ে উঠল।তাঁর মনে হ’ল এই মাতৃমূর্তি ত তাঁর খুব যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে। মা যেন মহাদেবের বুকে পা দিয়ে লজ্জাবনত চিত্তে তাঁর দিকে তাকিয়ে হাঁসছেন।

মা চন্ডীর এই অপরুপা রুপ মাধুরী দেখে শিশু দুলাল যেন মোহিত হয়ে পড়লেন এবং মনে হতে লাগল,মা চন্ডী যেন তাকে দেখে হাসছেন,যেন চেনা লোকের সঙ্গে মা চন্ডীর হঠাত দেখা হয়ে গিয়েছে,তাই তিনি হাসছেন।এর সাথে সাথে ঢাক ও কাঁসরের আওয়াজ আর পুরোহিত ম’শাযের দৃপ্ত কন্ঠে সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারন শুনে তিনি মোহিত হয়ে পড়লেন,যেন স্বর্গালযে তিনি বাবার হাত ধরে মায়ের পূজা দেখছেন। এইভাবে কিছুক্ষণ মোহিত অবস্থায় থাকতে থাকতে হঠাত বাবা তাঁকে জোরে জোরে ডাকাতে তাঁর যেন বিমোহিত অবস্থা থেকে সম্বিত ফিরে এল ও বাবার তাড়নাতে বাধ্য হয়ে ঘরে ফিরে আসতে হল,একান্ত অনিচ্ছায় কিন্তু ঘরে ফিরে শীত বস্ত্র ত্যাগ করে খাটে শুযে, চোখ বন্ধ করেও,তাঁর ঘুম কিছুতেই যেন আসতে চায না।

মনের আযনায মা চন্ডীর ত্রিনয়নী মুখ বারংবার ভেসে উঠতে লাগল। এইভাবে সেই রাত্রি কেটে গেল। এর কিছুদিন পরে একদিন পাঠশালায় যাওয়ার সময় ঠাকুরদার পিঠ চুলকিযে পাওয়া এক টাকা সাথে নিয়ে পাঠশালা অভিমুখে রওনা হলেন ও পাঠশালায় পাঠ শেষে পটুয়াপাড়ায গিয়ে মা চন্ডীর ছোট মূর্তি তৈরির বাযনা করলেন ঠাকুর্দার কাছ থেকে পাওয়া এক টাকা দিয়ে,এরপর যথারীতি আবার বাড়়িতে ফিরে এলেন।কিছুদিন পরে নির্ধারিত সময় আবার একদিন পাঠশালার পাঠের শেষে পটুয়াপাড়ায গেলেন, বাড়়ির কাউকে না জানিয়ে মা চন্ডীকে বাড়়িতে আনতে।এদিকে দুলাল জননী ছেলে দুলাল সময়মত বাড়়ি ফিরে আসছে না দেখে চিন্তাগ্রসত হয়ে পড়লেন ও একবার সদর দরজার সামনে গিয়ে দাড়ান ও একবার ঘরের ভেতরে পাযচারি করতে লাগলেন।

শিশু দুলাল মা চন্ডীর মূর্তি ঠিকমত তৈরি হয়েছে কিনা তা যাচাই করতে গিয়ে একটু দেরি হয়ে গেল। এরপর সেই শিশু দুলাল নিজে মাতৃমূর্তি চন্ডী মায়ের মূর্তি মাথায় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে পটুযা এইটুকু শিশু মৃন্ময়ী মাতৃমূর্তি মাথায় নিয়ে বাড়়ি যেতে পারবে না এই আশংকায় পৌছিযে দিয়ে আসতে চাইলেন কিন্তু শিশু দুলাল কোন অসুবিধা হবে না জানানোয় তিনি চুপ করে গেলেন।তিনি তখন শিশু দুলালের মাথায় মা চন্ডীর মাতৃমূর্তি উঠিয়ে দিলেন।শিশু দুলাল মাতৃমূর্তি মাথায় নিয়েও যেন কোন ভার বোধ করলেন না, তাঁর মনে হতে খুব হালকা কোন কম ভারী ওজনের হালকা জিনিষ তিনি মাথায় নিয়ে বাড়়ি যাচ্ছেন।

এইভাবে অনেকক্ষন হাঁটবার পরে যখন প্রায বাড়ির কাছাকাছি এসে পৌছলেন,তখন শিশু দুলাল জননী সদর দরজা আর ঘরের ভেতরে অনবরতঃ পাযচারি করছিলেন। তিনি সদর দরজার কাছে আবার যখন ঘুরে পৌছিযেছেন,তখন দূর থেকে লক্ষ্য করে দেখলেন,শিশু দুলাল একটা মৃন্ময়ী চন্ডী মাতৃমূর্তি মাথায় নিয়ে বাড়ির দিকে আসছে।এই দৃশ্য দেখেই তিনি প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়লেন এবং শিশু দুলাল সদর দরজার কাছে পৌছতেই তিনি দুলালকে বললেন,”তুমি এই চন্ডী মূর্তি নিয়ে ঘরে ঢুকবে না। ঐ মূর্তি সদর দরজার বাহিরে রাস্তায় রেখে ঘরে ঢুকবে কারন আমরা নিম্ন বর্নের মানুষ,তাই আমাদের ঐ মূর্তি ঘরে ঢোকানোর অধিকার নেই।তুমি ঐ মূর্তি দরজার বাহিরে রেখে ঘরে ঢুকবে “। এই কথা তিনি বললেও শিশু দুলাল কোন উওর না দিয়ে মাতৃমূর্তি মাথায় নিয়ে বাড়ির বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকলেন।

দুলাল জননী তখন দুলালের এই রকম অবাধ্যতা দেখে খুব রেগে গিয়ে বাড়়ির উঠোনে একটু ঝোপঝাড়ে রাখা একটা বেতের ডাল নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শিশু দুলালের হাতে পিঠে পাযে যত্র তত্র মারতে শুরু করলেন কিন্তু শিশু দুলাল নির্বিকার চিত্তে মাতৃমূর্তি মাথায় নিয়ে বাড়ির বাহিরে দাঁড়িয়েই বেতের বারি খেতে লাগলেন ও সেই জন্য দুলাল জননী আরও রেগে আরও জোরে জোরে মারতে লাগলেন।তখন শিশু দুলালের ঠাকুরদা পাশের ঘরে তাঁর চকিতে শুযে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।

বেতের বারির আওয়াজ আর দুলাল জননীর বকাবকি শুনে বাহিরে বেরিয়ে পুরো বিষয় কিছুটা লক্ষ্য করে তিনি সব বুঝে বৌমার হাত থেকে বেত কেড়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে শিশু দুলালকে তাঁর ঘরে ঢুকতে বললেন,ঐ মা চন্ডীর মাতৃমূর্তি মাথায় নিয়ে। দুলাল জননী তখন রেগে একা একাই গজগজ করতে করতে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন ও শিশু দুলাল ঐ মাতৃমূর্তি মাথায় নিয়ে ঠাকুর্দার ঘরে ঢুকলেন ও ঠাকুর্দার আদেশ অনুযায়ী ঐ মাতৃমূর্তি তাঁর(ঠাকুর্দার) ঘরে টেবিলের উপর দাঁড় করিযে রাখলেন ও ঠাকুরদার আদেশ অনুযায়ী নিজে ঠাকুরদার খাটে বসলেন।

এরপর একটু বেশি রাত্রে ঠাকুর্দার আদেশ অনুযায়ী ঠাকুর্দার ঘরে রাখা ঠাকুর্দার খাওয়ার দাদু ও নাতি ভাগ করে খেযেদেযে শুযে পড়লেন।ক্রমে রাত বাড়তে লাগল ও দুলাল জননী ঘরের করনীয সব কাজ শেষ করে খেযেদেযে নিজের ঘরে বেদনাহত চিত্তে শুযে পড়লেন।কিন্তু ছেলে দুলালকে ছাড়া কিছুতেই যেন ঘুম আসতে চাইছিল না।যাইহোক,শেষ পর্যন্ত তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন কিন্তু তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় স্বপ্নে দেখলেন,যেন একটা শ্যামবর্না অপরুপা সুন্দরী কিশোরী কন্যা লাল বেনারসি শাড়ি পরে যেন,আড়াল থেকেই তাঁকে বলছে,” তুই আমার পিঠের দিকে তাকিয়ে দেখ,আমার পিঠে কিরকম কালশিটে দাগ পড়েছে।তুই দুলালকে মারলি, বেত দিয়ে। ঐটুকু বাচচা ছেলে কি ঐরকম মার সহ্য করতে পারে?

সেইজন্যই দুলালের পিঠের উপরে আমার পিঠ দিয়ে ওকে রক্ষা করতে চেষ্টা করেছি বলে,আমার পিঠে কালশিটে দাগ পড়েছে।তুই যদি ভাল চাস, তাহলে এখনই গিয়ে দুলালের কাছে ক্ষমা চাইবি আর ওর শরীরে যে সব জায়গাতে মেরেছিস,সেই সব স্থানে কোমল হাত দিয়ে যত্ন করে এমনভাবে হাত বোলাবি যাতে দুলালের শরীরের ব্যাথা যন্ত্রণা কিছু না থাকে, দুলালের শরীরের ব্যাথা কমলে তবে আমার পিঠের কালশিটে দাগ কমবে ও ব্যাথাও কমবে আর তাহলে তোকে ক্ষমা করা হবে নাহলে তোকে তোর অন্যাযের জন্য শাস্তি পেতে হবে।”এইকথা বলে সেই শ্যামবর্না অপরুপা সুন্দরী কিশোরী কন্যা অদৃশ্য হয়ে গেলেন, স্বপ্নে। তখনই দুলাল জননীর ঘুম ভেঙে গেলে তিনি বুঝতে পারলেন,এই শ্যাম বর্না কিশোরী কন্যা সবযং মা চন্ডী।

তিনি ছাড়া অন্য কেউ নন। দুলাল জননী তখনই ভীত হয়ে ঘুম থেকে উঠে নিজের ঘরের দরজা খুলে ঐ ঘন অন্ধকার আচ্ছন্ন রাতে দুলালের ঠাকুর্দা মানে শ্বশুর মহাশয়ের ঘরের দিকে ছুটে গিয়ে কড়া নাড়তে লাগলেন। এত অন্ধকার আচ্ছন্ন রাতে কড়া নাড়ার আওয়াজে শিশু দুলালের ঠাকুর্দার ঘুম ভেঙে গেল ও সাথে সাথে কে দরজার কড়া নাড়ছে জানতে চাওয়ায জানতে পারলেন,পুত্রবধূ কড়া নাড়ছে কারন তিনি এখনই তাঁর করা অপরাধের জন্য দুলালের কাছে ক্ষমা চাইবেন।কিন্তু ঠাকুরদা জানালেন,” দুলাল এখন ঘুমোচ্ছে।আগামীকাল সকালে,দুলাল ঘুম থেকে উঠলে তখন ক্ষমা চাইলেই হবে।” কিন্তু দুলাল জননী তখন শ্বশুর মহাশয়ের কাছে আবেদন জানালেন, সেই মুহূর্তেই তিনি দুলালের কাছে ক্ষমা চাইবেন,নতুবা তিনি শান্তিতে ঘুমোতেই পারবেন না।মানসিক কষ্ট ভোগ করতে হবে।

তাই শ্বশুর মহাশয়কে তিনি আবার অনুরোধ করলেন,দরজা খুললেই তিনি দুলালের কাছে ক্ষমা চাইবেন।এই আবেদন জানিয়ে তিনি কাঁদতে লাগলেন ।অগত্যা শ্বশুর মহাশয় বাধ্য হয়ে দরজা খুলতে রাজি হলেন একটা শর্তে যে,দুলাল জননী আর দুলালকে মারবেন না।দুলাল জননী এই শর্তে রাজি হলেন এবং তাঁর কথামতো শ্বশুর মহাশয় ঘরের বন্ধ দরজা খুললেন আর সঙ্গে সঙ্গেই দুলাল জননী ছুটে ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত দুলালের দুটো হাত নিজের মুঠোয় ধরে দুলালের কাছে তাঁর অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতে লাগলেন,অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে।দুলালের মায়ের কান্নার আওয়াজে দুলালের ঘুম ভেঙে গেল এবং তখন দুলাল জননী বার বার দুলালের গাযে পিঠে হাতে যত্ন সহকারে তাঁর হাত বোলাতে লাগলেন, যাতে দুলালের শরীরের ব্যাথা ও যন্ত্রণা কিছু অন্ততঃ কমে।

অনেকক্ষন ধরে দুলালের পিঠে, হাতে মায়ের হাতের স্পর্শে ও হাত বোলানোতে ব্যাথার কিছুটা লাঘব হলে দুলাল জননী দুলালের কাছে ক্ষমা চেয়ে একটা অনুরোধ করলেন”,দুলাল যেন মা চন্ডীকে নিয়ে তাঁর ঘরে স্থাপন করে ও নিজে যেন তাঁর কাছে থাকে”। শিশু দুলাল সেই ক্ষেত্রে মাকে একটা শর্ত দিলেন,”যে ঘরে নিয়ে গিয়ে আর কোন অত্যাচার করা চলবে না তাকে ও জগন্ময়ী মা চন্ডীর মাতৃমূর্তিকে। শর্ত মানলে তবেই সে ঘরে ঢুকবে ও ঠাকুর্দার সামনে সেই অঙ্গীকার করতে হবে” ।দুলাল জননী শ্বশুরের সামনে সেই শর্তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন এবং তখন দুলাল ঠাকুরদার সম্মতিতে মা চন্ডীর মাতৃমূর্তি নিয়ে ঘরে ঢুকলে দুলাল জননী নিজের ঠাকুরের আসনের পাশে মা চন্ডীর মৃন্ময়ী মাতৃমূর্তি স্থাপন করতে বললেন শিশু দুলালকে।সেই থেকেই আজও মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তি শিশু দুলালের বাড়়িতে পূজিতা হয়ে আসছেন,দুলালের অবর্তমানেও।

এইভাবে মা চন্ডী বাবা দুলালের গৃহে মৃন্ময়ী মাতৃমূর্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলেন। (এরপরের পর্যায়গুলিতে মা চন্ডী বাবা দুলালের সাথে কিভাবে লীলা করেছিলেন তা ধীরে ধীরে প্রকাশিত হবে।আপনারা জাগ্রত মা বিপত্তারিনী চন্ডী মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তি রাজপুরের চন্ডীবাড়িতে গিয়ে নিজেদের চোখে দেখে আসুন। শান্ত,নিরিবিলি ও শহরের কোলাহলের কাছে থেকেও নির্জনে মায়ের উপস্থিতি অনুভব করুন। বিপত্তারিনী চন্ডী মায়ের কাছে আপনার সুখ দুঃখ ভাল মন্দ সব মনের কথা মায়ের সন্ধ্যা আরতির সময় গোধূলি লগ্নে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে মাকে মনের কথা জানান। মা চন্ডী বাবা দুলালকে জানিয়েছিলেন,” আমি প্রতিদিন আরতির সময় মন্দিরে বসে মৃন্ময়ী মাতৃমূর্তির আড়ালে চিনমযী হয়ে ভক্তদের মনের কথা শুনব।ভক্তেরা যেন ঐ আরতির সময় আমার চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের মনোকামনা আমাকে জানায,আমি অন্তরযামী,সব বুঝতে পারি ও আন্তরিকতার সাথে মনের কথা জানালে আমি তার(ভক্তের) সমস্যার সমাধান করব।তাই আরতির সময় আপনার মনের কথা জানাবেন।তাই মা

বিপত্তারিনী চন্ডী বাবা দুলালকে বলতেন, – ”আমি যারে রাখি, কে মারে তাহারে, আমি যারে মারি, কে রাখে তাহারে ? বাঁধা আছি সদা ভক্তেরই হৃদয়ে, ভক্ত আমার মাথার মনি, ভক্ত আমার প্রানের প্রান। ভক্তেরই কারনে আসি এই ভূবনে, সাধুজনে করি পরিত্রান।” তাই রাজপুর বিপত্তারিনী চন্ডী বাড়়িতে মায়ের আরতির সময় মাকে আপনার সমস্যা জানান,মা ঠিক সমাধান করে দেবেন। এখানে মা চন্ডীকে ভগবান ভেবে নয,নিজের মা ভেবে সব কিছু মনে মনে জানান,মা নায্য বিচার করে সমাধান করে দেবেন।)

পবিত্র আমাদের পুণ্যভূমি ভারত স্বতঃই পবিত্র। ভারত তথা বাংলার বিভিন্ন স্থানে মহামায়া মহাশক্তি বিভিন্ন রুপে পূজিত হন এবং পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু রমণীরা সারা বছর বিভিন্ন ব্রত পালনের মধ্য দিয়ে মহামায়া মহাশক্তির আরাধনা করেন। এর মধ্যে অন্যতম জাগ্রত ব্রত হল শ্রী শ্রী বিপত্তারিনী চণ্ডী ব্রত।

মহামায়া মহাশক্তির ১০৮ টি রুপের এক রুপ হলেন শ্রী শ্রী বিপত্তারিনী চণ্ডী। কলকাতার লাগোয়া বিভিন্ন হিন্দু তীর্থস্থান গুলির মধ্যে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজপুরের বিপত্তারিনী চণ্ডী মন্দিরটি একটি জাগ্রত তীর্থস্থান। বাংলা ১৩৯৩ সন (ইং-১৯৮৫ সাল) আশ্বিন মাসে পঞ্চতীর্থ নামে বাড়়ীর দ্বিতলে শ্রী শ্রী বিপত্তারিনী চণ্ডী দেবী স্থাপিত হন।

সোর্সঃ ask2q.com