বাঙ্গালীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হল শারদীয়া দূর্গাপূজা। এই দূর্গা পূজা শুক্লপক্ষে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। দুর্গাপূজোর সঙ্গে নবরাত্রি ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে। বাংলায় দুর্গাপুজোর সঙ্গে সঙ্গেই বাংলার বাইরে বিশেষত পশ্চিম ভারতে নবরাত্রি পুজো সম্পন্ন হয়।

শরৎ কালে এই উত্‍সব হয় বলে একে শারদ নবরাত্রিও বলা হয়ে থাকে। পুরাণ অনুযায়ী, নবরাত্রি আসলে প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত নয় রাত্রি ধরে মা দুর্গার নয়টি শক্তির আরাধনা। মহালয়ার পরের দিন, অর্থাৎ শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত দুর্গার নয়টি রূপের পুজো করা হয়ে থাকে।

অর্থাৎ প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত নয় রাত্রি ধরে দুর্গার নয়টি শক্তির যে পুজো হয় তাকেই নবরাত্রি বলে। শরৎ জুড়ে ভারতের পূর্বপ্রান্ত মেতে ওঠে শারদীয়া বা দেবী দুর্গার আরাধনায় যখন, তখন দেশের পশ্চিমপ্রান্ত মেতে ওঠে নবরাত্রি পালনে।

বাংলার বাঙালিদের মাতৃ আরাধনার বাইরেও দেশের পশ্চিম প্রান্তে যে কত বড় আকারে এই দুর্গা আরাধনার সময়েই নবরাত্রি পালন হয় সেটা অনেকেই জানেন না। আজ এই নবরাত্রি বিষয়েই আমরা একটু জেনে নিই।

দুর্গার এই নয়টি শক্তি হল-

প্রথম দিন
রূপ: শৈলপুত্রী
নবরাত্রির প্রথম রাত্রে নবদুর্গার প্রথম রূপ হল শৈলপুত্রী। নবদুর্গার প্রথম রূপ হল এটি। শৈলপুত্রী নাম কারণ- শৈল মানে হল পাহাড়। দুর্গা হলেন হিমালয় পর্বতের কন্যা। যেহেতু তিনি শৈল (হিমালয়)এর কন্যা তাই তার নাম এখানে শৈলপুত্রী।

যাঁর অপর নাম সতী ভবানী, পার্বতী বা হেমবতী। হিমালয়ের এক নাম হেমবাহন। তাই, তাঁর কন্যা হলেন হেমবতী। ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বরের শক্তির একত্রিত রূপ এই দেবী ষাঁড়ের পিঠে আরোহিতা। এখানে দেবীর বাহন ষাঁড়। তাঁর এক হাতে থাকে ত্রিশূল। অন্যহাতে পদ্ম। মা শৈলপুত্রী মনোবল বৃদ্ধি করেন।

দ্বিতীয় দিন
রূপ: ব্রহ্মচারিনী
নবদুর্গার দ্বিতীয় রূপ হল ব্রহ্মচারিণী। নবরাত্রির দ্বিতীয় রাতে দেবী উপাসিত হন এই নামে এবং এই রূপে। যিনি ব্রহ্মাকে স্বয়ং জ্ঞান দান করেন। ভক্তকেও ইনি ব্রহ্মপ্রাপ্তি করান। মা ব্রহ্মচারিণী মনোসংযোগ বৃদ্ধি করেন। তিনি এখানে শান্তির প্রতিভূ।

তাঁর ডান হাতে থাকে রুদ্রাক্ষের জপমালা। বাঁ হাতে তিনি ধরে আছেন কমণ্ডুল। মায়ের এই রূপ সংযমের। এই রূপে মা ভক্তের সংযমে সন্তুষ্ট হলে তাকে সুখ, স্বস্তি, শান্তি, সমৃদ্ধির আশীর্বাদ দেন। সুখ শান্তির সঙ্গে দেবী মোক্ষ বা মুক্তির প্রতীক।

তৃতীয় দিন
রূপ:- চন্দ্রঘন্টা
নবদুর্গার তৃতীয় রূপ হল চন্দ্রঘণ্টা। তৃতীয় রাতে দেবী অসীন হন এই নামে। তাঁর মাথায় থাকে একফালি চাঁদ। চাঁদের আকার আবার ঘণ্টার মতো। এই ঘণ্টা দেবীদুর্গার মহিষাসুর বধের জন্য দেবরাজ ইন্দ্রের দেওয়া ঘণ্টা যার মধ্যে গজরাজ ঐরাবতের মহাশক্তি নিহিত ছিল।

উজ্জ্বল বর্ণের দেবীর বাহন সিংহ। দশভুজা দেবীর দশ হাতে ধরা অস্ত্র। চন্দ্রের চেয়েও সুন্দরী ইনি। ত্রিনয়নী দেবী শক্তি এবং সাহসের প্রতীক। তিনি অসুরের সঙ্গে যুদ্ধরত। মায়ের এই রূপ শান্তি ও শক্তির। মা দূর্গার এই ভক্তকে সাহস যোগায়, কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে লড়বার শক্তি দেয়।

মা চন্দ্রঘণ্টা সাংসারিক সমস্ত কষ্ট থেকে মুক্তি দেন। এই রূপের সঙ্গে অনেক দিক দিয়ে মিল আছে বঙ্গদেশে পূজিতা দেবী দুর্গার।

চতুর্থ দিন
রূপ:- কুষ্মণ্ডা
চতুর্থ রূপ কুষ্মণ্ডা। সংস্কৃতে কু মানে স্বল্প। উষ্ম বা উষ্ণ হল গরম এবং অণ্ড মানে ডিম। তিনটি কথা মিলে হল কুষ্মাণ্ড। দুর্বিষহ ত্রিতাপ হল কুষ্মা। আর যিনি এই ত্রিতাপ নিজের উদরে বা অন্ডে ধারণ করেন অর্থাৎ সমগ্র সংসার ভক্ষণ করেন ইনি।

এই রূপে দেবী হলেন সমগ্র বিশ্বের সৃষ্টির প্রতীক। মা দূর্গার এই রূপই হল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি কর্তা অর্থাত্‍ তাঁর থেকেই জন্ম হয়েছে এই মহাবিশ্বের। কুষ্মণ্ডা রূপী মা দূর্গার হাসি থেকেই সৃষ্ট হয়েছে পৃথিবী। তাঁর হাসির ফোয়ারাতেই পৃথিবী হয়েছে শস্য শ্যামলা।

নবরাত্রির চতুর্থ রাতে পূজিতা এই দেবীর কোথাও আট, কোথাও আবার দশ হাত। সিংহবাহিনী দেবী দশ হাতে ধারণ করে আছেন আয়ুধ এবং কমণ্ডলু। মা কুষ্মণ্ডা সুখ ও সমৃদ্ধি দেন।

পঞ্চম দিন
রূপ:- স্কন্দ মাতা
পঞ্চম রূপটি স্কন্দমাতা। বাংলায় যেমন দুর্গাকে গণেশজননী হিসেবে পূজো করার রেওয়াজ আছে, পশ্চিম ভারতে তেমনি আবার দেবী দুর্গাকে কার্তিকের মা হিসেবে পূজোর রেওয়াজ আছে।

মা দূর্গার এই রূপ ভগবান স্কন্দ অর্থাৎ দেব সেনাপতি কার্তিকের মায়ের। মা এই রূপেই শিশু কাল থেকে কার্তিকের সঙ্গে থেকেছেন। কার্তিকের আরেক নাম স্কন্দ। নবরাত্রির পঞ্চম রাতে দুর্গা পূজিত হন স্কন্দমাতা রূপে।

ত্রিনয়নী দেবী এই দেবী চার হাতবিশিষ্টা। ডানদিকের উপরের হাতে ধরে আছেন শিশু কার্তিককে। প্রস্ফুটিত পদ্ম থাকে আর এক দক্ষিণ হস্তে। বাঁ দিকের একটি হাত বরাভয় দিচ্ছে। আর এক হাতে ধরে আছেন পদ্ম।

এই রূপে দেবী দুর্গা কোনও বাহনে উপবিষ্ট নন। তিনি বসে থাকেন ফুটে থাকা কমলে। পূজিত হন নবরাত্রির পঞ্চমদিনে। মা স্কন্দমাতা গৃহের যে কোনও রকম অশান্তি নাশ করেন।

ষষ্ঠ দিন
রূপ:- কাত্যায়নি মাতা
ষষ্ঠরূপ কাত্যায়নী। নবরাত্রির ষষ্ঠ দিনে দেবী আরাধিত হন এই নামে। এই নাম এবং রূপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক পৌরাণিক কাহিনি। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে বৈদিক যুগে কাত্যায়ন নামে এক ঋষি ছিলেন যার একটি পুত্র সন্তানের পর একটি কন্যসন্তান লাভের ইচ্ছা হয়।

দেবী দুর্গার তপস্যা করে তিনি কন্যা সন্তান লাভ করেন। তাঁর স্তবে তুষ্ট হয়ে স্বয়ং দেবী দুর্গা জন্ম নেন কাত্যায়নের কন্যা রূপে। তখন তাঁর নাম হয় কাত্যায়নী। কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে দেবকার্যের জন্য আবির্ভূতা ইনি বৃন্দাবনে দেবী গোপবালা রূপে পূজিতা।

ব্রজের গোপবালারা এই কাত্যায়নীর কাছে প্রার্থণা করেছিলেন নন্দের নন্দন শ্রীকৃষ্ণকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য তাই ব্রজের দুর্গার নাম কাত্যায়নী। মায়ের এই রূপে মাকে গেরুয়া বসনে দেখা যায়। গেরুয়া রং হল সাহসের প্রতীক। মা কাত্যায়নী শত্রু নাশ করেন।

সপ্তম দিন
রূপ:- কালরাত্রি
সপ্তম রূপ কালরাত্রি। নবরাত্রির সপ্তম রাতে দেবী পূজিত হন কালরাত্রি নামে। ঋগ্বেদের রাত্রিসুক্তে পরমাত্মাই রাত্রিদেবী। এই অবতারে মা দূর্গা ভয়ঙ্করী। মহাপ্রলয় কালে এই রাত্রিরূপিণী মাতার কোলেই বিলয় হয় বিশ্বের।

অনন্ত মহাকাশে নৃত্যরত কালভৈরবের দেহ থেকেই আবির্ভূতা। ইনি দেবী যোগনিদ্রা মহাকালিকা বা কালরাত্রি নামে খ্যাত। এখানে দেবী কৃষ্ণবর্ণা। রং তাঁর অন্ধকারের মতো কালো, এলোকাশি চুলে মা এই রূপে নির্ভয়া।

আলুলায়িত কেশে তিনি ধাবিত শত্রুর দিকে। তাঁর কণ্ঠে বিদ্যুতের মালিকা। ত্রিনয়নী দেবীর শ্বাস প্রশ্বাসে বেরিয়ে আসে আগুনের হলকা। ভীষণদর্শনা দেবীর তিন হাতে অস্ত্র। এক হাতে ভক্তদের প্রতি বরাভয়। এই রূপই উপাসিত হয় কালিকা রূপে।

ত্রিনয়নী কালরাত্রি মা ভক্তদের শয়তানের হাত থেকে রক্ষা করেন। তবে এই রূপেও দেবী ভক্তের শুভ করেন। তাই অন্যদিকে তিনি শুভঙ্করী। দেবীর বাহন গাধা। মা কালরাত্রি অল্প বয়সে কোনও ফাঁড়া থাকলে তা নাশ করেন।

অষ্টম দিন
রূপ:- মহাগৌরী
অষ্টম রূপ মহাগৌরী। নবরাত্রির অষ্টম রাতে দেবীর রূপ মহাগৌরি। এই রূপে মা দূর্গা ধীর-স্থির, শান্ত। মায়ের এই রূপের পূজা করলে দূর হয়ে যায় ভক্তের মনের সব পাপ। গল্পে প্রচলিত আছে, দীর্ঘদিন জঙ্গলে তপস্যা করার পর কালো হয়ে গিয়েছিল মা দূর্গার রং।

মহাদেব যখন গঙ্গাজল দিয়ে তাঁকে স্নান করান, তখন তিনি হয়ে ওঠেন গৌরবর্ণা। মায়ের এই নতুন রূপেরই নাম মহাগৌরী। প্রচলিত বিশ্বাস, নবরাত্রির অষ্টম রাতে তাঁর পুজো করলে সব পাপ ধুয়ে যায়। সাদা পোশাক পরিহিতা, চার হাত বিশিষ্টা দেবীর বাহন ষাঁড়।

তিনি সন্তানবত্সলা, শিবসোহাগিনী, বিদ্যুদ্বর্ণা মা দুর্গার প্রসন্ন মূর্তি । কারও বাড়িতে বিবাহজনিত কোনও সমস্যায় এঁর ধ্যান করা খুব ভাল। দেবীর এক হাত শোভিত বরাভয় মুদ্রায়। বাকি তিন হাতে থাকে পদ্ম, ত্রিশূল এবং ডমরু।

নবম দিন
রূপ:- সিদ্ধিদাত্রী
নবদুর্গার নবম তথা শেষ রূপ হল সিদ্ধিদাত্রী। সিংহবাহিনী দেবীর চার হাতে আশীর্বাদী মুদ্রা। অপরূপ লাবণ্যময়ী চতুর্ভুজা, ত্রিনয়নী, প্রাতঃসূর্যের মত রঞ্জিতা যোগমায়া মাহেশ্বরী ইনি সকল কাজে সিদ্ধি প্রদান করেন।

মা সিদ্ধিদাত্রী সর্বসিদ্ধিদাত্রী অর্থাত্‍ তাঁর উপাসনায় সংসারে আসে সুখ এবং সমৃদ্ধি। সবাইকে বরাভয় দেন এই মাতৃকামূর্তি। মায়ের এই রূপ হল শান্ত রূপ। চার হাতের সিদ্ধিদাত্রী মাকে পূজো করলে মায়ের আশীর্বাদে ভক্তদের পুণ্য লাভ হয়।

দেবী ভগবত্‍ পুরাণে আছে, স্বয়ং মহাদেব দেবী দুর্গাকে সিদ্ধিদাত্রী রূপে পুজো করেছিলেন এবং তার ফলে মহাদেব সকল সিদ্ধি লাভ করেন। সিদ্ধিদাত্রীর আশীর্বাদেই অর্ধনারীশ্বর রূপ লাভ করেন মহাদেব।

ছবি ও তথ্যঃ ইন্টারনেট হতে সংগ্রহিত