shiva

তিনি দেবাদিদেব মহাদেব। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা কেউ তাঁকে ভয় পান, কেউ তাঁকে ভক্তি করেন, আবার কারোর মতে তিনি সবার চেয়ে আলাদা। কারণ সাধারণত হিন্দু ধর্মে দেবদেবীদের যে ছবি আমরা দেখে অভ্যস্ত, তার থেকে অনেকটাই আলাদা মহাদেব। তিনি বসন-ভূষণে সজ্জিত নন। পরনে বাঘছাল, মাথায় জটা, সারা গায়ে মাখা ছাই। হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী তিন আদি দেবতা হলেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর। এর মধ্যে ব্রহ্মা হলেন সৃষ্টিকর্তা, বিষ্ণু নিয়ন্ত্রক এবং শিব অশুভ শক্তিকে ধ্বংসকারী।

সনাতন ধর্মের শাস্ত্রসমূহে তিনি পরমসত্ত্বা রূপে ঘোষিত। শিব সৃষ্টি-স্থিতি-লয়রূপ তিন কারণের কারণ, পরমেশ্বর- এটা তার প্রণাম মন্ত্রেই বার বার উঠে এসেছে। তিনি জন্মরহিত, শাশ্বত, সর্বকারণের কারণ; তিনি স্ব-স্বরূপে বর্তমান, সমস্ত জ্যোতির জ্যোতি; তিনি তুরীয়, অন্ধকারের অতীত, আদি ও অন্তবিহীন।

অজং শাশ্বতং কারণং কারণানাং
শিবং কেবলং ভাসকং ভাসকানাম্।
তুরীয়ং তমঃপারমাদ্যন্তহীনং
প্রপদ্যে পরং পাবনং দ্বৈতহীনম্।

— শ্রীমদ্ শঙ্করাচার্য, বেদসার শিবস্তোত্রম্

এছাড়াও বেদান্ত অনুসারে তিনিই র মহা ঈশ্বর । শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে বলা হয়েছে – “যদাহতমস্তন্ন দিবা ন রাত্রির্নসন্ন চাসচ্ছিব এব কেবলঃ।

অর্থাৎ যখন আলো ছিল না, অন্ধকারও ছিল না; দিন ছিল না, রাত্রিও ছিল না; সৎ ছিল না, অসৎ ও ছিল না- তখন কেবলমাত্র ভগবান শিবই ছিলেন। উল্লেখ্য বেদান্ত বৈদিক সনাতন ধর্মের ভিত্তি তথা বেদের শিরোভাগ; সম্পূর্ণ বেদান্তে শিব ব্যতীত কারো সম্পর্কে এভাবে বলা হয়নি। শুধুমাত্র শিবের ক্ষেত্রেই বলা হয়েছে “শিব এব কেবলঃ”। সুতরাং সৃষ্টির পূর্বে একমাত্র শিবই বর্তমান ছিলেন। তিনিই লীলাচ্ছলে ব্রহ্মারূপে সৃষ্টি করেন, বিষ্ণুরূপ ধারণ করে পালন করেন আবার রুদ্ররূপ ধারন করে সংহার করেন। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-হর তারই সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের তিনটি রূপভেদ মাত্র। তাই এই তিন রূপের মধ্যে সত্বার কোন পার্থক্য নেই। তবু সনাতন রূপ পরম শিবরূপই মূলস্বরূপ। তাই ভগবান শিব সৃষ্টির প্রাক্ষালে শ্রীবিষ্ণুকে বলেন-

“অহং ভবানয়ঞ্চৈব রুদ্রোহয়ং যো ভবিষ্যতি।
একং রূপং ন ভেদোহস্তি ভেদে চ বন্ধনং ভবেৎ।।
তথাপীহ মদীয়ং শিবরূপং সনাতনম্।
মূলভূতং সদা প্রোক্তং সত্যং জ্ঞানমনন্তকম্।।”(-জ্ঞানসংহিতা)।

অর্থাৎ আমি, তুমি, এই ব্রহ্মা এবং রুদ্র নামে যিনি উৎপন্ন হবেন, এই সকলই এক। এদের মধ্যে কোনো ভেদ নাই, ভেদ থাকলে বন্ধন হত। তথাপি আমার শিবরূপ সনাতন এবং সকলের মূল স্বরূপ বলে কথিত হয়, যা সত্য জ্ঞান ও অনন্ত স্বরূপ।

এজন্য ভগবান বিষ্ণু এবং তার বিভিন্ন অবতারগণ সর্বদা শিব উপাসনাই করতেন। তাই শ্রীকৃষ্ণেরও আরাধ্য ছিলেন পরমেশ্বর শিব। ভগবান শিবের বরেই বিষ্ণু বা কৃষ্ণের ভগবত্বা। তাই হিন্দুধর্মের মূল স্তম্ভ ত্রিশক্তির (ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব) মধ্যে শিবই প্রধান । তিনি সমসাময়িক হিন্দুধর্মের তিনটি সর্বাধিক প্রাচীন সম্প্রদায়ের অন্যতম শৈব সম্প্রদায়ের প্রধান দেবতা। এছাড়া শিব স্মার্ত সম্প্রদায়ে পূজিত ঈশ্বরের পাঁচটি প্রধান রূপের (গণেশ, শিব, সূর্য, বিষ্ণু ও দুর্গা) একটি রূপ। তার বিশেষ রুদ্ররূপ ধ্বংস, সংহার ও প্রলয়ের দেবতা।

সর্বোচ্চ স্তরে শিবকে সর্বোৎকর্ষ, অপরিবর্তনশীল পরম ব্রহ্ম মনে করা হয়। শিবের অনেকগুলি সদাশয় ও ভয়ঙ্কর মূর্তিও আছে। সদাশয় রূপে তিনি একজন সর্বজ্ঞ যোগী। তিনি কৈলাস পর্বতে সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করেন। আবার গৃহস্থ রূপে তিনি পার্বতীর স্বামী। তার দুই পুত্র বর্তমান। এঁরা হলেন গণেশ ও কার্তিক। ভয়ঙ্কর রূপে তাকে প্রায়শই দৈত্যবিনাশী বলে বর্ণনা করা হয়। শিবকে যোগ, ধ্যান ও শিল্পকলার দেবতাও মনে করা হয়। এছাড়াও তিনি চিকিৎসা বিদ্যা ও কৃষিবিদ্যারও আবিষ্কারক।

শিবমূর্তির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল তার তৃতীয় নয়ন, গলায় বাসুকী নাগ, জটায় অর্ধচন্দ্র, জটার উপর থেকে প্রবাহিত গঙ্গা, অস্ত্র ত্রিশূল ও বাদ্য ডমরু। শিবকে সাধারণত ‘শিবলিঙ্গ’ নামক বিমূর্ত প্রতীকে পূজা করা হয়। সমগ্র হিন্দু সমাজে শিবপূজা প্রচলিত আছে। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা রাষ্ট্রে বাংলাদেশের ও পাকিস্তানের কিছু অংশে শিবপূজার ব্যাপক প্রচলন লক্ষিত হয়। সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্রসমূহে শিব পূজা কে সর্বশ্রেষ্ঠও সর্বাধিক ফলপ্রদ বলে বর্ণনা করা হয়ে।

রূপঃ
শিব ও পার্বতী। শিব এখানে ত্রিনয়ন, মস্তকে অর্ধচন্দ্রধারী, সর্প ও নরকরোটির মালা পরিহিত, সর্বাঙ্গে বিভূতি-মণ্ডিত এবং ত্রিশূল ও ডমরুধারী। তাঁর জটাজুট থেকে গঙ্গা প্রবাহিত।

তৃতীয় নয়ন: শিবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল তার তৃতীয় নয়ন। এই নয়ন দ্বারা শিব কামকে ভস্ম করেছিলেন। বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থে শিবের যে ত্র্যম্বকম্ নামটি পাওয়া যায় তার প্রকৃত অর্থ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। ধ্রুপদি সংস্কৃতে অম্বক শব্দের অর্থ চক্ষু; মহাভারতে শিবকে ত্রিনয়ন রূপে কল্পনা করা হয়েছে; তাই উক্ত নামটির আক্ষরিক অর্থ করা হয়ে থাকে “তৃতীয় নয়নধারী”। যদিও বৈদিক সংস্কৃতে অম্বা বা অম্বিকা শব্দের অর্থ মা; এই প্রাচীন অর্থের ভিত্তিতে ত্র্যম্বকম্ নামটির আক্ষরিক অর্থ করা হয়, তিন জননীর সন্তান। ম্যাক্স ম্যুলার ও আর্থার ম্যাকডোনেল শব্দটির শেষোক্ত অর্থটিকেও ধরেছেন।তবে শিবের তিন জননী সংক্রান্ত কোনো কাহিনির প্রচলন নেই। তাই ই. ওয়াশবার্ন হপকিনস মনে করেন, এই নামটির সঙ্গে তিন জননীর কোনো সম্পর্ক নেই; বরং অম্বিকা নামে পরিচিত তিন মাতৃদেবীর সঙ্গে এটি সম্পর্কযুক্ত। শব্দটির অন্য একটি অর্থ করা হয় “যাঁর তিন স্ত্রী বা ভগিনী বর্তমান”। কেউ কেউ মনে করেন, শব্দটি এসেছে রুদ্রের সঙ্গে শিবের সমত্বারোপের ফলস্রুতিতে। কারণ রুদ্রের সঙ্গে দেবী অম্বিকার একটি সম্পর্ক রয়েছে।

অর্ধচন্দ্র: শিবের মস্তকে একটি অর্ধচন্দ্র বিরাজ করে। এই কারণে শিবের অপর নাম চন্দ্রশেখর। রুদ্রের রুদ্র-শিব রূপে বিবর্তনের প্রথম যুগ থেকেই এই অর্ধচন্দ্র শিবের একটি বৈশিষ্ট্য। সম্ভবত বৈদিক ও পরবর্তীকালের সাহিত্যে চন্দ্রদেবতা সোম ও রুদ্রের একীভবনের সূত্রেই শিবের এই বৈশিষ্ট্যটির উদ্ভব ঘটেছিল।

বিভূতি: শিব তার সর্বাঙ্গে বিভূতি বা ভস্ম মাখেন। ভৈরব ইত্যাদি শিবের কয়েকটি রূপ প্রাচীন ভারতীয় শ্মশান বৈরাগ্য দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে সম্পর্কহীন কয়েকটি গোষ্ঠী এই মত অনুযায়ী ধর্মসাধনা করেন। থেরবাথ বৌদ্ধধর্মের পালি ধর্মগ্রন্থেও এই শ্মশান সাধনার উল্লেখ রয়েছে। এই কারণে শিবের অপর নাম শ্মশানবাসী[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ] ও বিভূতিভূষণ।

জটাজুট: শিবের মস্তকের কেশরাশি জটাবদ্ধ। এই কারণে শিবের অপর নাম জটী বা কপর্দী (“কপর্দ বা কড়ির ন্যায় কেশযুক্ত”)।

নীলকণ্ঠ: একবার দেবতা আর অসুর মধ্যে যুদ্ধে অমৃত পানের জন্যে দেবতারা সমুদ্রমন্থন করছিলেন। মন্থনকালের এক পর্যায়ে সমুদ্র থেকে হলাহল বিষ উত্থিত হলে তার বিষাক্ত নির্যাষে দেবতারা অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন। তখন দেবতাদের রক্ষা করার জন্য ভগবান শিব সেই বিষাক্ত বিষ পান করেন। এর ফলে উনার কন্ঠ নীল হয়ে যায়। একারণেই ভগবান শিব নীলকণ্ঠ (সংস্কৃত: नीलकण्ठ) নামে পরিচিত হন।

পবিত্র গঙ্গা: হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, গঙ্গা নদীর উৎস শিবের জটা। এই কারণে শিবের অপর নাম গঙ্গাধর।

ব্যাঘ্রচর্ম: শিবের পরিধেয় বস্ত্র ব্যাঘ্রচর্ম বা বাঘছাল। এই কারণে শিবের অপর নাম কৃত্তিবাস। শিব ব্যাঘ্রচর্মের আসনের উপর উপবিষ্টও থাকেন। উল্লেখ্য, ব্যাঘ্রচর্মের আসন ছিল প্রাচীন ভারতের ব্রহ্মর্ষিদের জন্য রক্ষিত একটি বিশেষ সম্মান।

সর্প: শিবের গলায় একটি সাপ সর্বদা শোভা পায়।এই সাপ হলো শিবের গুরুদেব বলরাম।

ত্রিশূল: শিবের অস্ত্র হল ত্রিশূল।

ডমরু: শিবের হাতে ডমরু নামে একপ্রকার বাদ্যযন্ত্র শোভা পায়। নটরাজ নামে পরিচিত শিবে নৃত্যরত মূর্তির এটি একটি বিশিষ্ট দিক। ডমরুধারণের জন্য নির্দিষ্ট একটি মুদ্রা বা হস্তভঙ্গিমা ডমরুহস্ত নামে পরিচিত। ডমরু কাপালিক সম্প্রদায়ের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

নন্দী: নন্দী নামে একটি পৌরাণিক ষাঁড় শিবের বাহন। শিবকে পশুদের দেবতা মনে করা হয়। তাই তার অপর নাম পশুপতি। আর. কে. শর্মার মতে, পশুপতি শব্দটির অর্থ “গবাদি পশুর দেবতা”। অন্যদিকে ক্র্যামরিক এই নামটিকে প্রাচীন রুদ্রের অভিধা আখ্যা দিয়ে এর অর্থ করেছেন “পশুদের দেবতা”।

গণ: শিবের অনুচরদের গণ বলা হয়। এঁদের নিবাসও কৈলাস। এঁদের ভৌতিক প্রকৃতি অনুসারে ভূতগণ নামেও অভিহিত করা হয়। এঁরা সাধারণত দয়ালু। কেবল কোনো কারণে তাদের প্রভু ক্রুদ্ধ হলে এঁরা প্রভুর সঙ্গে ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠেন। শিব স্বীয় পুত্র গণেশকে তাদের নেতা মনোনীত করেন। এই কারণেই গণেশ গণপতি নামে অভিহিত হন।

কৈলাস: হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, শিবের অধিষ্ঠান হিমালয়ের কৈলাস পর্বতে। হিন্দুপুরাণ অনুসারে, লিঙ্গাকার কৈলাস পর্বত মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত।

বারাণসী: বারাণসী শিবের প্রিয় নগরী। এই নগরী হিন্দুদের পবিত্রতম তীর্থগুলির অন্যতম। হিন্দু ধর্মগ্রন্থে এই নগরী কাশীধাম নামে পরিচিত।

এতক্ষণ আমরা মহাদেব সম্পর্কে জানলাম। চলুন এখন দেখে নিই মহাদেব চম্পক চতুর্দশীতে দেবাদিদেব মহাদেব এর পূজা সম্পর্কে।

champak

চম্পক চতুর্দশী ব্রতে শিব পূজাঃ
জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা চতুর্দশী তিথিতে চম্পকফুল দ্বারা দেবাদিদেব মহাদেব এর ব্রত করার নামই হল চম্পক চতুর্দশী। চম্পক একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ চাঁপা বা চম্পা। এই দিনে চম্পক পুষ্প দ্বারা শিবের পূজা করলে, ক্ষয়কাসাদি মহারোগ হতে মুক্ত হওয়া যায়, পরদ্রোহাদি-জনিত দশজন্মার্জিত পাপ বিনষ্ট হয়। অর্থাৎ এই তিথিতে দেবাদিদেব মহাদেবকে চাঁপা ফুল বা চম্পা ফুল দিয়ে পূজো করলে মহারোগ ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, দশজন্মার্জিত পাপ বিনষ্ট হয়, গ্রহ দোষ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, ভক্তের সকল মনোবাসনা পূর্ণ হয় এবং অন্তে শিবলোক প্রাপ্তি হয়। এইব্রত চার বছর ধরে উদযাপন করতে হয়।

পূজা উপাচারঃ শিবপূজার ন্যূনতম আয়োজন অবশ্যই করতে হবে। যারা সামর্থবান তারা ষোড়শ উপচারে ও চম্পক পুষ্প দ্বারা শিবের পুজা করবেন। অর্থাৎ চম্পক পুষ্প (চাঁপাফুল), পঞ্চামৃত ও ন্যূনতম শিব পূজার আয়োজন।

পূজা পদ্ধতিঃ ত্রয়োদশীতে আহার পূর্বক চতুর্দশীতে উপবাস বাঞ্চনীয় (অন্তত পূজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত)। অপারগতায় নিরামিষ আহার। প্রথমে স্নান পূর্বক পূতঃ পবিত্র হয়ে প্রথমে স্বস্তিবাচন করে সঙ্কল্প করবেন ।

champak

সংকল্প মন্ত্রঃ

ওঁ তৎসদদ্য জ্যৈষ্ঠে মাসি শুক্লে পক্ষে
চতুর্দ্দশ্যান্তিথৌ অমুকগোত্ৰঃ
শ্ৰীঅমুকদেবশর্ম্মা শিবলোকপ্রাপ্তিকামঃ
(অথবা দুরারোগ্য-রোগবিমুক্তি-কামো)
চম্পকপুস্পৈঃ শিবপূজামহং করিষ্যে ।

এখানে অমুকগোত্ৰঃ এ অমুক এর স্থলে নিজ গোত্র এবং শ্ৰীঅমুকদেবশর্ম্মা এ অমুক এর স্থলে নিজের নাম (স্ত্রী হলে দেবীশর্ম্মা)

পরে সুক্তপাঠ করে আসনশুদ্ধ করে নিতে হবে। গণেশ ও অন্যান্য দেবগণের পূজা পূর্বক ধ্যান করতে হবে। এই পঞ্চামৃত দিয়ে ভগবান শিবকে অভিষেক করাতে হবে। অভিষেক করার সময় নিমোক্ত মন্ত্রটি পাঠ করবেনঃ

অভিষেক মন্ত্রঃ

ওঁ ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্।
উর্বারুকমিব বন্ধনান্মৃত্যোর্মুক্ষীয় মাঽমৃতাৎ।।
ওঁ তৎপুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ ওঁ।

তারপর নিম্নোক্ত প্রণাম মন্ত্রটি পাঠ করবেনঃ

ওঁ নমঃ শিবায়ঃ
নমঃ শিবায় শান্তায় কারুণাত্রায়
হেতবে নিবেদিতামি চাত্মানং ত্বং গত্বিং পরমেশ্বর॥
সরলার্থ : তিন কারণের (সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের) হেতু শান্ত শিবকে প্রণাম । হে পরমেশ্বর তুমিই পরমগতি । তোমার কাছে নিজেকে সমর্পণ করি ।

পরিশেষে শিব গায়ত্রী মন্ত্র পাঠ করতে হবে। শিব গায়ত্রী মন্ত্র নিম্নে দেওয়া হলঃ

ওঁ তৎপুরুষায় বিদ্মহে
মহাদেবায় ধীমহি
তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ ওঁ।

এরপর শিবের নিম্নোক্ত ধ্যান মন্ত্রটি পাঠ করবেন।

ধ্যান মন্ত্রঃ

ওঁ ধ্যায়েন্নিত্যং মহেশং রজতগিরিনিভং চারুচন্দ্রাবতংসং
রত্নাকল্পোজ্জ্বলাঙ্গং পরশুমৃগবরাভীতিহস্তং প্রসন্নম্।
পদ্মাসীনং সমন্তাৎ স্তুতমমরগণৈর্ব্যাঘ্রকৃত্তিং বসানং
বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজং নিখিলভয়হরং পঞ্চবক্ত্রং ত্রিনেত্রম্।।

তারপর আপনার পূজা ব্রত সমাপ্ত হবে। পারতঃ পক্ষে সারাদিন উপবাস থাকবেন অপারগতায় সারাদিন নিরামিষ ভোজন করবেন।

shiva-ovishek

পঞ্চামৃতঃ
এই পঞ্চামৃত (আক্ষরিক অর্থ: পাঁচ অমৃত) হচ্ছে বিভিন্ন পার্বণ ও পূজায় ব্যবহার করা পাঁচটি খাদ্যের এক মিশ্রণ যেগুলি হল প্ৰধানতঃ দুধ , দই , ঘৃত , মধু আর চিনি একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরী করা হয় । এই পঞ্চামৃত দিয়েই ভগবানের স্নান অভিষেক করা হয়ে থাকে । এই পাঁচ প্রকার মিশ্রনে তৈরী পঞ্চামৃত অনেক রোগ নিরাময়ের জন্য লাভদায়ক হয় আর মনকেও শান্তি প্রদান করে থাকে । অঞ্চলভেদে এই মিশ্রণ প্রক্রিয়া ভিন্ন হতে দেখা যায় এবং এর সঙ্গে অন্য খাদ্যও মিশ্রিত করতে দেখা যায়। দক্ষিণ ভারতের বহু জায়গায় পাকা কলা মিশ্রিত করা হয়।

পঞ্চামৃতের আধ্যাত্মিক অর্থ হলো – এই পঞ্চামৃত আত্মোন্নতির পাঁচ প্রতীক –

দুধ = দুধ হচ্ছে পঞ্চামৃতের প্রথম ভাগ । এই দুধ হচ্ছে শুভ্রতার প্রতীক । অর্থাৎ আমাদের জীবন দুধের মতো নিষ্কলঙ্ক হওয়া চাই ।
দই = দই – এর গুন হলো এটা অন্যকে নিজের মতো বানায় । দই ঢালার অর্থ হলো প্রথমে আমরা নিষ্কলঙ্ক হয়ে সৎগুন ধারন করে অন্যকেও নিজের মতো তৈরী করা ।
ঘৃত = ঘী স্নিগ্ধতা আর স্নেহের প্রতীক । সবার সঙ্গে আমাদের স্নেহযুক্ত সম্বন্ধ হউক এই ভাবনাই ।
মধু = মধু মিষ্টি হওয়ার সাথে সাথে শক্তিশালীও হয় । নির্বল ব্যক্তি জীবনে কিছুই করতে পারে না । দেহ আর মন থেকে শক্তিশালী ব্যক্তিই জীবনে সফলতা পেতে পারেন ।
চিনি = চিনির গুন হলো মিষ্টতা । চিনি ঢালার অর্থ হলো জীবনে মিষ্টতা আনো । মিষ্টি কথা সবারই ভাল লাগে , আর তাতে মধুর ব্যবহার তৈরী হয় । কিছু মানুষ শর্করার বদলে চিনি ব্যবহার করেন, যা সকলের জন্য গ্ৰহণযোগ্য নয়, কেননা চিনি গুড়ের মত প্রাকৃতিকভাবে প্রস্তুত করা হয় না এবং কখনো কখনো চিনি অস্থি-অঙ্গার দ্বারা পরিস্রাবণ করা হয় ফলত ইহা পূজার জন্য অযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়।

তামিলনাডুর পালানি মুরুগান মন্দিরে অভিষেক ও প্রসাদ হিসাবে পঞ্চামৃত ব্যবহার করা হয়। এই পঞ্চামৃতে কলা, চিনি, ঘি, মধু, শুকনো খেজুর, এলাচ এবং চিনি গুটি থাকে। কেরালাবাসীরা নারকেলও মিশ্রিত করে ব্যবহার করে। কিছুলোককে পঞ্চামৃতে আঙুর দিতে দেখা যায়।

উপরোক্ত গুনগুলিই আমাদের জীবনে সফলতা এনে দেয় । পঞ্চামৃত পান করলে শরীর পুষ্টি আর রোগমুক্ত হয় । পঞ্চামৃত ঠিক ততটুকু মাত্রায়ই সেবন করা উচিৎ যতটুকু মাত্রায় সেবন করা উচিৎ , তার অতিরিক্ত নয়।

champak-chaturdashi

সাধারণ শিব পূজার পূজাসামগ্রী ও সাধারণ নিয়মকানুন

এই জিনিসগুলি সাজিয়ে নিয়ে পূজা করতে বসবেন।—

১। একটি শিবলিঙ্গ।
২। একটি ছোটো ঘটিতে স্নান করানোর জল।
৩। একটি থালা, একটি গ্লাস ও কোশাকুশি। কোশাকুশি না থাকলে তামা বা পিতলের সাধারণ ছোটো পাত্র ব্যবহার করবেন।
৪। একটু সাদা চন্দন।
৫। একটুখানি আতপ চাল।
৬। কয়েকটি ফুল ও দুটি বেলপাতা (বেলপাতা না থাকলে দুটি তুলসীপাতা দিতে পারেন)।
৭। ধূপ, দীপ।
৮। নৈবেদ্য ও পানীয় জল (আপনার সাধ্য ও ইচ্ছামতো দেবেন। একটা বাতাসা হলেও চলবে।)
৯। প্রণামী (অন্তত একটি টাকা দেবেন। ইচ্ছা করলে বেশিও দিতে পারেন।)
১০। একটি ঘণ্টা।

উপচার সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞাতব্য হল এই যে, চন্দন, ফুল-বেলপাতা, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য এই পঞ্চোপচার পূজার ক্ষেত্রে অপরিহার্য্য। কোনো একটি উপচারের অভাব ঘটলে, সেই উপচারের নাম করে একটু জল দিলেও চলবে। আপনার প্রকৃত ভক্তিই সেই অভাব পূর্ণ করবে, এই কথা জানবেন। শিবপূজা সর্বদা উত্তরমুখে বসে করবেন এবং শিবলিঙ্গকেও উত্তরমুখী করে রাখবেন। উত্তরদিক ব্রহ্মলোকপথ। তাই পরমব্রহ্মময় শিবের পূজা সর্বদা উত্তরমুখে বসে করাই নিয়ম। শিবলিঙ্গকে তামা বা পাথরের পাত্রে বসানো হয়ে থাকে।

পূজার সাধারণ ক্রম ও সেই সব ক্রিয়াকাণ্ডের অর্থঃ
মন্ত্রপাঠ ও ক্রিয়াকাণ্ড অর্থ জেনে করাই উচিত। তাই পূজাপদ্ধতি-বলার আগে তার ক্রম ও ক্রিয়াকাণ্ডের ভাবার্থ বলে দেওয়া ভাল। প্রথমেই আচমন করতে হয়। দেহ ও মন শুদ্ধ না হলে ঈশ্বরপূজার অধিকার জন্মায় না। তাই পূজার সময় প্রথমেই দেহ ও মন শুদ্ধ করতে হয়। দেহ ও মন শুদ্ধ করব কিভাবে? এর উপায় বিষ্ণুস্মরণ। আচমনের মন্ত্রের অর্থটি তাই—‘ আকাশে সূর্যের মতো বিদ্যমান ঈশ্বরকে ব্রহ্মজ্ঞরা সর্বদা দর্শন করেন, আমরাও যেন তাঁর স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারি। যে বিষ্ণু সকল অপবিত্রতা দূর করেন, সেই বিষ্ণুকে স্মরণ করে আমরাও যেন দেহে ও মনে শুদ্ধ হতে পারি।’ তারপর স্বস্তিবাচন। স্বস্তিবাচন হল পূজার সাফল্য ও অপরের কল্যাণ কামনা। অপরের কল্যাণ কামনা না করলে কোনো পূজা ফলপ্রসূ হয় না। অপরের অকল্যাণ কামনা করে পূজা করলে, নিজেরই অকল্যাণ হয়। তাই পূজার আগে বিশ্বের সকলের কল্যাণ কামনা করতে হয়।

তারপর জলশুদ্ধি করতে হয়। জলশুদ্ধি আর কিছুই না, যে জলে দেবতার পূজা হয়, সেই জলে তীর্থের আবাহন। জলশুদ্ধির মন্ত্রে সূর্যমণ্ডল থেকে গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু, কাবেরী—এই সপ্ত পবিত্র নদীদেবীকে জলে আহ্বান করে জলকে শুদ্ধ করে নেওয়া হয়। সেই জল নিজের মাথায় দিলে তীর্থস্নানের ফল হয় আর পূজাদ্রব্যের উপর দিলে সেই সব দ্রব্য শুদ্ধ হয়ে যায়। তারপর সূর্যার্ঘ্য দিতে হয়। সূর্য আমাদের প্রাণের উৎস, সে কথা আধুনিক বিজ্ঞানও মানে। তাই হিন্দুদের পূজার আগে সূর্যকে অর্ঘ্য দিয়ে প্রণাম করার নিয়ম। প্রত্যক্ষ দেবতার প্রতি এ আমাদের বিশেষ শ্রদ্ধাপ্রদর্শন। এরপর গুরুদেব, পঞ্চদেবতা, নবগ্রহ, ইন্দ্রাদি দশদিকপাল, দশমহাবিদ্যা, দশাবতার ও ইষ্টদেবতা এবং সর্বদেবদেবীর পূজা। এর মাধ্যমে অন্যান্য দেবদেবীদেরও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়। আপনার ঠাকুরের আসনে অন্যান্য ঠাকুরদেবতার ছবি বা বিগ্রহ থাকলে, তাঁদেরও এই সময় পূজা করে নেবেন।

shiva-puja

তারপর শিবকে স্নান করানো হয়। এখান থেকেই প্রধান পূজা শুরু। স্নানের পর শিবের ধ্যান করে প্রথমে মনে মনে ও পরে উপচারগুলি নিবেদন করে পূজা করবেন। এই সব উপচারই তো ঈশ্বরের সৃষ্ট। তবে এগুলি দিয়ে কেন ঈশ্বরের পূজা করা হয় কেন? কেনই বা এই সব উপচার দেওয়ার নিয়ম। ঈশ্বর আমাদের মালিক, আমরা তাঁর দাস। আমাদের বাড়ির কাজের লোক, নিজের বাড়ি থেকে জিনিসপত্র এনে আমাদের ঘরের কাজ করে দেয়? আমাদেরই তাকে সামগ্রী জোগাতে হয়। সেই সামগ্রী দিয়ে সে আমাদেরই সেবা করে। ঈশ্বর তেমনই জগতের সব কিছু সৃষ্টি করেছেন, সেই সৃষ্টি দিয়ে যেন আমরা তাঁর সেবা করতে পারি। যে পঞ্চোপচার পূজার কথা বলা হয়েছে, সেই পঞ্চোপচার—অর্থাৎ, গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য হল আমাদের প্রাণধারণের প্রধান অবলম্বন পৃথিবী, আকাশ, বায়ু, আগুন ও জলের প্রতীক। এই সব উপচার দেওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা মনে করি, ঈশ্বরের সৃষ্টি এই সব জিনিস আমরা ঈশ্বরের প্রসাদ রূপে গ্রহণ করছি, স্বার্থপরভাবে আপনার সুখের জন্য ভোগ করছি না। উপরন্তু স্বয়ং আমাদের এইভাবেই তাঁর পূজা করতে শিখিয়েছেন। একথাও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। পূজার পর জপ করা হয়। জপমাহাত্ম্য দীক্ষিত ব্যক্তিমাত্রেই জানেন, তাই তা আর বলা হল না। জপের পর প্রণাম। প্রণাম করার আগে প্রণামী দেওয়া হয়। এটিও প্রতীকী। আমাদের অর্থাগম হয় ঈশ্বরের কৃপায়, তাই অর্থের অহংকারে আমরা যেন ঈশ্বরকে না বিস্মৃত হই এবং ঈশ্বরের দেওয়া অর্থে ঈশ্বরের সেবায় কোনো কার্পণ্য না দেখাই। অন্য মতে, ঈশ্বরকে আমরা যা দিই, তাই ঈশ্বর সহস্রগুণে আমাদের ফিরিয়ে দেন। প্রণামীর টাকা নিজের কোনো কাজে ব্যবহার করবেন না। বরং গরিবদুঃখীকে দেবেন। তাতে ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’ হবে। কিন্তু এটি সকাম ভক্তদের মত। পূজার পর স্তবপাঠাদি করা হয়। এতে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি বাড়ে। ঈশ্বরও স্তবপাঠ শুনে প্রসন্ন হন।

পূজাপদ্ধতিঃ

প্রথমে স্নান ও গুরুনির্দেশিত উপাসনাদি সেরে আসনে বসে শিব ও দুর্গাকে প্রণাম করবেন। তারপর শ্রীগুরু ও ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করে ইষ্টমন্ত্র যথাশক্তি জপ করবেন। অদীক্ষিত ও বালকবালিকারা শুধু স্নান সেরে শিবদুর্গাকে প্রণাম করে বসবেন। পূজাস্থান আগেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ধূপদীপ জ্বালিয়ে নেবেন। তারপর নারায়ণকে মনে মনে নমস্কার করে পূজা শুরু করবেন।

মন্ত্রপাঠ সহ পূজাঃ 

হাতের তালুতে দু-এক ফোঁটা জল নিয়ে ‘ওঁ বিষ্ণু’ মন্ত্রে পান করবেন। মোট তিন বার এইভাবে জল পান করতে হবে। তারপর করজোড়ে বলবেন—

ওঁ তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ দিবীব চক্ষুরাততম্।
ওঁ অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাবস্থাং গতোঽপি বা।
যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ।।

তারপর পবিত্র বাদ্য ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে স্বস্তিবাচন করবেন—

ওঁ কর্তব্যেঽস্মিন্ শ্রীশিবপূজাকর্মণি ওঁ পূণ্যাহং ভবন্তো ব্রুবন্তু।
ওঁ পূণ্যাহং ওঁ পূণ্যাহং ওঁ পূণ্যাহং।
ওঁ কর্তব্যেঽস্মিন্ শ্রীশিবপূজাকর্মণি ওঁ স্বস্তি ভবন্তো ব্রুবন্তু।
ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি।
ওঁ কর্তব্যেঽস্মিন্ শ্রীশিবপূজাকর্মণি ওঁ ঋদ্ধিং ভবন্তো ব্রুবন্তু।
ওঁ ঋদ্ধতাম্ ওঁ ঋদ্ধতাম্ ওঁ ঋদ্ধতাম্।
ওঁ স্বস্তি ন ইন্দ্রো বৃদ্ধশ্রবাঃ স্বস্তি নঃ পূষা বিশ্ববেদাঃ।
স্বস্তি নস্তার্ক্ষ্যো অরিষ্টনেমিঃ স্বস্তি নো বৃহস্পতির্দধাতু।
ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি।

এরপর হাত জোড় করে বলবেন—

ওঁ সূর্যঃ সোমো যমঃ কালঃ সন্ধ্যে ভূতান্যহঃ ক্ষপা।
পবনো দিক্‌পতির্ভূমিরাকাশং খচরামরাঃ।
ব্রাহ্মং শাসনমাস্থায় কল্পধ্বমিহ সন্নিধিম্।।

এরপর জলশুদ্ধি করে নেবেন। জলশুদ্ধির মাধ্যমে সূর্যমণ্ডল থেকে সকল তীর্থকে জলে আহ্বান করে জলকে পবিত্র করা হয়। তারপর সেই পবিত্র জলে পূজার কাজ হয়। ঠাকুরের সামনে নিজের বাঁ হাতের কাছে কোশা রেখে তাতে জল দেবেন। সেই জলে আলতো করে ডান হাতের মধ্যমা আঙুল ঠেকিয়ে (নখ যেন না ঠেকে) বলবেন— ওঁ গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরি সরস্বতি। নর্মদে সিন্ধু-কাবেরি জলেঽস্মিন সন্নিধিং কুরু। তারপর সেই জলে একটা সচন্দনফুল দিয়ে মনে মনে তীর্থদেবতাদের পূজা করবেন। এতে সকল তীর্থের পূজা করা হয়ে যায়। তীর্থপূজা সেরে নিয়ে সেই জল নিজের মাথায় একটু দেবেন। তারপর পূজার সকল দ্রব্যে ছিটিয়ে সব কিছু শুদ্ধ করে নেবেন। তারপর সূর্যের উদ্দ্যেশ্যে একটু জল শিবলিঙ্গে দেবেন। সূর্যকে জল দিয়ে সূর্যপ্রণাম করবেন—

ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্।
ধ্বান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোঽস্মি দিবাকরম্।।

তারপর একে একে গণেশ, শ্রীগুরু, শিব, সূর্য, নারায়ণ, দুর্গা, নবগ্রহ, দশমহাবিদ্যা, দশাবতার, সর্বদেবদেবী ও আপনার ঠাকুরের আসনে অন্যান্য ঠাকুরদেবতা থাকলে তাঁদেরকে এবং আপনার ইষ্টদেবতাকে প্রত্যেককে একটি করে সচন্দন ফুল দিয়ে পূজা করবেন। অত ফুল না থাকলে প্রত্যেকে নামে জলশুদ্ধির জল একটু করে শিবলিঙ্গে দেবেন। শিবলিঙ্গে সব দেবদেবীর পূজা হয়, তাই কোনো দেবতার ছবি বা মূর্তি আপনার কাছে না থাকলে তাঁর বা তাঁদের পূজা শিবলিঙ্গেই করতে পারেন।

তারপর শিবঠাকুরকে স্নান করাবেন। একঘটি জল নেবেন। তাতে জলশুদ্ধির জল একটু মিশিয়ে নিতে পারেন বা জলশুদ্ধির পদ্ধতিতে সেই জলটিকেও শুদ্ধ করে নিতে পারেন। তারপর স্নানের মন্ত্রটি পড়ে বাঁ হাতে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে স্নান করাবেন। স্নানের মন্ত্রটি হল—

ওঁ ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্।
উর্বারুকমিব বন্ধনান্মৃত্যোর্মুক্ষীয় মাঽমৃতাৎ।।
ওঁ তৎপুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ ওঁ।

স্নান করিয়ে শিবের ধ্যান করবেন (ধ্যানের মন্ত্রটি বঙ্গানুবাদ সহ শেষে দেওয়া আছে) চোখ বন্ধ করে শিবের রূপটি চিন্তা করতে করতে ধ্যানমন্ত্রটি স্মরণ করে ধ্যান করতে পারেন। মন্ত্রটি মুখস্ত না থাকলে, প্রথমে একবার পাঠ করে নিয়ে চোখ বুজে শিবের রূপ ধ্যান করবেন। এইভাবে কয়েক বার করলেই মন্ত্র মুখস্ত হয়ে যাবে, তখন আর মন্ত্রপাঠ না করলেও চলবে। ধ্যানের সময় ভাববেন, আপনি চন্দন, ফুল, বেলপাতা, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য দিয়ে সাক্ষাৎ শিবের পূজা করছেন। শিবঠাকুরও প্রসন্ন হয়ে আপনার পূজা নিচ্ছেন। এইভাবে কিছুক্ষণ ধ্যান করে পঞ্চোপচারে পূজা করবেন। প্রথমে একটি ফুলে চন্দন মাখিয়ে গন্ধদ্রব্য দেবেন। মন্ত্র—ওঁ নমো শিবায় এষ গন্ধঃ শিবায় নমঃ। তারপর আবার একটি সচন্দন ফুল দিয়ে বলবেন— ওঁ নমো শিবায় ইদং সচন্দনপুষ্পং শিবায় নমঃ। তারপর চন্দনমাখানো বেলপাতা নেবেন— ওঁ নমো শিবায় ইদং সচন্দনবিল্বপত্রং শিবায় নমঃ।—মন্ত্রে বেলপাতাটি শিবের মাথায় দেবেন। তারপর ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য ও জল দেবেন—ওঁ নমো শিবায় এষ ধূপঃ শিবায় নমঃ। ওঁ নমো শিবায় এষ দীপঃ শিবায় নমঃ।ওঁ নমো শিবায় ইদং সোপকরণনৈবেদ্যং শিবায় নিবেদয়ামি। ওঁ নমো শিবায় ইদং পানার্থোদকং শিবায় নমঃ। মালা থাকলে ‘ওঁ নমো শিবায় ইদং পুষ্পমাল্যং শিবায় নমঃ’ মন্ত্রে পরাবেন। তারপর সচন্দন ফুল ও বেলপাতা নিয়ে ১, ৩ বা ৫ বার নিম্নোক্ত মন্ত্রে পুষ্পাঞ্জলি দেবেন—ওঁ নমো শিবায় এষ সচন্দনপুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলি নমো শিবায় নমঃ। এরপর অঙ্গপূজা করতে হয়। অঙ্গপূজা হল শিবের পরিবার ও সাঙ্গোপাঙ্গোদের পূজা।—

ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ গৌর্যৈ নমঃ।
ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ অষ্টমূর্তিভ্যো নমঃ।
ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ ব্রাহ্ম্যাদ্যাষ্টমাতৃকাভ্যো নমঃ।
ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ গণেভ্যো নমঃ।
ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ওঁ বৃষভায় নমঃ।

এই পাঁচটি মন্ত্র পড়ে প্রত্যেকের নামে একটি করে ফুল বা একটু করে জলশুদ্ধির জল দেবেন।

তারপর আপনার গুরুমন্ত্র ১০৮ বার জপ করবেন। জপ করে হাতে একটু জল নিয়ে শিবকে দিয়ে বলবেন, এই নাও আমার জপের ফল, আমি তোমাকেই সমর্পণ করলাম।

তারপর ঠাকুরকে একটি টাকা (ইচ্ছা করলে বেশিও দিতে পারেন) প্রণাম করবেন—

নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয়হেতবে।
নিবেদয়ামি চাত্মানং গতিস্তং পরমেশ্বরম্।।

পূজার পর সময় পেলে শিবের স্তবস্তোত্রাদিও পাঠ করতে পারেন।

মন্ত্রপাঠে অসমর্থ ব্যক্তিদের জন্যঃ
প্রথমে মনে মনে বিষ্ণুকে স্মরণ করে বলবেন—‘হে ঈশ্বর, তোমাকে আকাশের সূর্যের মতো যেন দেখতে পাই। তুমি পতিতপাবন, আমার সব পাপ মার্জনা করে, আমাকে দেহ ও মনে শুদ্ধ করে তোমার পূজার উপযোগী করে নাও।’ তারপর সর্বান্তকরণে বিশ্বের সকলের কল্যাণ কামনা করবেন। তারপর গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু ও কাবেরী—এই সাত নদীমাতাকে পাত্রের জলে আহ্বান করবেন। মনে করবেন, তাঁরা যেন সূর্যমণ্ডল থেকে নেমে এসে সেই জলে অবস্থান করলেন। তারপর একটি চন্দন-মাখানো ফুল দিতে তাঁদের পূজা করবেন। সেই জল মাথায় নেবেন, সকল পূজাদ্রব্যের উপর ছিটিয়ে দেবেন। পানের জল ছাড়া পূজার সব কাজে যেখানে জল দেওয়ার কথা আছে, সেখানে এই জলই দেবেন। তারপর কুশীতে করে একটু জল নিয়ে সূর্যের উদ্দেশ্যে দেখিয়ে শিবলিঙ্গের উপর দেবেন। সূর্যকে প্রণাম করবেন। তারপর একে একে গণেশ, শ্রীগুরু, শিব, সূর্য, নারায়ণ, দুর্গা, নবগ্রহ, দশমহাবিদ্যা, দশাবতার, সর্বদেবদেবী ও আপনার ঠাকুরের আসনে অন্যান্য ঠাকুরদেবতা থাকলে তাঁদেরকে এবং আপনার ইষ্টদেবতাকে প্রত্যেককে একটি করে সচন্দন ফুল দিয়ে পূজা করবেন। অত ফুল না থাকলে প্রত্যেকে নামে জলশুদ্ধির জল একটু করে শিবলিঙ্গে দেবেন। এবার ঘণ্টা বাজিয়ে এক ঘটি জলে শিবঠাকুরকে স্নান করাবেন। স্নানের জলে ওই সাত নদীমাতাকে আহ্বানকরা তীর্থজল একটু মিশিয়ে নেবেন। তারপর শিবের ধ্যানমন্ত্রটির বাংলা অর্থ ধরে মনে মনে তাঁর মূর্তিচিন্তা করবেন, ভাববেন তিনি আপনার হাত থেকে চন্দন, ফুল-বেলপাতা, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য গ্রহণ করছেন। তারপর একে একে ‘ওঁ নমো শিবায়’ বলে বলে ওই সকল উপচার শিবলিঙ্গে দেবেন বা শিবকে দেখাবেন। মালা থাকলে পরাবেন। তারপর পুষ্পাঞ্জলি দেবেন। কোনো উপচার না থাকলে, সেই উপচারের নাম করে জল দেবেন। তারপর মা গৌরী ও শিবের সাঙ্গোপাঙ্গোদের নামে দুটি ফুল বা একটু জল দেবেন শিবলিঙ্গে। তারপর জপ করে হাতে একটু জল নিয়ে সেই জল শিবকে দিয়ে বলবেন, এই নাও আমার জপের ফল আমি তোমাকে দিলাম। তারপর ‘ওঁ নমো শিবায়’ মন্ত্রেই প্রণামী দিয়ে প্রণাম করবেন। সকল কাজই ভক্তিসহকারে করবেন। ঈশ্বর আপনার পূজা অবশ্যই গ্রহণ করবেন, এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখবেন।

ধ্যানমন্ত্রঃ

ওঁ ধ্যায়েন্নিত্যং মহেশং রজতগিরিনিভং চারুচন্দ্রাবতংসং রত্নাকল্পোজ্জ্বলাঙ্গং পরশুমৃগবরাভীতিহস্তং প্রসন্নম্।
পদ্মাসীনং সমন্তাৎ স্তুতমমরগণৈর্ব্যাঘ্রকৃত্তিং বসানং বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজং নিখিলভয়হরং পঞ্চবক্ত্রং ত্রিনেত্রম্।।
ওঁ তৎপুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ ওঁ।

বাংলা অর্থ— রজতগিরির ন্যায় তাঁহার আভা, যিনি সুন্দর চন্দ্রকে ভূষণরূপে ধারণ করিয়াছেন, যাঁহার দেহ রত্নময় বেশভূষায় উজ্জ্বল, যিনি পদ্মাসনে উপবিষ্ট, আনন্দময় মূর্তি, চতুর্দিকে দেবতারা তাঁহার স্তব করিতেছেন, যিনি ব্যাঘ্রচর্ম- পরিহিত, যিনি জগতের আদি, জগতের কারণ, সকল প্রকার ভয় নাশক, পঞ্চবদন এবং প্রতিটি বদনে তিনটি চক্ষু, সেই মহেশকে নিত্য এইরূপ ধ্যান করিবে।