ভাইফোঁটা হিন্দুদের একটি চিরন্তন সম্প্রীতির উৎসব। এই উৎসবের নাম ‘ভ্রাতৃদ্বিতীয়া’। এই উৎসবের আরও একটি নাম হল যমদ্বিতীয়া। ভাই-বোনের ভালবাসার বন্ধন অনন্তকাল অটুট রাখার জন্য বংশপরম্পরায় এই বিশেষ উৎসব পালিত হয়। ভাই-বোনের নিঃস্বার্থ ও স্বর্গীয় ভালবাসার প্রতীক এই ভাইফোঁটা আমাদের মনে শান্তি, সৌভাতৃত্ববোধ এবং ঐক্যের এক চমকপ্রদ আবেশ সৃষ্টি করে। এই উৎসবের পোষাকি নাম ভ্রাতৃদ্বিতীয়া অনুষ্ঠান। কার্তিক মাসের শুক্লাদ্বিতীয়া তিথিতে (কালীপূজার দুই দিন পরে) এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বাঙালি হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, এই উৎসব কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের ২য় দিনে উদযাপিত হয়। মাঝেমধ্যে এটি শুক্লপক্ষের ১ম দিনেও উদযাপিত হয়ে থাকে। পশ্চিম ভারতে এই উৎসব ভাইদুজ নামেও পরিচিত। সেখানে ভ্রাতৃদ্বিতীয়া পাঁচ-দিনব্যাপী দীপাবলি উৎসবের শেষদিন। আবার, মহারাষ্ট্র, গোয়া ও কর্ণাটকে ভাইফোঁটাকে বলে ভাইবিজ। নেপালে ও পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে এই উৎসব পরিচিত ভাইটিকা নামে। সেখানে বিজয়াদশমীর পর এটিই সবচেয়ে বড় উৎসব।

বাঙলার ঘরে ঘরে ভাইফোঁটাকে ঘিরে নানা লোকাচার। কারও ফোঁটা আবিরে, কারও শিশিরে। কেউ ভাইকে ফোঁটা পরান চন্দনে কেউ বা ঘি, দই দিয়ে। খাবার দাবার নিয়েও কত নিয়ম। কেউ ভাইকে পান ছেঁচে তবে খেতে দেন। কারণ, পান চিবোতে ভাইয়ের কষ্ট হতে পারে। আবার কোথাও কোথাও ভাইকে নিমপাতা খাইয়ে বিপদ থেকে রক্ষা করা হয়। সব শেষে অবশ্য এক থালা মিষ্টি থাকেই। আর দুপুরে বা রাতে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়।

ভাইফোঁটাকে দেখা যেতে পারে সূর্য-সংক্রান্ত উৎসবের প্রেক্ষিতেও। এই যে চন্দনের ফোঁটা দেওয়া, সে আদতে সূর্যের রূপক। অবাঙালিরা যে রোলির তিলক আঁকেন, তার লাল রঙেও নিহিত রয়েছে সূর্যের তেজ। ধান-দূর্বা বা চালের অনুষঙ্গেও ফিরে আসছে সূর্যের দেওয়া জীবনের আশ্বাস। সূর্যকিরণে পরিপুষ্ট হয় শস্য, সেই শস্যে জীবনধারণ করে মানুষ। এভাবেই যম বা মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখা! কেন না, যে ঋতুতে এই উৎসব, সেই হেমন্তের পরেই আসবে প্রবল শীত। তখন তাপমাত্রা কম্পাঙ্কের নিচে নামবে, শৈত্যে মৃত্যু হবে কিছু মানুষের। সেই শৈত্য থেকে এভাবেই প্রিয়জনকে দূরে রাখা!

ভাইফোঁটার অনেক অজানা গল্পঃ

সূর্যদেব ও তার পত্নী সংজ্ঞার যমুনা নামে কন্যা এবং যম নামে পুত্র সন্তান ছিল। তাঁরা হলেন মৃত্যুদণ্ডদাতা যমরাজ ও তাঁর বোন যমুনা হলেন সূর্যের সেই দুই সন্তান। পুত্র ও কন্যা সন্তানের জন্মদানের পর সূর্যের উত্তাপ স্ত্রী সংজ্ঞার কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের প্রতিলিপি ছায়াকে দেবলোকে রেখে মর্তে প্রত্যাবর্তন করেন। সংজ্ঞার প্রতিরূপ হওয়াই কেউ ছায়াকে চিনতে পারেনা। বিমাতা ছায়া কালক্রমে যমুনা ও যমের প্রতি দুঃব্যবহার করতে থাকেন কিন্তু ছায়ার মোহে অন্ধ সূর্যদেব কোন প্রতিবাদ না করায় অত্যাচারের মাত্রা দিনের পর দিন বাড়তেই থাকে। এভবেই একদিন যমুনা তার বিমাতা কর্তৃক স্বর্গরাজ্য থেকে বিতারিত হয়। কালের নিয়ম মেনেই যমুনার বিবাহ হয়। বিয়েরপর তারা পরস্পর থেকে অনেক দূরে থাকতেন। দীর্ঘকাল দিদিকে চোখের দেখাটাও যম দেখতে পায়নি তাই তার খুব মন খারাপ করছিল। দীর্ঘকাল দেখা না হওয়ায় বোন যমুনার খুব ইচ্ছে হয় ভাই যমকে দেখার। তখন ঠিক করল যে করেই হোক দিদির সাথে দেখা করতেই হবে তাছাড়া মন শান্ত হবেনা। যম রাজদূত মার্ফত যমুনার নিকট বার্তা পাঠায়। ভায়ের আসার খবর পেয়ে যমনা যারপরনাই খুশি হয়।

কালী পুজার দুদিন পরে অর্থাৎ ভাতৃদ্বিতীয়ার দিন যম যমুনার বাড়ি যাত্রা করে। ভাই যমরাজ এলে ভালমন্দ খাওয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়ের সর্বাঙ্গীন কুশল কামনা করে প্রার্থনা করেন। দিদির বাড়ি পৌঁছে যম দিদির অতিথ্যে মুগ্ধ হয়। যম পৌঁছানোর আগেই যমুনা বিশাল খাবরের আয়োজন করেছিল। দিদি যমুনার আতিথ্য ও ব্যবহারে সুপ্রসন্ন যম যমুনাকে উপহার হিসেবে বরদান প্রার্থনা করতে বলে। দিদি যমুনা এমনই এক বর প্রার্থনা করেছিল যা একটা ভাই অন্তপ্রান দিদির চিরন্তন প্রার্থনা হওয়া উচিত। যমুনা বলেছিল “ভাতৃদ্বিতীয়ার দিন প্রত্যেক ভাই যেন তার বোনের কথা স্মরন করে আর প্রত্যেক বোন যেন তার ভায়ের মঙ্গলময় দীর্ঘ জীবন কামনা করে।” যম তার দিদি যমুনাকে তাই বর হিসেবে দান করেন এবং বোনের ডাক পেলে বারবার আসার প্রতিশ্রুতি দেন যম। এরপর যম পিতৃগৃহে ফিরে আসে। যমুনা তাঁর ভাই যমের মঙ্গল কামনায় আরাধনা করে যার পুণ্য প্রভাবে যম অমরত্ব লাভ করে। বোন যমুনার পুজার ফলে ভাই যমের এই অমরত্ব লাভের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বর্তমান কালের বোনেরাও এই সংস্কার বা ধর্মাচার পালন করে আসছে। আবার অনেকে বলে থাকেন যমুনার সঙ্গে বিয়ে হয় শ্রীকৃষ্ণের দাদা বলরামের। সেই দিনটিও ছিল কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়া তিথি। বিয়ের আগে ভাইদের কপালে ফোঁটা দিয়ে মঙ্গলকামনা করেছিলেন যমুনা। সেই থেকেও ভাইফোঁটার প্রচলন বলেও অনেকে বলে থাকেন।

কার্যত শারদীয়া উৎসবের শেষ ভাইফোঁটা দিয়ে। আর শারদীয়া উৎসবের সবকিছুর সঙ্গেই রয়েছে মা লক্ষ্মীর যোগ। সেটা ভাইফোঁটার ক্ষেত্রেও সত্য। এমনই এক পৌরাণিক কাহিনি শোনা যায়। একসময়ে বালির হাতে পাতালে বন্দি হন বিষ্ণু। বিপদে পড়ে যান দেবতারাও। কোনওভাবেই যখন বিষ্ণুকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না, তখন নারায়ণকে বালির হাত থেকে উদ্ধার করতে সকলে লক্ষ্মীর শরণ নেন। লক্ষ্মী উপায় হিসেবে বালিকে ভাই ডেকে কপালে তিলক এঁকে দেন। সেটাও ছিল কার্তিক মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথি। ফোঁটা পেয়ে বলি লক্ষ্মীকে উপহার দিতে চান। আর তখনই লক্ষ্মী, ভগবান বিষ্ণুর মুক্তি উপহার চান।

ভাইকে স্বাগত জানাবার এই এক প্রথার কথা শোনা যায় কৃষ্ণ আর সুভদ্রার উপাখ্যানেও। সেই কাহিনি বলে, ধনত্রয়োদশীর পরের দিন চতুর্দশী তিথিতে নরকাসুরকে বধ করলেন কৃষ্ণ। তার পর প্রাগজ্যোতিষপুর থেকে দ্বারকায় ফিরে এলেন কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ নরকাসুর বধ নামের এক দৈত্য বধের পর কৃষ্ণ ফিরে এসেছেন বোন সুভদ্রার কাছে। কৃষ্ণকে দেখে সুভদ্রার উচ্ছ্বাস বাধা মানল না। তিনি বরাবরই কৃষ্ণের আদরের বোন। এই কয়েকদিন তিনি দাদাকে দেখতে পাননি। তার উপর আবার খবর পেয়েছেন সুভদ্রা, নরকাসুরের অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছেন কৃষ্ণ। অতএব, দ্বারকা পৌঁছতেই কৃষ্ণকে তিনি বসালেন আসনে। তাঁর কপালে পরিয়ে দিলেন বিজয়তিলক। তাকে কপালে ফোঁটা দিয়ে মিষ্টি খেতে দেন সুভদ্রা। অনেকে মনে করেন, ভাই ফোঁটার শুরু এর মধ্য দিয়েই। সেই জন্যই নাকি ভাইকে নরকাসুর বধকারী শ্রীকৃষ্ণ কল্পনা করে পুজো করেন বোনেরা। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এই দিনের জন্য বিশেষ আলপনা দেওয়া হয়। চৌকন, চোকনা, চুকনা ইত্যাদি নানা নামের সেই চালের গুঁড়োর আলপনার মাঝখানে ভাইকে বসিয়ে ফোঁটা দেওয়া হয়। নেপালে আবার ভাই ঘুমিয়ে থাকার সময়ে ভাইয়ের কপালে পোড়া চালের ফোঁটা পরিয়ে দেন বোনেরা। এর ফলে নাকি, কোনও অশুভ শক্তি ভাইকে স্পর্শ করতে পারে না।

আবার সর্বানন্দসুরী নামে এক আচার্য পণ্ডিতের তালপাতার পুথি ‘দীপোৎসবকল্প’ থেকে জানা যায় অন্য কাহিনি। চতুর্দশ শতাব্দীর সেই পুথি অনুসারে, জৈন ধর্মের অন্যতম প্রচারক মহাবীর বর্ধমানের মহাপ্রয়াণের পরে তাঁর অন্যতম সঙ্গী রাজা নন্দীবর্ধন মানসিক এবং শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন। সেই সময়ে তাঁর বোন অনসূয়া নন্দীবর্ধনকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান এক কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে। সেখানে অনেক প্রার্থনার পরে নন্দীবর্ধন বোনের কাছে অনশন ভঙ্গ করেন। এই কাহিনি সত্যি হলে ভাইফোঁটা উৎসবের বয়স আড়াই হাজার বছরের বেশি। কারণ, মহাবীরের প্রয়াণ বছর ৫২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

রীতিনীতিঃ

বোন চন্দন কাঠ জল দিয়ে ঘষে ( কেউ কেউ দইও মিশ্রিত করেন চন্দন কাঠের সাথে), নিজের কনিষ্ঠা আঙ্গুল দিয়ে ভাইয়ের কপালে নিচের মন্ত্রটি পড়তে পড়তে তিনবার ফোঁটা দিয়ে দেয়।

“ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।
যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা॥
যমুনার হাতে ফোঁটা খেয়ে যম হল অমর।
আমার হাতে ফোঁটা খেয়ে আমার ভাই হোক অমর॥”
 

এইভাবে বোনেরা ভাইয়ের দীর্ঘজীবন কামনা করে। তারপর ভাইকে মিষ্টি খাওয়ায়। ভাইও বোনকে কিছু উপহার বা টাকা দেয়।

অনেক সময় এই ছড়াটি বিভিন্ন পরিবারের রীতিনীতিভেদে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। অতঃপর, বোন তার ভাইএর মাথায় ধান এবং দুর্বা ঘাসের শীষ রাখে। এই সময় শঙ্খ বাজানো হয় এবং হিন্দু নারীরা উলুধ্বনি করেন। এরপর বোন তার ভাইকে আশীর্বাদ করে থাকে (যদি বোন তার ভাইয়ের তুলনায় বড় হয় অন্যথায় বোন ভাইকে প্রণাম করে আর ভাই বোনকে আশীর্বাদ করে থাকে)। তারপর বোন ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি দ্বারা ভাইকে মিষ্টিমুখ করায় এবং উপহার দিয়ে থাকে। ভাইও তার সাধ্যমত উক্ত বোনকে উপহার দিয়ে থাকে।

পশ্চিমবঙ্গে ভাইফোঁটা একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠান হলেও ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে পালিত হয়। পশ্চিম ভারতের ভাইবিজ একটি বর্ণময় অনুষ্ঠান। সেখানে এই উপলক্ষে পারিবারিক সম্মেলনেরও আয়োজন করা হয়। মহারাষ্ট্রে মেয়েদের ভাইবিজ পালন অবশ্যকর্তব্য। এমনকি, যেসব মেয়েদের ভাই নেই, তাদেরও চন্দ্র দেবতাকে ভাই মনে করে ভাইবিজ পালন করতে হয়। এই রাজ্যে বাসুন্দি পুরী বা শ্রীখণ্ড পুরী নামে একটি বিশেষ খাবার ভাইবিজ অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করার রেওয়াজ আছে।

ভাইফোঁটা কেন বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে দেওয়াই শুভ, জানুন শাস্ত্র মত:

এমনিতে ডান হাতকে বেশি পবিত্র মনে করা হয়। কিন্তু বাঁ হাতের কড়ে আঙুলেই দেওয়া হয় ভাইভোঁটা। কিন্তু কেন? সনাতন ধর্মের এই রীতির পিছনে মনে করা হয় কড়ে আঙুল মহাশূন্যের প্রতীক। আর সেই আঙুলেই প্রকৃতিস্বরূপা নারী ফোঁটা দেন ভাইয়ের মঙ্গল কামনায়। শাস্ত্রের ব্যাখ্যা বলছে— মানুষের হাতের পাঁচটি আঙুল পঞ্চভূতের প্রতীক। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোমের মধ্যে শেষের ব্যোমই হচ্ছে কড়ে আঙুল। উদার ভালবাসার প্রতীক হিসেবে তাই কড়ে আঙ্গুলকেই পবিত্র মনে করা হয় ভাইফোঁটা উৎসবের ক্ষেত্রে। এই ব্যাপারে শাস্ত্র বলছে— ভাই ও বোনের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা যেন মহাশূন্যের মতো অসীম হয়। ভাইফোঁটার অঙ্গ শুধু ফোঁটাই নয়। সেই সঙ্গে ভুরিভোজ আর উপহার দেওয়া নেওয়া তো রয়েছেই। বড় ভাইয়ের থেকে উপহার পাওয়ার কিংবা দিদির থেকে উপহার নেওয়ারও তিথি ভ্রাতৃদ্বিতীয়া।

বোনদের কী উপহার ভাইফোঁটায়, জেনে নিন রাশি অনুযায়ীঃ

ভাই ফোঁটায় বোনদেরকেও পালটা উপহার দেন ভাইরা। ভাইদের রাশি অনুযায়ী তাঁদের বোন বা দিদিদের কী উপহার দেওয়া উচিত, এক নজরে দেখে নিন।
মেষ রাশি– এই রাশির জাতকরা নিজেদের বোনকে হলুদ রংয়ের কোনও পোশাক উপহার দিন।
বৃষ রাশি– এই রাশির ভাইরা বোনেদের পার্স উপহার দিন।
মিথুন রাশি– এই রাশির জাতকরা বোনদের কোনও ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট উপহার দিন।
কর্কট রাশি– যে ভাইদের রাশি কর্কট, তাঁরা বোন বা দিদিকে ঘড়ি উপহার দিন।
সিংহ রাশি– এই রাশির ভাইরা নিজেদের বোন বা দিদিকে পারফিউম উপহার দিন।
কন্যা রাশি– যাঁরা এই রাশির জাতক, তাঁরা নিজেদের বোনকে চকোলেট উপহার দিন।
তুলা রাশি– এই রাশির ভাইরা নিজেদের বোন বা দিদিকে জুতো উপহার দিন।
বৃশ্চিক রাশি– এই রাশির যাঁরা জাতক, তাঁরা বোন বা দিদির প্রয়োজন অনুযায়ী উপহার বেছে নিন।
ধনু রাশি– যাঁরা ধনু রাশির জাতক, তাঁরা নিজেদের বোনকে কানের দুল উপহার দিন।
মকর রাশি– এই রাশির জাতকরা নিজেদের বোনকে ফুলের নকশা করা কোনও পোশাক উপহার দিন।
কুম্ভ রাশি– এই রাশির যাঁরা ভাই তাঁরা নিজেদের বোন বা দিদিকে গরম পোশাক উপহার দিন।
মীন রাশি– এই রাশির জাতকরা নিজেদের ভাইকে মেক আপ কিট উপহার দিন।

প্রতি বছরের চিরচেনা জিনিস ছেড়ে এ বার এমনই কিছু অভিনব উপহার দিন ভাইফোঁটায়ঃ

উপহার যেমন তেমন হতে পারে, ভালবাসা তাতে মিশে থাকলেই হল। সেই আদি কাল থেকেই ভাইফোঁটায় ভাই-বোনের মধ্যে উপহার লেনদেনের চর্চা আছে। সে যত যৎসামান্য উপহারই হোক না কেন, তাতে ভালবাসার পরশটুকু থাকেই। হতদরিদ্র ভাই-বোনও এ দিন মনে মনে অঙ্গীকার করে পরস্পরের প্রতি সৎ ও স্নেহপরায়ণ থাকতে। তাদের উপহার হয়তো সেটাই। আবার কোথাও বিত্তবান ভাই-বোন নিজেদের পছন্দের কোনও বহুমূল্য উপহার তুলে দেয় পরস্পরের হাতে। সময় বদলেছে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভাইফোঁটার উপহারের তালিকায় এখন আমূল পরিবর্তন এসেছে। উপহারটা হয়ে গিয়েছে প্রয়োজন ভিত্তিক। এ বারের ভাইফোঁটায় তাই চিরকালের চেনা উপহারগুলোর পরিবর্তে কিছু অচেনা অথচ কাজে লাগার মতো জিনিস তুলে দিতেই পারেন প্রিয় ভাই বা বোনের হাতে। রইল তেমনই কিছু উপহারের সুলুকসন্ধান। যা বাজেটেও হবে আবার অপ্রত্যাশিত উপহার দেখে চমকে যাবে ভাই-বোন।

● টেকস্যাভি হলে ভাইয়ের হাতে তুলে দেওয়া যেতেই পারে স্মার্ট ওয়াচ।
● বোন বা দিদির সাজগোজের প্রতি ঝোঁক আছে? তা হলে চিরচেনা শাড়ি বা অন্য কোনও পোশাকের পরিবর্তে তাঁকে দিতেই পারেন ওয়াটারপ্রুফ মেকআপ কিট। অনলাইন তো বটেই, একটু নামী দোকানেও মিলবে এমন কিট বক্স। দামও পকেটসই।
● ভাই বা বোনের বই পড়ার নেশা থাকলে তাঁকে উপহার দিন তাঁর পছন্দের লেখকের কোনও বই।
● বাজেট একটু বেশি হলে ভাই বা বোনকে দিতে পারেন একটা স্মার্টফোন। অনলাইনে এখন প্রায়ই চলে ইলেকট্রনিক গ্যাজেটসের দারুণ সব অফার। তাই স্মার্টফোন হতেই পারে গ্যাজেটপ্রিয় মানুষের জন্য সেরা উপহার।
● দেখতেও ভাল আবার রোজের কাজেও আসবে এমন উপহারের পরিকল্পনা থাকলে একটা স্লিং ব্যাগও বেছে নিতে পারেন উপহার হিসেবে।
● ভাইফোঁটায় মিষ্টি বা চকোলেট তো থাকেই, ভাই বা বোন খেতে ভালবাসলে তাঁদের হাতে তুলে দিন কোনও নামী রেস্তরাঁয় খাওয়ার পাস। ভাইফোঁটা উপলক্ষে বিভিন্ন রেস্তরাঁ নির্দিষ্ট মূল্যের এমন কিছু পাসের ব্যবস্থা করে। সেই মূল্য আগাম মিটিয়েও তেমন পাস হাতে পাওয়া যায়। ভাই বা বোনকে উপহার দিন তেমনই কোনও পাস।
● ভাই যদি টেকস্যাভি হয়, তা হলে তার জন্য কিনে ফেলতে পারেন একটা স্মার্টওয়াচ। এ ছাড়া দিতে পারেন ওয়ারলেস ব্লু টুথ হেড সেট কিংবা একটা হেড ফোন।
● পড়ুয়া হলে বইও হতে পারে পছন্দের উপহার।
● ভাই স্টাইল কনশাস হলে তাকে দিতে পারেন ট্রিমার বা আধুনিক কিছু শেভিং মেশিন। কোনও কোনও স্যাঁলোতে এই সময় কিছু ছাড়ও মেলে। তেমন কোনও ডিসকাউন্ট কুপনও উপহার দিতে পারেন তাঁকে। বোনের বেলাতেও এই নিয়ম খাটে।
● ভ্রমণপ্রিয় হলে একে অন্যকে উপহার হিসেবে দিতেই পারেন একটা ট্র্যাভেল ব্যাগ বা ভাইয়ের হাতে তুলে দিতে পারেন ট্রাভেল ফ্রেন্ডলি শেভিং কিট।
● ভাই বা বোনের নতুন বিয়ে হয়েছে? তা হলে তাদের হাতে তুলে দিন বেড়াতে যাওয়ার টিকিট আর হোটেল রিজার্ভেশনের কপি। বিয়ের পরেই এমন উপহার সহজেই মন ভাল করে দেবে, আজীবন মনেও থাকবে।
● সিনেমা দেখতে ভালবাসলে যাতে সে তার বন্ধু বা ভালবাসার মানুষের সঙ্গে কিছুটা সময় উপভোগ করতে পারে, তাই তার হাতে তুলে দিন কাপল মুভি পাস।
● বাজেট একটু কম হলে লিস্টে রাখতে পারেন টিশার্ট, কফি মগ, পারফিউম, পেনের মতো উপহার।
● কথায় বলে না, ‘ইয়োর পারফিউম ইজ ইয়োর মেসেজ, ইয়োর সেন্টেড স্লোগান!’ তাই পছন্দের যে কোনও ব্র্যান্ডের ভাল সুগন্ধি পেলে আপনার ভাই খুশি হবেন নিঃসন্দেহে। বাজেট অনুযায়ী জুড়ে দিতে পারেন ডিও।
● হাজার কাজের চিন্তায় ভাইটির নিশ্চয়ই মনে থাকে না মানিব্যাগ পাল্টানোর কথা? দায়িত্ব নিন আপনি। ভাল মানের লেদারের ব্যাগ পেতে পারেন যে কোনও বড় দোকানে। আর আপনার ভাইটি যদি হয়ে থাকে নিতান্তই খুদে সদস্য, মানিব্যাগ দিয়ে তাকে উপহার দিতে পারেন বড় হওয়ার স্বাদ!
● আপনার ভাই বা বোন কি শারীরচর্চায় মত্ত? দিনের বেশির ভাগটাই কাটান জিমে অথবা জুস ব্লেন্ডারের সামনে? তা হলে ভাইকে দিতে পারেন ক্যালরি কাউন্টিং ব্যান্ড। অর্থাৎ দিনের কতটা সময়ে কত ক্যালরি ইনটেক আর আউটপুট হল, তার হিসেব রাখা যাবে সহজেই। আর ভাই বা বোনও একটু একটু করে এগিয়ে যেতে পারবেন সাধের অ্যাবস মেনটেনের দিকে। চাইলে দিতে পারেন স্পোর্টস স্পেশ্যাল ফ্লিপ ফ্লপ বটলও।
● বই পড়তে কে না ভালবাসে! আর আপনার ভাই বা বোন যদি হয় এক্কেবারে পড়ুয়া, তা হলে বই হল আদর্শ উপহার। এ বছরের বেস্টসেলার তালিকা থেকে খুঁজে কিনে ফেলুন নতুন বইটি। কিংবা দিতে পারেন কিছু পুরনো ক্লাসিক বই। অথবা আপনার স্বাস্থ্য সচেতন বোনের জন্য উপহার দিতে পারেন লো ক্যালরি রেসিপির বই।
● আপনার বাজেট যদি খানিকটা বেশি হয়, তা হলে কিনতে পারেন বুক রিডিং গ্যাজেটও। মানে কিন্ডল জাতীয় গ্যাজেট এক বার যদি হাতে প়়ড়ে তার, তবে বইয়ের ভাণ্ডার হবে অফুরান।
● ভাই কিংবা বোনটি নিত্যদিনের কাজের ফাঁকেই কি দিনলিপি বা টুকটাক গল্প-কবিতা লিখতে ভালবাসে? তা হলে দামি পেনের সেট হতেই পারে ভাইফোঁটার উপহার। চাইলে দিতে পারেন অন্য ধরনের ফেদার ফাউন্টেন বা কুইল পেন। মানে কালির দোয়াতে ডুবিয়ে লেখার মজাটাই এনে দেবে পুরনো দিনের ফিল।
● প্লেটভর্তি মিষ্টির পাশাপাশি খাদ্যঅন্তপ্রাণ ভাই বা দাদার জন্য নিজের হাতে বানিয়ে ফেলুন চকোলাভা কেক কিংবা হোমমেড চকলেট। সুদৃশ্য মোড়কে মুড়ে হাজির করতে পারেন আদরের ভাইটির জন্য। আর ভাইয়েরাও পিছিয়ে পড়বেন না। বোনের জন্য হাজির করতে পারেন তাদের প্রিয় বিদেশি চকলেট।
● আপনার ভাই বা বোনটির পোষ্য খুব পছন্দ? তা হলে এই বিশেষ দিনে তার বাড়িতে হাজির হোন কাচের বড় ফিশ বোল নিয়ে। সঙ্গে গোল্ড ফিশ বা অ্যাঞ্জেল ফিশ দিতে ভুলবেন না কিন্তু। ইচ্ছে হলে ছোট্ট বাস্কেটে করে তোয়ালেতে মুড়ে উপহার দিতে পারেন তুলতুলে এক বেড়ালছানা!
● আপনার ভাই বা বোন যদি হয় সবুজবিলাসী, তা হলে গাছের চেয়ে ভাল উপহার কীই বা হতে পারে! নার্সারি বা অনলাইনে আনা সুদৃশ্য টবে বাহারি ক্যাকটাস বা অর্কিড দিলে, মন পাবেনই তার। দু’জনেই দু’জনকে উপহার দিতে পারেন চারা গাছ। পরিবেশ বান্ধব তো বটেই তবে এই চারা যত্নে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আজীবন আপনাদের দু’দনের ভালবাসার সাক্ষী হয়েও থাকবে।

নিজেই তৈরি করুন ভাইফোঁটার উপহারঃ

১. রং-বেরং-এর বিডস দিয়ে নাইলনের তারে বেঁধে তৈরি করতে পারেন সুন্দর নেকলেস। সেইসঙ্গে মাঝখানে একটি লকেট যোগ করলে মন্দ হয় না।
২. মার্বেল দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি তা দিয়ে বানানো যেতে পারে নিত্যনতুন গয়না। এর জন্য আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম পেয়ে যেতে পারেন নিউ মার্কেট বা ফ্যান্সি মার্কেটে।
৩. মেটাল ব্যাঙ্গেল পড়তে একঘেয়ে লাগে। একটু বুদ্ধি খাটালেই ব্যাঙ্গেলেও আনতে পারেন বৈচিত্র। কাঠের ব্যাঙ্গেলের উপর রঙীন কাপড় বা লেস জড়িয়ে তার উপরে মোতি দিয়ে জড়িয়ে দিলেই ব্যাঙ্গেল তৈরি।
৪. বাড়িতে পুরনো পয়সা পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে? সেগুলি ফেলে না রেখে বানিয়ে ফেলতে পারেন ট্রেন্ডি ব্রেসলেট।
৫. সম্পূর্ণ কাগজ দিয়েই বানিয়ে ফেলতে পারেন একজোড়া কানের দুল। তবে হ্যাঁ বৃষ্টির দিনে এই দুল পরে যেন ভুলেও বাইরে বেরোবেন না।
৬. সাধারণত বাজারে যে সমস্ত কানের দুল পাওয়া যায়, তার উপরেও এক্সপেরিমেন্ট করতে পারেন কিছু নতুনত্ব। এখানে যেমন মেটালের কানের দুলের উপর ছোট ছোট মানানসই রঙীন বিডস লাগিয়ে কানের দুলটিকে আরও ফ্যাশনেবল্ করে তোলা হয়েছে।
৭. টিয়ারা আজকের দিনে একটি ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। দোকান থেকে না কিনে বাড়িতে বসেই বানিয়ে নিতে পারেন। এজন্য লাগবে কাগজের ফুল, যা যে কোনও আর্ট অ্যান্ড ক্রাফ্ট শপে পেয়ে যাবেন বা বাড়িতে বসেও বানিয়ে নিতে পারেন। এর পর একটি তারের উপর রঙিন কাপড় জড়িয়ে নিয়ে, তার উপর ফুলগুলি লাগিয়ে নিলেই টিয়ারা তৈরি।
৮. ছোট ছোট কাঠের টুকরো একসঙ্গে বেঁধে তার উপর মানানসই রংয়ের মোতি লাগিয়ে একসঙ্গে রঙীন তারে বেঁধে নিলেই তৈরি সুন্দর হার।
৯. মার্বেল দিয়ে বাড়িতেই তৈরি করতে পারেন কানের দুল, যা ওয়েস্টার্ন ড্রেসের সঙ্গে চমৎকার মানাবে।

সব মিলিয়ে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, এই উৎসবের আসল লক্ষ্যই হল কল্যাণ কামনা। তার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে নানা কাহিনি, নানা কথা, নানা রীতি ও উপচার। আর সেই কল্যাণ কামনা থেকেই ভাইফোঁটা আজ এক সামাজিক উৎসব।