মানুষের গুহা জীবন হতে আধুনিক কম্পিউটার যুগ পর্যন্ত (From cave life to modern computer age)বিজ্ঞানের নব নব আবিস্কারের সাথে সাথে মানুষের চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়েছে।অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনের আগমন ও প্রবাহ যেমন থেমে নেই, ঠিক তেমনি সভ্যতার বর্তমান পর্যায়ে জ্ঞানের আপরাপর শাখার মত জ্যোতিষ বিজ্ঞান চর্চা, অনুশীলন এবং গবেষণাও থেমে নেই। সমগ্র বিশ্ব জগতে শ্রেষ্ট চিন্তাশীল বিবেকবান ও প্রজ্ঞাবান জীব হিসেবে মানুষের অবস্থান শীর্ষে। তাই এই অসীম মহা বিশ্বে মানুষের অবস্থান, তার স্বাধীন বিচরণশীল মনোবৃত্তি ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ইত্যাদির প্রেক্ষিতে সর্বকালে সর্বযুগে একদল নিবেদিত প্রাণ মানুষ নিজস্ব চিন্তা -চেতনা প্রসারিত করেছেন তাঁরাই হলেন জ্যোতিষী (Astrologer)

জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy) মতে হিসাব করে যেমন গ্রহদের অবস্থান, দূরত্ব-গতিবিধি, চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ প্রভৃতির সঠিক হিসাব নির্ণয় করা যায়, তেমনি জ্যোতিষবিজ্ঞান (Astrology) মতে জীবন প্রবাহের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনা প্রবাহের ইঙ্গীত, আমাদের জীবনের কোথায় সমস্যা, কোন সময়ে কিসের দ্বারা উন্নতি বা কর্মপথ কি, পরিবেশ, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, রাষ্ট্রীয় অবস্থা, ব্যবসা, চাকুরী, রোগ-ভোগ, স্বাস্থ্য, আর্থিক উন্নতি বা অর্থক্ষতি ইত্যাদি বিষয় নির্ণয় করাও সম্ভব। আজ আর কারো আজানা নয় যে, চন্দ্রের (Moon) কারণে সমুদ্রে ও নদীতে জোয়ার-ভাটা হয়। জ্যোতিষশাস্ত্র (Astrology) মতে পৃথিবীর পানির উপর চন্দ্রের প্রভাব ক্রিয়াশীল, হাজার বছর আগে থেকে জানা থাকেলেও একথার সত্যতা প্রমাণিত হয় ১৬৮৭ খৃষ্টাব্দে বিজ্ঞানী নিউটনের মাধ্যমে। শুধু চন্দ্রই নয়, জ্যোতিষশাস্ত্র মতে সূর্য, শনি, বুধ, মঙ্গল, বৃহস্পতি, রাহু, কেতু ইউরেনাস, নেপচুন বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ভাবে মানবজীবন ও জীব জগতকে প্রভাবিত করে।আর গ্রহ নক্ষত্রের বিচার বিশ্লেষণের হিসাবের উপরেই জ্যোতিষশাস্ত্র প্রতিষ্ঠিত।

জ্যোতিষ শাস্ত্র (Astrology) ও জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy) ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পথে যে সিদ্ধান্ত আসে তা অভিন্ন।

জ্যোতিষ বিজ্ঞান অনুসারে নটা গ্রহের উপস্থিতি ধরা হয়। এদেরকে একত্রে নবগ্রহ বলে। কিন্তু সব কটি গ্রহ না হলেও গ্রহ রূপে কল্পনা করা হয়। যেমন — রবি বা সূর্য্য গ্রহ নয় একটি নক্ষত্র। চন্দ্র গ্রহ নয় পৃথিবীর উপগ্রহ। রাহু-কেতু গ্রহ নয়, সূর্য ও চন্দ্রের ছায়া। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানে এদের এক একটা গ্রহ ধরে খুব সুন্দরভাবে জাতক-জাতিকাদের ভবিষ্যৎ নিরূপণ করা যায়। গ্রহের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান বিভিন্ন ফল দেয়। তাই তাদের প্রভাব মানব জীবনে অপরিসীম।

বৃহস্পতি: বৃহস্পতি দেবতাদের গুরু। তিনি অঙ্গীরা ঋষির পুত্র। তিনি মহাদেবের তপস্যা করেন। মহাদেব তার তপস্যায় তুষ্ট হয়ে তাকে দেবতাদের গুরু বা আচার্য পদে নিযুক্ত করেন। বৃহস্পতি চার হাত বিশিষ্ট। তার হাতে থাকত দন্ড, পদ্ম ও জপমালা। তিনি হলুদ বর্ণের বস্ত্র পরিধান করেন। তার বাহন হস্তি। তার পত্নী তারা দেবী। তার সম্মানার্থে সপ্তাহের একটি দিন হল বৃহস্পতিবার। বৃহস্পতিবারে উপবাস থেকে লক্ষ্মীদেবী ও তারা মায়ের পুজো করুন। হলুদ-ফুল দিয়ে পুজো এবং হলুদের টিপ পরুন। বট গাছে জল দিন। কারও কাছ থেকে দান গ্রহণ করবেন না। মন্ত্র:- ওঁ হ্রীং ক্লীং হুং বৃহস্পতয়েঃ

চন্দ্র: তিনি সুদর্শন, সুপুরুষ, দ্বি-বাহুযুক্ত ও তার এক হাতে অস্ত্র ও অন্য হাতে পদ্ম ৷ তিনি তার সাতটি হরিণের শ্বেত রথে চড়ে রাত্রে আকাশে উদিত হন ৷ তার সম্মানার্থে সপ্তাহের একটি দিন হল সোমবার ৷ তার গায়ের রং শ্বেতবর্ণ। তিনি মহাদেবের জটায় অর্ধচন্দ্র রুপে বিরাজমান। তিনি প্রজাপতি দক্ষের ২৭টি কন্যার জামাতা। সোমবার উপবাস থেকে শিব ও কমলার পুজো করুন। বাড়িতে সাদা রঙের গরু, খরগোস প্রভৃতি পালন করুন। চন্দ্রের বস্তু সামগ্রী মন্দিরে দান করুন। মন্ত্র:- ওঁ ঐং ক্লীং সোমায়ঃ

রবি: সূর্য নবগ্রহের মধ্যে প্রধান। তিনি ঋষি কশ্যপের পুত্র ৷ তার কেশ এবং বাহু স্বর্ণের ৷ তার রথ সাতটি ঘোড়া দ্বারা চালিত হয়। তার রথের সারথি হলো অরুণদেব। তার সম্মানার্থে সপ্তাহের একটি দিন হল রবিবার ৷ তার স্ত্রীর নাম সংঙ্গা ও ছায়া। তার অস্ত্র ভগবান বিষ্ণুর অস্ত্রের মতোই।যথাঃ শঙ্খ,চক্র,গদা ও পদ্ম। তার কয়েকটি নাম হলোঃ সূর্য নারায়ণ,আদিত্য,রবি ইত্যাদি। এনার সন্তানরা হলেনঃ— কর্ণ,যম,যমুনা,শনি,ভদ্রা,তপতী,অশ্বিনী-কুমারদ্বয় প্রমুখ। সূর্যদেবের ধ্যান করুন, রবিবার উপবাস থেকে সাদা ফুল দিয়ে শিব ও মাতঙ্গীর পূজা করুন। তামার টুকরো প্রবাহিত জলে ফেলুন কিংবা বালিশের মধ্যে রাখুন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার আগে মিছরি খান। মন্ত্র:- ওঁ হ্রীং হ্রীং সূর্য্যায়ঃ

মঙ্গল: মঙ্গল হলেন ভূমির পুত্র ৷ তিনি যুদ্ধের দেবতা এবং অবিবাহিত ৷ তাকে পৃথিবী/ভূমি দেবীর পুত্র বলা হয়। তার দেহে বিজয় এবং গর্বের চিহ্ন বর্তমান, তার চতুর্বাহু ৷ তার সম্মানার্থে সপ্তাহের একটি দিন হল মঙ্গলবার। তার গায়ের রং লাল। তার বাহন মেষ। মঙ্গলবার উপবাস থেকে বজরংবলি বা বগলা দেবীর পুজো করুন। গম বা মুসুর ডাল মন্দিরে দান করুন। মাটির পাত্রে মধু ভর্তি করে ঘরে রেখে দিন। মন্ত্র:- ওঁ হুং শ্রীং মঙ্গলায়ঃ

শুক্র: শুক্র একজন প্রাচীন ঋষি ও দেবতা যিনি বৈদিক পুরাণ অনুসারে অসুর ও দৈত্যদের গুরু। তার সম্মানার্থে সপ্তাহের একটি দিন হল শুক্রবার। তিনি মহাদেবের তপস্যা করে মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা প্রাপ্ত হন। শুক্রবার উপবাস থেকে ভুবনেশ্বরীর পূজা করুন। ঘি, দুধ, দই মন্দিরে দান করুন। বাড়িতে সাদা ফুলগাছ রোপন করুন। কখনও ছেঁড়া জামাকাপড় পরবেন না। সুগন্ধী ব্যবহার করুন। নর্দমাতে হলুদ ফুল ফেলুন। মন্ত্র:- ওঁ হ্রীং শুক্রায়ঃ

শনি: শনি গ্রহকে গ্রহরাজ-ও মহাগ্রহ বলা হয়ে থাকে। জ্যোতিষীদের মতে শনির কুদৃষ্টি অশুভ ফল নিয়ে আসে। তিনি খারাপের জন্য খারাপ ও ভালোর জন্য ভালো ফল বয়ে আনেন। সৌরজগতের শনি গ্রহ ও সপ্তাহের শনিবার দিনটি শনিদেবের নামে নামকরণ করা হয়। শনিদেব কে শনিশ্চর বা শনৈশ্চর নামেও ডাকা হয়। তার পত্নী ধামিনী। তার সন্তান মান্দী ও কূলিগ্না। তিনি সূর্যদেব ও ছায়ার পুত্র। তার চার হাত। তার হাতে ধনুক,বাণ,ত্রিশুল ও গদা থাকে। শনি দেবতার প্রিয় রঙ কালো। তিনি ধীর গতির তাই তিনি আস্তে চলেন। তার বাহন কাক বা শকুন। শনিবার উপবাস থেকে দক্ষিণা-কালির পুজো করুন।নীল ফুল দিয়ে। মন্দিরে কালো তিল, সরষে বা লবঙ্গ দান করুন। শনিবারে কাক, কুকুরকে খাওয়ান। মন্ত্র:- ওঁ ঐং হ্রীং শ্রীং শনৈশ্চরায়ঃ

বুধ: বুধ চন্দ্র এবং তারার(বৃহস্পতির পত্নী) পুত্র। আবার অন্যমতে তিনি দেবী রোহিণী এবং চন্দ্রদেবের পুত্র হিসেবে বর্ণিত হন। তার চার হাত। তার পত্নী ইলা। শ্রীবুধের বাহন সিংহ। তার নামানুসারে সপ্তাহের একটি দিনের নাম বুধবার। বুধবার উপবাস থেকে ত্রিপুরা-সুন্দরী বা মা দুর্গার পুজো করুন। নদীর জলে সবুজ জিনিস প্রবাহিত করুন। ঘরে বৌদ্ধমূর্তি বা ফটো রাখুন। মন্ত্র:- ওঁ ঐং স্ত্রীং শ্রীং বুধায়ঃ

রাহু: স্বরভানু নামে এক অসুরের কর্তিত মুন্ড, যে গ্রহনের সময় সূর্য বা চন্দ্রকে গ্রাস করে। জ্যোতিষশাস্ত্রে, একে নবগ্রহের মধ্যে একটি স্থান দেওয়া হয়েছে। দিবাভাগে রাহুকাল নামক মুহূর্তকে (২৪ মিনিট) অশুভ বলে গণ্য করা হয়। এর আবাস পাতাললোকে। এর বাহন নীল বা কালো ঘোড়া। স্বরভানুর মুন্ডকে রাহু ও দেহকে কেতু নাম দেওয়া হয়েছে। ব্রহ্মা রাহু ও কেতুকে গ্রহের স্থান দিয়েছে। লোক কথা অনুসারে এখনকার ইউরেনাস গ্রহকে পূর্বে রাহু নামে ডাকা হত। শনিবারে উপবাস থেকে দেবী ছিন্নমস্তার পূজা করুন। রুপোর টুকরো বালিশের নিচে রেখে ঘুমান। মন্দিরের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম করবেন। রোজ শ্বেতচন্দনের টিপ পড়ুন। মন্ত্র:- ওঁ ঐং হ্রীং রাহবেঃ

কেতু: পুরাণ অনুসারে স্বরভানু নামক এক অসুরের মস্তকহীন দেহ যা সমুদ্র মন্থনের সময় ভগবান বিষ্ণু আপন সুদর্শন চক্রের মাধ্যমে এর মুন্ড ছিন্ন করে দেন। বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রে, একে নবগ্রহের মধ্যে একটি স্থান দেওয়া হয়েছে। কেতুর আবাস অসুরলোকে। কেতুর বাহন চিল। লোক কথা অনুসারে এখনকার নেপচুন গ্রহকে পূর্বে কেতু নামে ডাকা হত। বৃহস্পতিবার উপবাস থেকে ধূমাবতীর পুজো করুন । কয়লার চারটি টুকরো ৪৮দিন নদীতে ভাসিয়ে দিন। নয় বছরের কম বয়সের বালিকাদের ফল খাওয়ান যেটা তারা ভালবাসে। মন্ত্র:- ওঁ হ্রীং ঐং কেতবেঃ