সীতাকুন্ডু থেকে বাবা লোকনাথ চলে আসেন দাউদকান্দি। এখানেই পরিচয় হয় বারদী নিবাসী- ডেঙ্গু কর্মকারের সাথে। তিনি জোর করা বাবাকে নিয়ে আসেন বারদী।

বাবা লোকনাথ বলেছিলেন, “ডেঙ্গু তুই আমাকে নিয়ে যেতে চাইছিস, আমি তোর সাথে যেতে প্রস্তুত, কিন্তু এই লেংটা পাগলাকে তুই কিভাবে ঘরে রাখবি। লোকে তোকে ছি ছি করবে।

সহ্য করতে পারবি। ভেবে দেখ ?”। ডেঙ্গু উত্তরে বলেছিলেন; “আমি কিছু বুঝি না, আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে। লোকে যা বলে বলুক। শুধু আপনি কথা দেন – বারদী ছেড়ে কোথাও যাবেন না”।

ডেঙ্গুর সাথে বাবা লোকনাথ চলে আসেন বারদী। ছোট ছোট ছেলেরা বাবাকে পাগল ভেবে; পাথর মারতে থাকে। ডেঙ্গুর পরিবারে বাবাকে নিয়ে শুরু হয় অশান্তি। বারদীর ধনী জমিদার নাগ-পরিবার; তারা বাবাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন।

কিন্তু বাবা থাকার জায়গা বেছে নেন; ছাওয়াল বাঘিনীর নদীর পাড়ের শ্মশানভূমি। ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই শ্মশানভূমি। দিনের বেলায় গ্রামের মানুষ যেতে ভয় পেত। এইখানেই বাবা নিজ হাতে নিজের জন্য তৈরি করেন কুটির।

যা আজ সারা বিশ্বের বাবা লোকনাথ ভক্তদের কাছে; এক মহান তীর্থভূমি। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় এই পূণ্যভূমিতে। কেঁদে, মাটিতে গড়াগড়ি খেতে খেতে; অসংখ্য মানুষ নিজেদের দুঃখের কথা জানায় বাবা লোকনাথের কাছে।

বাবা বলতেন -“ওরা বড় দুঃখী, ওরা বড় অসহায়। ছোট ছোট ওদের চাওয়া গুলো পূরণ করে দেওয়ার কেউ নেই; তাই তো ওরা আমার আছে ছুটে আসে; ওদের দুঃখের কথা; কষ্টের কথা আমাকে বলতে।

ওদের দুঃখের কথা আমি শুনি বলেই; আমার কাছে ওদের যত আবদার, অধিকার। সংসারের কঠিন পথ চলতে চলতে ওরা ক্ষতবিক্ষত; ওদের বিশ্বাস আমিই ওদের দুঃখ দূর করে দিতে পারি”।

বাবার শিষ্যদের নিয়েও আছে অনেক গল্প। ফরিদপুর জেলার পালং থানার মহিসা গ্রামে রজনীকান্ত চক্রবর্তীর জন্ম। ঢাকা ওয়ারীতে তিনি ব্রহ্মচারী যোগাশ্রম প্রতিষ্টা করেন। পরে তা ফরিদাবাদে স্থানান্তর করেন।

তিনি বাবা লোকনাথের স্মরণে আসেন; ১৮৮৬ থেকে ১৮৯০ সালের দিকে। বাবার একজন যোগ্য শিষ্য হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন।

বারদীর আশ্রমের কাছেই এক বৃদ্ধা, নাম-কমলা। সম্বল বলতে এক গরু ছাড়া কিছুই ছিল না। দুধ বিক্রি করে দিন চালাতেন। লোকমুখে বাবা লোকনাথের প্রশংসা শুনে; এক বাটি দুধ নিয়ে বাবাকে দেখার জন্য চলে আসেন।

বাবা লোকনাথ তাঁকে মা বলে ডাকে কাছে টেনে নেন। লোকনাথ বাবা তাঁকে “মা” ডাকতেন বলে; পরবর্তীতে তিনি ‘গোয়ালিনী মা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি লোকনাথ বাবার আশ্রমেই কাটান।

ব্রহ্মানন্দ ভারতী ঢাকার বিক্রমপুরের পশ্চিমপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক নাম – তারাকান্ত গাঙ্গুলী। আইন পেশায় ও শিক্ষকতায় জড়িত ছিলেন। লোকমুখে বাবা লোকনাথের কথা শুনে; কৌতুহলবশতঃ দেখতে আসেন।

পরে সমস্ত বিষয়-সম্পত্তি দান করে; বাবার আশ্রমে চলে আসেন। বাবা নতুন নামকরণ করেন-ব্রহ্মানন্দ ভারতী। তাঁর হাতেই প্রথম রচিত হয়- লোকনাথের জীবন কাহিনী ও দর্শন।

পরবর্তীতে কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক বিজয়কৃষ্ণের শিষ্যের লিখিত ” সদগুরু সঙ্গ” প্রামান্য সাধনগ্রন্থ রূপে সমাদৃত হয়। বাবা লোকনাথের অন্যতম প্রধান শিষ্য ছিলেন মথুরা মোহন চক্রবর্তী।

“শক্তি ঔষধালয়” -এর প্রতিষ্টাতা। প্রথম জীবনে ঢাকার রোয়াইল গ্রামে; হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে কাজ করতে করতে আয়ুর্বেদ ঔষধের ব্যবসা শুরু করেন। ঢাকার দয়াগঞ্জে স্বামীবাগ-এ ” শক্তি ঔষধালয়ের” ভিতরে; প্রথম লোকনাথ ব্রহ্মচারীর মন্দির নির্মাণ করেন।

ব্রহ্মানন্দ ভারতীর মতন আরেক ঢাকার জজকোর্টের উকিল হরিহরণ চক্রবর্তীও; বাবার দর্শন করতে এসে বারদী থেকে যান। হরিহরণের গুরুভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে; বাবা লোকনাথ নিজের ব্যবহৃত পাদুকা দান করেন। তিনি কাশীতে বাবা লোকনাথের নামে মন্দির প্রতিষ্টা করেন।

সোনারগাঁর গোবিন্দপুর নিবাসী অখিলচন্দ্র সেন; উচ্ছৃখল জীবনযাপনে অভ্যস্ত এক জমিদার পুত্র। দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ কেন নিঃস্ব এক শ্মশানে থাকা মানুষের কাছে আসেন; তা জানার জন্য তিনি দেখতে আসেন। দূর থেকে দাড়িয়ে প্রায় মাঝে মাঝে এসে দেখে যান।

একদিন বাবার কাছাকাছি এসে নিজের অশান্তির কথা জানান। নিজের কারনে যেসব মানুষকে কষ্ট দিয়েছে; তাদের সে কষ্টের মোচন করার উপদেশ দেন লোকনাথ বাবা।

অখিলচন্দ্র বাড়ি ফিরে গিয়ে; সব সম্পত্তি গ্রামের দুঃখী মানুষের নামে দান করে দেন; এবং নিঃস্ব এক কাপড়ে বাবা লোকনাথের আশ্রমে এসে উপস্থিত হন। বাবার আশীর্বাদে ও সাধনায় তিনি; “সুরথনাথ ব্রহ্মচারী” নামে খ্যাতি লাভ করেন।

বারদী নিবাসী কবিরাজ রামরতন চক্রবর্তীর ছেলে জানকীনাথ। যৌবনে দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হন । পিতা সন্তানকে আর বাঁচানোর আশা না দেখে; বাবা লোকনাথের আশ্রমে ছেলেকে দান করে যান।

বাবা জানকীনাথকে বারদী আশ্রমের দেখাশুনার দায়িত্ব প্রদান করেন। গুরুকৃপায় জানকীনাথ ব্রহ্মচারী এক উচ্চ সাধক হিসাবে প্রতিষ্টিত হন। বাবার নয়নের মনি ছিলেন তিনি, অসম্ভব স্নেহ করতেন জানকীনাথকে। বাবা লোকনাথের সমাধির পাশেই সমাধিস্থ হন জানকীনাথ ব্রহ্মচারী।

বাবা লোকনাথের দেহত্যাগের পরে; ভক্তদের মনে বাবার অভাব পূরণের চেষ্টা চালিয়ে যান জানকীনাথ। কথিত আছে – বাবা দেহত্যাগের আগে; সমস্ত অলোকিক শক্তি জানকীনাথ ব্রহ্মচারীকে দান করে যান।

এবং ভক্তদের বিশ্বাস ছিল যে; জানকীনাথের কাছে জানানো যে কোন আর্জি সরাসরি বাবা লোকনাথের কানে পৌঁছে যাবে। বাবার সমস্ত শিষ্যের মধ্যে; সর্বশ্রেষ্ট হলেন জানকীনাথ ব্রহ্মচারী। তাই তিনি বাবা লোকনাথের সাথে সমভাবে পূজিত হন।

একবার দুই উশৃঙ্খল যুবক আশ্রমবাসীদের অনিষ্ট করার উদ্দেশ্যে আসলে একটি বাঘ গর্জন করতে করতে আশ্রমের দিকে ছুটে আসে। বাঘের ভয়ে তারা পালিয়ে যায় আর বাঘটি ছুটে এসে লোকনাথ বাবার পায়ে লুটিয়ে পড়ে নিজের ভাষায় কী যেন বলতে থাকে।

তখন বাবা বাঘটিকে পরম স্নেহভরে জঙ্গলে ফিরে যেতে বললে বাঘটি চলে যায়। আসলে মুক্ত-পুরুষগণ পশু ও মানুষে সমজ্ঞান করেন এমনকি তাঁরা পশুর ভাষাও বুঝতে পারেন।

জীবনের শেষদিকে তিনি এক যক্ষ্মা-রোগীর প্রতি করুণা পরবশ হয়ে তার সমস্ত রোগ নিজ দেহে গ্রহণ করেন। ফলে ঐ রোগীটি সুস্থ হয়ে উঠেন এবং বাবার দেহে যক্ষ্মার লক্ষণ দেখা যায়।

মৃত্যু শরীরের ধর্ম। এই পরিবর্তনশীল জগতে যার জন্ম আছে তার মৃত্যু সুনিশ্চিত। আমরা বিশ্বাস করি আত্মা অবিনশ্বর। তার জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। লোকনাথ বাবা ব্রহ্মানন্দ ভারতীকে বলেছেন; “আমি মৃত্যুর সময় অতিক্রম করিয়া বাঁচিয়া রহিয়াছি। এই অবস্থায় নিদ্রা আসিলে আমার মৃত্যু ঘটিবে”।

মহাপ্রয়াণের কয়েকদিন আগে ভক্তদের কাছে প্রশ্ন করে বসেন; “বল দেখি, দেহ পতন হলে কিরূপ সৎকার হওয়া ভাল?”। এবং ভক্তদের অগ্নি দ্বারা দগ্ধ করার নির্দেশ দান করেন।

বাবা লোকনাথ ১৯শে জ্যৈষ্ঠে দেহ ত্যাগ করবেন বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সেবার ১৯শে জ্যৈষ্ঠ ছিল রবিবার; সকাল হতে হাজার ভক্তের সমাগম হয় বারদীর আশ্রমে। দুঃখভারাক্রান্ত মনে গোয়ালিনী মা বাল্যভোগ তৈরি করে; নিজ হাতে খাইয়ে দেন লোকনাথ বাবাকে।

ভক্তদের কান্না শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে বাবা বলেন; “ওরে তোরা এত চিন্তায় কাতর হছিস কেন? আমি কি মরে যাব। কেবল এই জীর্ণ পুরাতন শরীরটা পাত হবে; কিন্তু আমি আছি; যেমন তোমাদের মাঝে ছিলাম; ঠিক তেমনই তোদের কাছেই থাকবো।

আমার মৃত্যু নেই। তোরা ভক্তি বিশ্বাস নিয়ে আমাকে একটু আদর করে ডাকলে দেখবি; আমি তোদের কত কাছটিতে আছি; এখনও শুনছি, তখনও শুনব। এ কথা মিথ্যা হবে না”।

সকল ভক্তদের খাবার গ্রহনের নির্দেশ দিয়ে; তিনি আসন গ্রহন করেন। সময় সকাল ১১.৪৫। বেশ কিছুক্ষণ পর বাবার আর কোন নাড়াচড়া না দেখে; ভক্তগণ কান্নায় ভেঙে পড়েন।

বোঝার আর বাকি থাকে না; বারদীর প্রাণপুরুষ আর নেই, শোকের ছায়া নেমে আসে বারদী আশ্রমে। সমবেত কন্ঠে তখন উচ্চারিত হয়; জয় বাবা লোকনাথ- জয় বারদীর ব্রহ্মচারী।