ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখে পুরুষোত্তম মাসের মহিমা শ্রবণ করে পাণ্ডবগণ অত্যন্ত উফুল্ল হলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, যুধিষ্ঠির ও দ্রৌপদীর দিকে করুণাদৃষ্টি নিক্ষেপ করে অর্জুনকে বলতে লাগলেন, “হে পুরুষব্যাঘ্ৰ, তোমরা কি তোমাদের দুঃখের কারণ জানো?

তোমরা আমার প্রিয় ও অত্যন্ত দুর্লভ পুরুষোত্তম ব্রত পালন করনি। এজন্যই তোমরা দুঃখ পাচ্ছ। তোমরা ব্যাসদেবের উপদেশে সমস্ত বর্ণাশ্রমোচিত আচার পালন করেছ। কিন্তু পুরুষোত্তম মাসের পূজা না করা পর্যন্ত আমাতে শুদ্ধভক্তি লাভ করতে পারবে না।”

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলতে লাগলেন, “আমি এখন দ্রৌপদীর পূর্ব জন্মবৃত্তান্ত বলব। পূর্বজন্মে দ্রৌপদী মেধা ঋষির কন্যা ছিলেন। শৈশবেই তার মাতৃবিয়োগ হলে তিনি পিতার তত্ত্বাবধানে পালিত হন।

তিনি দিনে দিনে যৌবন প্রাপ্ত হলেন। তিনি খুব সুন্দরী হলেও পিতা তার বিবাহের কোনো বন্দোবস্ত করতে আগ্রহী ছিলেন না। বান্ধবীদের পতি-পুত্রসহ সুন্দর সংসার দেখে তার দুশ্চিন্তা আরও বৃদ্ধি পেল।

এরমধ্যেই হঠাৎ একদিন তার পিতৃবিয়োগ হলো। তখন তার অবস্থা আরও শোচনীয় হলো। সৌভাগ্যক্রমে একদিন দুর্বাসা মুনি সেখানে আগমন করলেন।

মহান মুনিকে দর্শন করে তিনি প্রণতি নিবেদন করে ফল-মূলাদি ও পুষ্প নিবেদন করলেন। দুর্বাসা মুনি আশীর্বাদ দিতে উদ্যত হলে। তিনি ক্রন্দন করতে লাগলেন। মুনিবর তখন তার শোকের। কারণ জানতে চাইলেন।

সেই ব্রাহ্মণকন্যা বলতে লাগলেন, “হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, আপনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছুই জানেন। এ জগতে আমার কোনো আশ্রয়দাতা নেই। আমার সমস্ত আত্মীয়-স্বজন গত হয়েছেন।

আমার পিতা কিংবা কোনো বড় ভ্রাতা নেই। আমার স্বামীও নেই যে আমাকে রক্ষা করবেন। হে মুনিবর, আমাকে এ সমস্ত দুঃখ থেকে মুক্তি দান করুন।” তার প্রার্থনা শ্রবণ করে ও অবস্থা বিবেচনা করে দুর্বাসা মুনি তাকে কৃপা করতে মনস্থ করলেন।

দুর্বাসা মুনি বললেন, “হে সুন্দরী, আগামী তিন মাসের মধ্যে পরমপবিত্র পুরুষোত্তম মাস শুরু হবে। এই পবিত্র মাসটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিকট সবথেকে প্রিয়। এ মাসে কেবল একবার পূণ্যস্নান করেই যেকোনো।

নর-নারী সমস্ত পাপ হতে মুক্তিলাভ করতে পারে। এই মাস সকল মাস হতে শ্রেষ্ঠ। অন্য সমস্ত মাসের মহিমা এ মাসের এক কলা বা ষোলো ভাগের এক ভাগেরও সমান নয়।

এ মাসে এমনকি মাত্র একবার কোনো পুণ্যতীর্থে স্নান করলে বারো হাজার বছর ধরে গঙ্গাতে স্নান করার সমান ফল বা বৃহস্পতি সিংহ রাশিতে প্রবেশ করলে গঙ্গা বা গোদাবরী মানে যে ফল লাভ হয়, তা প্রাপ্ত হওয়া যেতে পারে।

যদি তুমি এ মাসে একবার স্নান কর, দান কর এবং কৃষ্ণনাম কর, তাহলে তোমার সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা দূর হবে। তুমি সর্বসিদ্ধি লাভ করবে। এবং তোমার সকল মনোবাসনা পূর্ণ হবে। দয়া করে আমার উপদেশ অনুসরণ কর। দয়া করে আসন্ন পুরুষোত্তম মাসকে। যত্নসহকারে পূজা করতে ভুলো না।”

এ কথা বলে দুর্বাসা ঋষি নীরব হলেন। দুর্ভাগ্যবশত সেই ব্রাহ্মণকন্যা তাঁর কথায় বিশ্বাস করলেন না। বরং ক্রোধান্বিত হয়ে নিন্দাপূর্ণ বাক্য করতে লাগল, “হে মহামুনি, আপনি মিথ্যা বলছেন।

কীভাবে এই অতিরিক্ত মাসটি, যাকে মলমাস বলা হয়, তা অন্য সকল মাস এমনকি, কার্তিক বা মাঘ বা বৈশাখ হতেও শ্রেষ্ঠ হবে? আমি আপনার কথা বিশ্বাস করতে পারি না। আপনি আমাকে প্রতারিত করার চেষ্টা করছেন। এই অতিরিক্ত মাসে সব রকম শ্রেষ্ঠ কর্ম অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ বলে মনে করা হয়।”

তার এসকল কথা শুনে দুর্বাসা ঋষি ক্রোধান্বিত হলেন। তাঁর চোখ উত্তপ্ত তাগোলকের ন্যায় লাল হয়ে গেল। কিন্তু বালিকাটির অসহায় অবস্থা বিবেচনা করে তিনি নিজেকে সংবরণ করে বলতে লাগলেন, “রে দুর্মতি! তোর পিতা আমার বাল্যবন্ধু।

তাই তোকে অভিশাপ দিচ্ছি না। তার উপরে এখন তোর নিতান্ত করুণ অবস্থা। মুখেরা বৈদিক সিদ্ধান্ত হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। আমার প্রতি দুর্ব্যবহারের জন্য আমি কোনো অপরাধ নিচ্ছি না। কিন্তু পুরুষোত্তম মাসের প্রতি অবজ্ঞার কোনো নিস্তার নেই। আগামী জন্মে নিশ্চয়ই তোকে এর ফল ভোগ করতে হবে।”

দুর্বাসা মুনি তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে প্রস্থান। করলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলতে লাগলেন, “হে অনঘ! দুর্বাসা মুনি চলে যাওয়ার সাথে সাথে সেই ব্রাহ্মণকন্যা তার সমস্ত ঐশ্বর্য হারাল। পুরুষোত্তম মাসের প্রতি অপরাধের ফলে সে কুৎসিত দেহ লাভ করল। তখন সে মহাদেব শিবের আরাধনা করতে মনস্থ করল।”


ধ্যানে তার নয় হাজার বছর অতীত হলে শ্রীশিব তার সম্মুখে আবির্ভূত হলেন। বৈষ্ণবশ্রেষ্ঠ শিবের দিব্যপ্রভাবে সে পুনঃযৌবন প্রাপ্ত হলো। তার সকল দৈহিক বৈকল্যও দূরীভূত হল। তাকে আবারও পূর্বের ন্যায় দেখতে লাগল।

সে বৈদিক মন্ত্রে শিবের স্তুতি করতে লাগল। তখন শিবজী বলতে লাগলেন, “হে তপস্বীনি, সৌভাগ্যবতী হও। তুমি বর কামনা কর। আমি তোমার তপস্যায় সন্তুষ্ট। তুমি যা ইচ্ছা চাইতে পার।”

শিবের পদ্মমুখ হতে এসকল বাক্য শ্রবণ করে সে বলতে লাগল, “হে দীনবন্ধু, আমাকে গুণবান স্বামী প্রদান করুন।” এ কথাটি সে পরপর পাঁচবার বলল। তখন শিব বললেন, “যেহেতু তুমি পাঁচবার এ কথাটি বলেছ, তাই তোমার পঞ্চস্বামী হবে।”

শিবের বাক্য শুনে কন্যা অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে বলতে লাগল, “হে প্রভু! একজন কন্যার পাঁচজন স্বামী থাকাটা খুবই নিন্দাজনক। দয়া করে আপনার বাক্য ফিরিয়ে নিন।”

শিব তখন গম্ভীরভাবে বললেন, “এটি আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি আমার কাছে যা চেয়েছ, তাই পাবে। তুমি পরবর্তী জন্মে পাঁচজন স্বামী পাবে। পূর্বে দুর্বাসা মুনির করুণাপূর্ণ উপদেশ না মেনে তুমি পুরুষোত্তম মাসকে অবজ্ঞা করে অপরাধ করেছ।

হে ব্রাহ্মণপুত্রী! দুর্বাসা ও আমার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে ব্রহ্মাদি সকল দেবতা ও নারদ প্রভৃতি সকল মুনি-ঋষি এই ব্রত পালন করে।

পুরুষোত্তম ব্রত পরায়ণ ভক্ত এ জীবনে সকল সৌভাগ্য অর্জন করেন এবং জীবনান্তে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ধাম গোলোক বৃন্দাবনে প্রত্যাবর্তন করেন। এই পুরুষোত্তম মাসের প্রতি অপরাধের ফলে তুমি পরবর্তী জীবনে পাঁচ স্বামী পাবে।”

এ বলে শিব অন্তর্হিত হলেন। তখন ব্রাহ্মণী অত্যন্ত বিষন্ন হলেন। এভাবে কিছুকাল পর সে দেহত্যাগ করল।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলতে লাগলেন- হে অর্জুন! ইতোমধ্যে রাজা দ্রুপদ একটি যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সেখানে ঐ ব্রাহ্মণ কন্যা রাজা দ্রুপদের কন্যারূপে আবির্ভূত হলেন। মেধা ঋষির কন্যাই দ্রৌপদী হিসেবে জগতে বিখ্যাত হয়েছেন।

পূর্ববর্তী জন্মে পুরুষোত্তম মাসের নিন্দার ফলে কুরুসভায় তাঁকে। তার পঞ্চস্বামীর সম্মুখেই দুঃশাসনের দ্বারা অপমানিত হতে হয়েছিল।

সৌভাগ্যবশত আমাকে স্মরণ করে আমার আশ্রয় গ্রহণের ফলে আমি তাকে সবথেকে লজ্জাজনক পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করি। হে পাণ্ডবগণ! দয়া করে আসন্ন পুরুষোত্তম ব্রত পালনের কথা ভুলো না।

যে ব্যক্তি পুরুষোত্তম মাসের নিন্দা করবে সে কখনও সৌভাগ্য লাভ করবে না। তাই পুরুষোত্তম মাস তোমাদের সকল ইচ্ছা পূরণে এবং সমস্ত দুঃখ দূরীকরণে সমর্থ। এখন তোমাদের চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষ হতে চলেছে।

নিষ্ঠার সাথে এই ব্রত পালন কর, যাতে সকল সৌভাগ্য লাভ করতে পার। এভাবে পাণ্ডবদের সান্তনা প্রদান। করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকার উদ্দেশ্যে গমন করলেন।

কিছুদিন পর পুরুষোত্তম মাসের আগমন হলে যুধিষ্ঠির মহারাজ তার অনুজ ভাইদের এবং দ্ৰৌপদীকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তারা সকলেই বিভিন্নভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবার মাধ্যমে পুরুষোত্তম মাস অতিবাহিত করলেন।

এই ব্রতপ্রভাবে তারা তাদের হারানো রাজ্য ফিরে পেলেন এবং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় অবশেষে ভগবদ্ধাম প্রাপ্ত হলেন। একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত কোনো শুদ্ধভক্তের মুখনিঃসৃত কৃষ্ণকথা শ্রবণে নিজেকে নিয়োজিত করা।

এভাবে একজন ভক্তের কর্তব্য, সর্বদা শ্রীকৃষ্ণের চিন্তা করা ও তার লীলাবিলাস সম্বন্ধে অন্য ভক্তদের নিকটে আলোচনা করা। হৃদয়ে সর্বদা কৃষ্ণচিন্তা করার মাধ্যমে তৃপ্ত হওয়া যায়।

যদি কেউ গৃহস্থ হন তবে তার সৎ ও শান্তিপূর্ণভাবে গৃহস্থালি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা উচিত। তার কোনোরকম বিবাদে জড়ানো উচিত নয় এবং সাধুদের প্রতি ভক্তিমান ও দরিদ্রের প্রতি দয়ালু হওয়া কর্তব্য।

গোরক্ষা, সদালাপ, দয়া এবং অহিংসা- এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়মগুলো গৃহস্থদের অনুসরণীয় হওয়া উচিত। সুত গোস্বামী নৈমিষারণ্যের ঋষিদের সম্মুখে ভগবান নারায়ণ ও নারদমুনির এই কথোপকথন বর্ণনা করে চললেন।

তিনি বললেন, “হে ঋষিগণ! ভগবান নারায়ণের নিকটে এই পুরুষোত্তম মাসের মহিমা শ্রবণ করে নারদ মুনি অত্যন্ত প্রীত হলেন। তিনি বারবার দণ্ডবৎ প্রণতি নিবেদন করে বলতে লাগলেন, “এই পুরুষোত্তম মাস সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।

এমনকি যদি কেউ ভক্তিভরে কেবল এই ব্রত মাহাত্ম শ্রবণও করে, সে অচিরেই ভগবৎসেবা লাভ করেন এবং সকল পাপ কর্মফল থেকে মুক্ত হন। পুরুষোত্তম ব্রত প্রভাবে অচিরেই সকল সৌভাগ্য লাভ করে গোলোক বৃন্দাবনে গমন করেন।”

নারদ মুনি বললেন, “হে ভগবান! এখন আমার হৃদয় ও মন সম্পূর্ণভাবে তৃপ্ত হলো। আপনি জয়যুক্ত হোন।” এভাবে পুরুষোত্তম মাসের মহিমা বর্ণনা করার পর গঙ্গাস্নান ও অন্য কৃত্যাদি সম্পন্ন করার জন্য সুত গোস্বামী সমবেত মুনিদের নিকটে প্রার্থনা নিবেদন করলেন।

তারা কৃতজ্ঞতার সাথে সম্মত হলেন এবং তিনি তখন তাদের প্রণতি নিবেদন করে গঙ্গাস্নানে গেলেন।

নৈমিষারণ্যের ঋষিগণ তখন পরস্পর বলতে লাগলেন, “ওহ! এই পুরুষোত্তম মাস সবথেকে মহিমাপূর্ণ এবং এর ইতিহাস অতি প্রাচীন। এটি কল্পতরুর ন্যায় ভক্তদের সমস্ত বাসনা পূরণে সমর্থ । পুরুষোত্তম মাসের জয় হোক।”

প্রকাশকঃ শ্রী চারুচন্দ্র দাস ব্রহ্মচারী
হরেকৃষ্ণ পাবলিকেশন্স (ইসকন)