হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ আসলে দুই ভাই বৈকুণ্ঠের দ্বাররক্ষক ছিলেন, তাদের নাম জয় আর বিজয় ছিল । এক দিন যখন নারায়ণ ও লক্ষ্মীদেবী তার ঘরের ভিতরে বিশ্রাম করছিলেন, জয় আর বিজয় পাহারা দিলেন, তখন ব্রহ্মার চারি পুত্র শিশু অবস্থায় সেখানে চলে গিয়েছিলেন । জয় আর বিজয় তাচ্ছিল্য করছিলেন, “তোমাদের এখানে যাওয়া হবে না ।” যে তারা ব্রহ্মার পুত্র ছিলেন, সে তারা জানতেন না, তাই তারা শিশুদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন । তখন শিশুর মধ্যে একজন বললেন, “তোমাকে আমরা অভিশাপ দেব ! তোমাদের এই মর্ত্যে ফিরে আসতে হবে আর বৈকুণ্ঠে থাকতে পারবে না ।” জয় আর বিজয় অবাক হয়ে গেলেন ।

এই সময় ভিতর থেকে নারায়ণ চেঁচামেচি শুনে বাহিরে চলে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে ?” জয় আর বিজয় বললেন, “প্রভু, আমরা আপনার দ্বাররক্ষক আর এই ছেলেটা আমাদের আপনার বিশ্রামে বিঘ্ন করতে বললেন, রাজি হয়ে গেলাম না, তখন তারা আমাদের অভিশাপ দিয়ে দিলেন ।” নারায়ণ তখন বললেন, “তথাস্তু ! ঠিকই হয়েছে, তাই হবে ।” “সে কি ? আমাদের মর্ত্যে যেতে হবে ??”

“যখন তারা অভিশাপ দিয়েছে, তখন যেতে হবে ।” তখন নারায়ণ তাদেরকে এক শর্ত দিলেন, “যদি এই জন্মে এসে আমার সঙ্গে মিত্রতা কর, আমার পূজা, সেবা কর, তাহলে সাত জন্ম লাগবে । আর যদি আমার সঙ্গে শত্রুতা কর, তাহলে তিন জন্ম লাগবে । কোনটা করবে ?” “প্রভু, তাড়াতাড়ি চলে আসব আপনার কাছে—আমরা শত্রুই থাকব !” তখন তারা সত্যযুগে হলেন হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ, ত্রেতাযুগে হলেন রাবণ আর কুম্ভকর্ণ, আর দ্বাপরে হলেন শিশুপাল আর দন্তবক্র—তারা সবসময় বিষ্ণূর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন ।

হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ দুই ভাই হলেন । সেই দুই ভাই অসুর সবাইকে উৎপাটন করতে শুরু করলেন । উহু, কত ভীষণ অত্যাচার তারা করতে লাগলেন ! স্বর্গ থেকে দেবতারা উৎপাত সহ্য করতে না পেরে স্বর্গ রাজ্য থেকে পলায়ন করল । এটা শুনে হিরণ্যাক্ষ আরও বেশি অত্যাচার করতে লাগলেন, তখন ভগবান রেগে রেগে শূকর-রূপ ধারণ করে হিরণ্যাক্ষকে বধ করলেন । তখন যে তার ভাই মরে গেলেন হিরণ্যকশিপু শুনে আরো বেশি রেগে গেলেন । তখন কি করলেন ? জঙ্গলে চলে গিয়ে ব্রহ্মার ধ্যান করতে লাগলেন । না খেয়ে দেয়ে হাজার হাজার বছর ধরে তপস্যা করেছিলেন তিনি, তখন ব্রহ্মা তার তপস্যায় খুব খুশি হয়েছেন । অসুরটার কাছে হাজির হয়ে ব্রহ্মা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “বল তুমি কি বর চাও ?”

– আমি অমরতা চাই ।
– এটা তো আমার বাহিরে, এটা আমার হাতে নয় । আমার অনেক আয়ু আছে কিন্তু আমারও এক দিন এই দেহ ছাড়তে হবে । আমি এটা তোমাকে দিতে পারব না । আর অন্য কিছু চাও ?
হিরণ্যকশিপু খানিক ভেবে বললেন,
– “তখন আমি চাই যে, আমি দিনেও মরব না, রাতেও মরব না ।” ব্রহ্মা বললেন,
– ঠিক আছে ।
– আমি তোমার কোন সৃষ্ট জীব দ্বারা মরব না ।
– তাও ঠিক আছে ।
– আমি আকাশেও মরব না, মাটিতেও মরব না, পাতালেও মরব না ।
– তাও ঠিক আছে ।
-আমি ঘরেও মরব না, বাহিরেও মরব না ।
– তাও ঠিক আছে । তুমি যেই বরটা চাও, আমি তোমাকে এই বর দিয়ে দিলাম ।

এই ফাঁকে হিরণ্যকশিপু তার স্ত্রী বাড়িতে রেখে গেছিলেন—তার নাম ছিল কয়াধু । যখন হিরণ্যাক্ষকে ভগবান বধ করেছিলেন, দেবতারা আবার স্বর্গে ফিরে আসল । এক দিন তারা হিরণ্যকশিপুর বাসস্থানে এসে অসুরের বাড়িটা লণ্ডভণ্ড করল । কয়াধুকে একা দেখে তারা ওকে নিয়ে চলে গেল হত্যা করতে । মাঝখানে রাস্তায় নারদের সঙ্গে দেখা হয় । নারদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা একে নিয়ে কোথায় যাচ্ছো ? মহিলাটার স্বামী এখন ব্রহ্মার ধ্যান করতে জঙ্গলে গিয়েছেন, তোমরা কোথায় একে নিয়ে যাচ্ছো ?” “একে মেরে ফেলে দিতে যাচ্ছি ! এর গর্ভে হিরণ্যকশিপুর সন্তান আছে, এ সন্তানটা যদি জন্ম গ্রহণ করে, তাহলে সেও অসুর হবে । আমরা এটা সহ্য করতে পারব না !” নারদ তখন তাদেরকে বুঝিয়ে দিলেন, “তোমরা জান না, এই গর্ভে যে সন্তান হবে, সে মহান ভক্ত হবে আর তোমাদেরটি রক্ষা করবে । বরং মহিলাকে আমার কাছে দিয়ে দাও ।”

তাই, কয়াধু নারদের সঙ্গে তার আশ্রমে চলে গেলেন । সেখানেই তিনি ঠাকুরের বাসন মাজা, সব কিছু সেবা, পূজা করতে লাগলেন, আর যখন নারদ প্রত্যেক দিন ভাগবত্ পাঠ করতেন, তখন প্রত্যেক দিন সেই কয়াধু শ্রবণ করতেন । ভাগবতে যে শিক্ষাগুলো দিয়েছেন, প্রহ্লাদ মহারাজ মায়ের পেটে বসে সেগুলাই শ্রবণ করেছেন আর পরে তিনি বাবাকে আর গুরুকূলের বালকগণকে সেই শিক্ষা দিতেন । কয়াধুর সেবায় খুব খুশি হয়ে নারদ তাকে একদিন বললেন, “কয়াধু, তোমার সেবায় আমি খুব খুশি হয়েছি, তুমি কি বর চাও, বল ।” কয়াধু বললেন, “হিরণ্যকশিপু চলে যাচ্ছে বনে ব্রহ্মার ধ্যান করতে, সে অসুর হল—ও তো আমার স্বামী… আপনি আমাকে এমন বর দেন—স্বামী ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার সন্তান প্রসব হবে না । সে বরটা আমাকে দেন ।” নারদ রাজি হয়ে তাকে ওই বরটাই দিয়ে দিলেন ।

এদিকে হিরণ্যকশিপু ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে ফিরে আসলেন । এসে তিনি দেখলেন যে, বাড়িটা লণ্ডভণ্ড ছিল—রেগে গিয়ে তিনি হুংকার দিলেন, “কোথায় গেল আমার স্ত্রী ?!” কেউ তাকে বলল, “নারদ মুনি এখানে এসে নিয়ে গেলেন, আপনার স্ত্রী তাঁর আশ্রমে ।” নারদ গোস্বামীর আশ্রমে গিয়ে হিরণ্যকশিপু স্ত্রীকে নিয়ে চলে আসলেন । তখন তার সন্তান প্রসব হল, নাম রাখল প্রহ্লাদ । আস্তে আস্তে প্রহ্লাদ বড় হতে লাগল ।

অসুরদের গুরু ছিল শুক্রাচার্য্য, তার দুই পুত্র ছিল, ষণ্ড আর অমর্ক । হিরণ্যকশিপু ছেলেকে তাদের কাছে পড়তে পাঠিয়ে দিয়ে আজ্ঞা দিলেন, “সাম-দান-দণ্ড-ভেদ সবগুলো শিক্ষা তাকে দাও—কার সঙ্গে দণ্ড করতে হবে, কার সঙ্গে ভেদ জ্ঞান করতে হবে, এ সব শিক্ষা দেবে ।” কিন্তু যা ষণ্ড-অমর্ক শিক্ষা দিচ্ছে, প্রহ্লাদের ওই সব কিছুই কানে যাচ্ছে না । একদিন হিরণ্যকশিপু ষণ্ড-অমর্কে ডাকলেন, “আমার ছেলে কি শিখেছে ? তাকে একবার নিয়ে চলে এস !” প্রহ্লাদ বাড়িতে এলেন, মা তাকে নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে, সব কিছু করে, আর বাবার কাছে বসিয়ে দিলেন । তখন বাবা ছেলেকে নিজের কোলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, তুমি এই গুরুকূলে পড়লে কি ভালো শিক্ষা পেয়েছো ? তুমি যেটা ভালো শিখেছো তার মধ্য থেকে একটা সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা বল ।” প্রহ্লাদ বললেন, “বাবা, আমি শিক্ষাটা বলব ।” তখন বললেন,

ঈশ্বরঃ পরমঃ বিষ্ণুঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্ব্বকারণকারণম্ ॥

যখন এটা শুনলেন, হিরণ্যকশিপু তাকে এবার কোল থেকে ছুড়ে ফেলে দিলেন, “এটা আমার ঘরে শত্রু জন্মিয়েছে !! আমার ঘরে শত্রু হয়েছে !” ষণ্ড-অমর্ককে ডাক করে বললেন, “ও রে ! আমার ছেলেকে তোমরা কি শেখাচ্ছ ?!” ষণ্ড-অমর্ক সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “প্রভু, বিশ্বাস করুন, এসব শিক্ষা আমরা তোকে কোন দিন দেইনি ! কোথা থেকে যে পেয়েছে আমরা বুঝতে পারছি না ।” হিরণ্যকশিপু তখন তাদেরকে কঠোর নির্দেশ দিলেন, “ভালো করে লক্ষ্য রাখ ! তোমাদের গুরুকূলে অন্য কেউ আসে, কেউও তা শিখিয়ে দেয় !” “ঠিক আছে ।”

প্রহ্লাদ কি করলেন ? যে গুরুকূলে অসুর ছিল, তাদের দলে নিয়ে আসল—গুরুকূলের গুরু যা বলতেন, প্রহ্লাদ তাদেরকে উলটো কথা বলতেন । আর এক দিন হিরণ্যকশিপু বাড়িতে প্রহ্লাদকে নিয়ে এলেন, আবার জিজ্ঞেস করলেন, “বল, কি ভালো শিক্ষা শিখেছিস তুই ? গুরু কি শিখিয়েছে ?” প্রহ্লাদ তখন বললেন,

“শ্রবণং, কীর্ত্তনং, স্মরণং, বন্দনং, পাদ-সেবনম্, দাস্যং, সখ্যম, আত্মনিবেদনম…”

“এ কি ??! এসব কি বলছিস ?!” একবারে হিরণ্যকশিপু রেগে হয় আর কি ! হুংকার দিয়ে বললেন, “কুলাঙ্গার !” আর মনে মনে ভাবলেন, “একে যে অবস্থা হয়, একে বধ করতে হবে !” নানা উপায় চেষ্টা করেছিলেন হিরণ্যকশিপু তার ছেলেকে মেরে ফেলতে—জলের মধ্যে ফেলে দিলেন, হতির পায়ের মধ্যে বেঁধে দিলেন, সাপের বিষ দিলেন, আগুনের মধ্যে ফেলে দিলেন, বিভিন্ন উপায় চেষ্ঠা করলেন কিন্তু কিছু তেই তাকে মারতে পারচ্ছেন না ! অনেক বহুবার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু বিফল ।

তখন হিরণ্যকশিপু তার লোক ডেকে বললেন, “তোমার দ্বারা কিছু হবে না, আমার কাছে তাকে নিয়ে চলে এস ! আমি তাকে উচিত শিক্ষা দিয়ে দেব !” প্রহ্লাদ তার পাশে এসে বসলেন । হিরণ্যকশিপু হুংকার দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুই এই শিক্ষা কোথা থেকে পেয়েছিস ?” প্রহ্লাদ শান্ত স্বরে বলল, “বাবা, আমাকে যাঁর শিক্ষা, সেই শিখিয়ে দিয়েছেন ।”

“গুরুও বলছেন এটা তার শিক্ষা নয় !” মনে মনে বললেন, “তোমরা মারতে না পারলে, আমি ও ব্যবস্থা নিচ্ছি !” আবার বললেন, “হে কুলাঙ্গার ! বল, তুই এই শিখা কোথা থেকে পেয়েছিস ? আগুনে পুড়ে মরছিস না, জলের মধ্যে ফেলে দিলে ডুবে মরছিস না, তোকে পাহাড় থেকে ফেলে দিলাম, তুই মরলি না ! বল ! তোকে কে এমন বল দিয়ে দিল ?” “হে পিতা ঠাকুর ! আপনি যে বলে বলীয়ান, আমিও সেই বলে বলীয়ান । আপনি যেখান থেকে বল পেয়েছেন, আমিও সেখান থেকে পেয়েছিলাম । আপনি ব্রহ্মার কাছ থেকে বল পেয়েছেন আর ব্রহ্মা তার শক্তি হরি থেকে পেয়েছিলেন । আপনি ব্রহ্মার কাছ থেকে বল পেয়ে অহঙ্কারে একবারে মত্ত হয়ে ভুলে গিয়েছেন আপনি বলটা কোথা থেকে পেয়েছেন । সব বল হরির কাছ থেকে ।”

প্রহ্লাদ বললেন, হে পিতৃদেব, দয়া করে আপনি আপনার আসুরিক প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করুন। আপনি বলের কথা জিজ্ঞেস করছেন, পরমেশ্বর শ্রীহরিই সমস্ত বলের উৎস। আপনার বলও তাঁর কাছ থেকে আসছে। ইন্দ্রিয়ের বল, মনের বল, দেহের বল সব তিনিই। আপনার বিপথগামী মন ছাড়া আপনার এই জগতে কোন শত্রু নেই। আপনি আমাকে অনর্থক শত্রু মনে করছেন। আপনার শরীরের ছয় রিপুর আপনি দাসত্ব করছেন, অথচ আপনি গর্বভরে মনে করছেন যে-আপনি ত্রিভুবনের সমস্ত শত্রুকে জয় করেছেন। এসব আপনার নিদারুণ অজ্ঞতা।

হিরণ্যকশিপু বলল, ওরে হতভাগা মুর্খ প্রহ্লাদ, তুই নিজেকে অতি বুদ্ধিমান বলে মনে করছিস্, এর মানে হল আমার হাতে তোর মরবার ইচ্ছা হয়েছে। এক্ষুনি তোর মস্তক বিচ্ছিন্ন করব, তোর পরম আরাধ্য ভগবান এসে তোকে রক্ষা করুক। আমি দেখতে চাই। নেশাগ্রস্ত উন্মত্তের মতো হয়ে ক্রোধান্ধ হিরণ্যকশিপু খড়গ তুলে তিরষ্কার করছিল। হিরণ্যকশিপু বলল,

– আ ! তুই বারবার ‘হরি’, ‘হরি’ বলছিস, তোর হরি কোথায় আছে ?
– হরি সর্বত্রই আছেন ।
– তোর হরি কোথায় থাকে ?
– হরি কোথায় না থাকে ?
– সব জায়গায় আছে ? হরি এই স্তম্ভের মধ্যেও আছে ?
– হ্যাঁ, এখানেও আছে ।
– এখানে আছে তোর হরি ?!!!

তখন হিরণ্যকশিপু স্তম্ভে ঘুষি মারলেন—স্তম্ভটা ভেঙ্গে পড়ে গেল আর সেখান থেকে বিশাল চিৎকার শুরু হয়ে গেল ! চিৎকারটা শুনে দেবতারা উপরে ভয়ে কাঁপতে শুরু করল । লক্ষ্মীদেবীকে সবাই বলল, “লক্ষ্মী, তুমি যাও, প্রভুর হুংকারে এই পৃথিবী লয় হয়ে যাবে !” লক্ষ্মী বললেন, “আমি পারব না, আমি খাণ্ডার নারায়ণে সেবা করলেই প্রভু আরো রেগে যাবেন ।”

তখন স্তম্ভ থেকে নৃসিংহদেব (আধ নর, আধ সিংহ) আবির্ভুত হলেন । তাকে দেখে হিরণ্যকশিপু খুব উদ্দণ্ড মত্ত হয়ে যাচ্ছে আর নৃসিংহদেবও খুব উন্মত্তও হয়ে যাচ্ছে । ভগবান জয় আর বিজয় বলেছিলেন, “তোমাদের সঙ্গে লড়াই করব,” সে লড়াইটার কথা তিনি মনে করছিলেন ।

তখন হিরণ্যকশিপুর সঙ্গে নৃসিংহদেবের জোর লড়াই হচ্ছে । সব দেবতারা বলছেন, “হায় হায় ! হায় হায় কি হলো ? আমার প্রভু এক্ষুনি হেরে যাবে ! যদি ভগবান হেরে যায়…” কিন্তু ভগবান হিরণ্যকশিপুকে হাত থেকে ছুটতে দিয়ে তখনই তাকে আবার হাতে ধরলেন আর আবার ফট্ করে ছুড়ে দিলেন—ভগবানের ইচ্ছা করে ছেড়ে দিলেন । দেবতারা ভয় পেয়ে বললেন, “হায় হায় ! প্রভু জয় করবে ? জয় করবে না ? প্রভু লড়াই হেরে গেলেন ?!” তখন হিরণ্যকশিপু নৃসিংহদেবের শ্রীঅঙ্গে আঘাত করলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আর সময় না দিয়ে নৃসিংহদেব তাকে ধরে তুলে ফেললেন । তারপর নৃসিংহদেব তাকে তুলে ঊরুর মধ্যে রেখে (ব্রহ্মা তাকে বর দিলেন যে, তিনি মাটিতে মরবে না, আকাশে মরবে না, পাতালে মরবে না, কোন অস্ত্র দ্বারা মরবে না, প্রভৃতি ।) নখ দিয়ে তার উদরটা ছিঁড়ে ফেললেন আর নাড়িভুঁড়িটাকে বাহির করে গলায় পড়লেন !

তারপরে, প্রহ্লাদ মহারাজকে দেখে খুব আনন্দ পেলেন নৃসিংহদেব । ভগবান বললেন, “প্রহ্লাদ, বাবা, তুমি একটা কিছু বর চাও ?” প্রহ্লাদ বললেন, “প্রভু আমি আর কি বর চাইব ? তুমি আমাকে কৃপা করবার জন্য এসেছো, প্রভু, আমি আর কিছু চাই না…”“না, কিছু নিতে হবে ।” “তাহলে এই বর দাও—আমার বাবা তোমার শ্রীঅঙ্গে আঘাত করেছেন—আমার বাবাকে উদ্ধার কর, কৃপা কর ।” “তোমার বাবা আমার অঙ্গ স্পর্শ করেছে । আমার যে কীর্ত্তন করে, আমার যে নাম করে, আমাকে যে একবার দর্শন করে, সে কৃপা পেয়ে চলে যাচ্ছে, আর তোমার বাবা আমাকে স্পর্শ করেছে—সে যখন রাগে লড়াই করে মারামারি খেলায় করলে, তবু আমাকে স্পর্শ করে সে আমার ধাম প্রাপ্ত হয়ে গেছে । তাহলে এটা বর নয় । বল আর কি বর চাও ? কি বর আমি তোমাকে দিতে পারি ?”

তখন প্রহ্লাদ বললেন, “আর কি চাইব ? তোমার যদি কিছু দিতেই হয় আমাকে, তখন এই বর আমি চাই — আমি চাই যে আমার জন্য চাওয়ার বাসনাটা কেটে যায়, এই বর দাও ।” তখন ভগবান নৃসিংহদেব “তথাস্তু” বলে প্রস্থান করলেন।

শ্রীনৃসিংহ চতুর্দশী ব্রত মাহাত্ম্য

বৃহন্নারসিংহ পুরাণে ভগবান শ্রীনৃসিংহদেব ভক্ত প্রহ্লাদকে বললেন-

বর্ষে বর্ষে তু কর্তব্যং মম সন্তুষ্টি কারণম্।
মহা গুহ্যমিদং শ্রেষ্ঠং মানবৈর্ভবভীরুভিঃ ॥
অর্থাৎঃ “প্রতি বছর আমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে চতুর্দশী ব্রত কর্তব্য। জন্ম-মৃত্যুময় সংসার ভয়ে ভীত মানুষ এই পরম গোপনীয় ও শ্রেষ্ঠ ব্রত পালন করবে।”

বৈশাখ মাসের শুক্লা চতুর্দশীতে শ্রীনৃসিংহদেব আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাই এই তিথিতে ব্রতপালনপূর্বক তাঁর পূজা ও উৎসব করতে হয়। শ্রীনৃসিংহদেব বললেন, আমার ব্রতদিন জেনেও যে ব্যক্তি লঙ্ঘন করে, চন্দ্র-সূর্য যতদিন থাকবে ততদিন নরক যাতনা ভোগ করবে। যদিও আমার ভক্তরা এই ব্রত করে থাকে তবুও প্রত্যেকের এই ব্রতে অধিকার আছে। প্রহ্লাদ বললেন, হে ভগবান্, হে নৃসিংহরূপ, হে সকল দেবগণের আরাধ্য প্রভু আপনাকে প্রণাম জানাই। আমি জিজ্ঞাসা করছি, হে প্রভু, তোমার প্রতি আমার ভক্তি কিরূপে উৎপন্ন হল? কিরূপে আমি তোমার প্রিয় ভক্ত হলাম? শ্রীনৃসিংহদেব বললেন, হে বুদ্ধিমান একান্ত মনে শোনো। প্রাচীনকল্পে তুমি ব্রাহ্মণ ছিলে, কিন্তু বেদপাঠ করনি। তোমার নাম ছিল বসুদেব এবং তুমি ছিলে বেশ্যাসক্ত। তোমার কোন সুকর্ম ছিল না, কেবল একটি মাত্র আমার ব্রত করেছিলে। সেই ব্রত প্রভাবে তোমার এরকম আমার প্রতি ভক্তি হয়েছে।

প্রহ্লাদ বললেন, হে নৃসিংহ, হে অচ্যুত, হে প্রভু, আমি কার পুত্র হয়ে কি করতাম? বেশ্যাসক্ত অবস্থায় কিভাবে তোমার ব্রত করলাম? দয়া করে বলুন। শ্রীনৃসিংহদেব বললেন, পুরাকালে অবন্তীপুরে এক বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ ছিল। তার নাম ছিল বসুশর্মা। ধর্মপরায়ণ ও বৈদিক ক্রিয়া অনুষ্ঠানে তৎপর। তাঁর ভার্যা জগৎপ্রসিদ্ধা সুশীলা পতিব্রতা সদাচারিণী। তাদের পাঁচ পুত্র ছিল। চারজন ছিল সদাচারী, বিদ্বান, পিতৃভক্ত। কিন্তু কনিষ্ঠ পুত্রটি ছিল অসদাচারী, সর্বদা বেশ্যাসক্ত, সুরাপায়ী। সেই কনিষ্ঠ পুত্রটি ছিলে তুমি। নিত্য বেশ্যাগৃহেই তুমি বসবাস করতে। এক বনমধ্যে তুমি ও সেই তোমার বান্ধবী বেড়াতে গিয়েছিলে। তোমরা মনে করেছিলে দিনটা বেশ ভালোই কাটবে। কিন্তু তোমাদের নিজেদের মধ্যে চরিত্র বিষয়ে বিশেষ রকমে কলহ বেধে যায়। তোমাদের মধ্যে মনোমালিন্যের কারণে মৌনভাবে তোমরা আলাদাভাবে একটি স্থানে এসে বসেছিলে। সেখানে তুমি অতি পুরানো ধ্বংসাবশেষ গৃহ নিদর্শন স্বরূপ কিছু ইট পাথর দেখেছিলে।

সেই নির্জন স্থানে আলাদাভাবে উপবেশন করে তোমরা দুইজন ক্রন্দন করছিলে আপন আপনভাবে। সারাদিন তোমরা অনাহারী ছিলে, এমনকি জল পর্যন্ত পান করনি। সারারাতও তোমরা জাগরিত ছিলে। ক্লান্ত শরীরে দুঃখিত অন্তরে মনোমালিন্য ভাবে তুমি সেখানে শুয়ে পড়ে প্রার্থনা করছিলে, “হে ভগবান, হে শ্রীহরি, এই জগতের কত লোক সুন্দর! আমার মা-বাবা কত সুন্দর ধর্মপ্রাণ। আমার ভাইয়েরা কত সুন্দর। তারা নিষ্ঠাবান, চরিত্রবান। কিন্তু আমি অধঃপতিত। আমি মহা মন্দমতি। আমি চরিত্রহীন। পথের পাগলের চেয়েও অধম।

হে ভগবান, ভালো লোকেরা তোমার শরণাগত। আমি মূর্খ কারও শরণাগত নই। আমি অতি নিঃসঙ্গ। আমি বড় অসহায় অবস্থায় তোমার কাছে প্রার্থনা করছি, হে ভগবান, আমাকে বিশুদ্ধ জীবন দান কর।”এভাবে তুমি ক্রন্দন করেছিলে। আর তোমার বান্ধবী, সেও একান্ত মনে প্রার্থনা করছিল, “ হে ভগবান, আমি সমাজের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য স্তরের জীব। সভ্য সমাজ থেকে আমি বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন। এই জগতে অনেক নিষ্ঠাবতী সাধ্বী সুন্দরী নারী রয়েছে। এই জগতে অনেক নিষ্ঠাবতী সাধ্বী সুন্দরী নারী রয়েছে। আর, আমি মহাপাপী গণিকাবৃত্তি করেই জীবন নষ্ট করেছি। প্রতিদিনই কেবল পাপের বোঝা বাড়িয়েছি। নরকযাতনা কতই না এই পোড়া কপালে অপেক্ষা করছে। ভদ্র সমাজে কেউ কোনওদিন আমাকে তাকাতেও চায় না। আমিও এই জগতের কোনও পথ খুঁজে পাই না। হে পরম করুণাময় ভগবান, যদি তোমার অহৈতুকী কৃপাদৃষ্টি আমার প্রতি থাকে তবে দয়া করে আমার এই জীবন পরিবর্তন করে দাও!”

শ্রীনৃসিংহদেব বললেন, হে প্রহ্লাদ, সেই স্থানটি ছিল আমার প্রাচীন মন্দির। সেই দিনটি ছিল বৈশাখ মাসের শুক্লা চতুর্দশী আমার আবির্ভাবের দিন। তোমরা উপবাসী ছিলে, রাত্রি জাগরণ করছিলে, জীবনের কল্যাণ প্রার্থনা করছিলে। অর্থাৎ অজ্ঞাতসারেই তোমরা আমার পরম-মঙ্গলময় চতুর্দশী ব্রত পালন করেছিলে। সেই ব্রত প্রভাবে তুমি এ জন্মে আমার প্রিয় ভক্তরূপে জন্মগ্রহণ করেছ। আর সেই বেশ্যাও স্বর্গলোকে অপ্সরা জীবন লাভ করে ত্রিভুবনে সুখচারিণী হয়েছে। হে প্রহ্লাদ আমার ব্রতের প্রভাব শোনো। সৃষ্টিশক্তি লাভের উদ্দেশ্যে ব্রহ্মা আমার এই চতুর্দশী ব্রত পালন করেছিলেন।

ত্রিপুরাসুরকে বধের উদ্দেশ্যে মহাদেব এই ব্রত করেছিলেন, স্বর্গসুখ লাভের জন্যই দেবতারা আগের জন্মে আমার ব্রত করেছিলেন। বেশ্যাও এই ব্রত প্রভাবে ত্রিলোকে সুখচারিণী হয়েছে। যে সমস্ত মানুষ আমার এই ব্রতশ্রেষ্ঠ পালন করবে, শতকোটি কল্পেও তাদের সংসারে পুনরাগমন নেই। আমার ব্রত প্রভাবে অপুত্রক ভক্তপুত্র লাভ করে, দরিদ্র ধনশালী হয়, তেজস্কামী তেজঃলাভ করে, রাজ্যকামী রাজ্য পায়, আয়ুষ্কামী দীর্ঘায়ু লাভ করে। স্ত্রীলোকেরা আমার এই চতুর্দশী ব্রত পালন করলে ভাগ্যবতী হয়, এই ব্রত সৎপুত্রপ্রদ, অবৈধব্যকর ও পুত্রশোক বিনাশন, দিব্য সুখপ্রদ। স্ত্রী-পুরুষ যারা এই উত্তম ব্রত পালন করে, তাদের আমি সুখ ও ভুক্তি-মুক্তি ফল দান করি। হে প্রহ্লাদ, দুরাত্মাদের আমার ব্রত পালনে মতি হয় না। পাপকর্মেই সর্বদা তাদের মতি।

শ্রীনৃসিংহ চতুর্দশী ব্রত পালনের নিয়ম কি?
শ্রীনৃসিংহদেব বললেন, বৈশাখী শুক্লা চতুর্দশী ব্রত পালনকারীরা পাপাচারীদের সঙ্গে কথা বলবে না, মিথ্যা আলাপ বর্জন করবে, স্ত্রীসম্ভাষণ বর্জন করবে, দ্যূতক্রীড়া ত্যাগ করে আমার রূপগুণলীলার কথা স্মরণ করবে। দুপুরে পবিত্র জলে স্নান করবে। তারপর ঘরে এসে গোময় দিয়ে মণ্ডপ লেপন করে অষ্টদলপদ্ম রচনা করবে। সেই পদ্মের উপর রত্নযুক্ত তামার কলসী বসাতে হবে। তার উপর চালভর্তি একটি পাত্র রাখতে হবে। চাউলের উপর লক্ষ্মীসহ নৃসিংহদেবকে স্থাপন করতে হবে।

কিংবা মণ্ডপে পবিত্রফুল সাজিয়ে তার উপর পঞ্চামৃতে লক্ষ্মীনৃসিংহকে স্নান করিয়ে পূজা আরম্ভ করতে হবে। আগে প্রহ্লাদের পূজা তারপর লক্ষ্মীনৃসিংহের পূজা। এই অভিষেক ও পূজা আরতি সন্ধ্যাকালে সম্পন্ন করতে হয়। নৃত্য গীত বাদ্য ও হরিনাম সংকীর্তন, নৃসিংহস্তুতি, নৃসিংহলীলা পাঠ কীর্তন পূর্বক রাত্রি জাগরণ এবং পরদিন সকালে স্নান সেরে যত্নসহ পূজা ও সকলের মঙ্গল প্রার্থনা করতে হয়। তারপর ব্রাহ্মণকে দক্ষিণা দান ও প্রসাদ সেবন করতে হয়। অপারগ লোকেরা কমপক্ষে সন্ধ্যার পর অনুকল্প প্রসাদ গ্রহণ করে থাকেন। রাত দশটা পর্যন্ত জেগে থাকেন। পরদিন মঙ্গল আরতিতে নৃসিংহস্তব করতে থাকেন।