সূর্য্যের কর্কট রাশিস্থ বৈষ্ণবীয় ‘শ্রীধর’, বৈদিক “নভস্‌” ও বাংলা নাম অনুসারে “শ্রাবণ” মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিকে ‘পবিত্রারোপনী’ একাদশী তিথি বলা হয়। অর্থাৎ সংক্ষেপে বলতে গেলে শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিকে “পবিত্রারোপণী একাদশী বা পুত্রদা একাদশী” তিথি বলা হয়। এই একাদশী ‘পবিত্রারোপণী একাদশী’, ‘পুত্রদা একাদশী’, ‘পদ্ম একাদশী’, শ্রাবণ পুত্রদা একাদশী’ নামেও পরিচিত। এই একাদশী বাংলা ক্যালেন্ডারে ‘শ্রাবণ – ভাদ্র’ মাসে পালন করা হয়। ইংরেজি ক্যালেন্ডারে এটি জুলাই – অগস্ট মাসের মধ্যে থাকে।

শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিকে “পবিত্রা একাদশী তিথি বলা হয়। আভিধানিক সূত্রে বলা যায়—“পূ” ধাতুগত শব্দ থেকে “পবিত্র”, “পবিত্রা” ইত্যাদি বহু শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। “পূ” এর অর্থ হল—(১) সংশোধন করা (২) সংস্কার করা ইত্যাদি চারটে শব্দ। আর “পবিত্ৰা” পূ ধাতু ইত্ৰ, ধে, স্ত্রীং আ (টাপ্‌) শব্দের অর্থ হ’ল—(১) শুচি (২) তুলসী বৃক্ষ (৩) হরিদ্রা (৪) বিষ্ণুভাৰ্য্যা (৫) যজ্ঞে ব্যবহৃত কুশদ্বয় ইত্যাদি ১০টি শব্দ।

বিশেষ অর্থে বলা হয় — যে একাদশী দেবী তার পদানত ভক্তের মনের বিষয়াসক্ত বাসনাকে বিশুদ্ধ (পরা) জ্ঞানের আলোকে পবিত্র করে ভগবদ পদ লাভের সহায়তা করে থাকেন, তিনিই হলেন “শ্রীশ্রীপবিত্রা একাদশী দেবী”। এই একাদশীর আদিষ্ট দেবতার নাম “জনার্দন”।

পৌরাণিক শাস্ত্রানুসারে জানা যায়—দ্বাপর যুগের প্রারম্ভে মাহিস্মতিপুরের রাজা মহীজিতের নানা সদ্গুণ থাকা সত্ত্বেও তার মনে বিষয়াসক্তির আধিক্যের জন্য সর্বদা পূর্ণতার অভাব ছিল। তার কারণ নিরূপণের জন্য পাত্র-মিত্র সমেত একসময়ে তিনি তাঁরই রাজ্যের অপর প্রান্তে অবস্থিত লোমশ মুনির আশ্রমে সবিনয়ে পদার্পণ। করেন। লোমশ মুনি তখন কিছুক্ষণ ধ্যানস্থ থেকে জানালেন যে, পূর্বজন্মে তিনি এক চলমান ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তখন তাঁর (রাজার) মন অপসংস্কৃত ছিল।

“পূর্বজন্মনি বৈশ্যোহয়ং ধনহীনো নৃশংসকৃত্।
বাণিজ্যকর্মনিরতৌ গ্রামাদ্‌ গ্রামন্তরং ভূশম্ ।।”

—ভবিষ্য-পুরাণ, একাদশী-১৮। ২৭

উক্তরাজা সেই সময়ে জলপানার্থে আগত সবৎস গাভীকে তাড়িয়ে গুরুতর পাপ করেছিলেন বলে বর্তমানে তাঁর (রাজার) এই দুঃখজনক পরিস্থিতি হয়েছে। বলে উক্ত লোমশ মুনিবর বললেন।

সদ্যঃ সূতা সবসা চ ধেনুস্তত্র সমাগতা”।

তদনন্তর, রাজা উক্ত মুনিবরের কথামতো এই একাদশী ব্রত পালন করেন এবং তাঁর মনস্কামনা পূর্ণ হয়।

এই কাহিনীর বিষয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরদের বলেছেন যে, এই একাদশী ব্রত মানবের মুক্তিলাভের সহায়ক।

পৌরাণিক আখ্যানটি হল-

একদিন মহারাজ যুধিষ্ঠির ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন- হে প্রভু! শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীর নাম কি তা কৃপা করে আমাকে বলুন।

শ্রীকৃষ্ণ বললেন-হে মহারাজ! এখন আমি সেই পবিত্র ব্রত মাহাত্ম্য বর্ণনা করছি, মনোযোগ দিয়ে তা শ্রবণ করুন। যা শোনামাত্রই বাজপেয় যজ্ঞের ফল লাভ হয়।

প্রাচীন কালে দ্বাপর যুগের শুরুতে মহিজীৎ নামে এক বিখ্যাত রাজা ছিলেন। তিনি মাহিস্মতি নগরে রাজত্ব করতেন। কিন্তু দু:খের বিষয় এই যে তার মনে বিন্দুমাত্র সুখ-শান্তি ছিল না। কেননা তিনি ছিলেন অপুত্রক। ‘পুত্রহীনের ইহলোক পরলোক কোথাও সুখ হয় না’- এইরূপ চিন্তা করতে করতে বহুদিন কেটে গেল। কিন্তু তবুও পুত্রমুখ দর্শনে রাজা বঞ্চিতই রইলেন। নিজেকে অত্যন্ত দুর্ভগা মনে করে রাজা চিন্তাগ্রস্থ হলেন। প্রজাদের সামনে গিয়ে বলতে লাগলেন-হে প্রজাবৃন্দ! তোমরা শোন। আমি এইজন্মে তো কোন পাপকাজ করিনি, অন্যায়ভাবে আমার রাজকোষ বৃদ্ধি করিনি, ব্রাহ্মণ বা দেবতাদের সম্পদ কখনও গ্রহণ করিনি উপরন্তু প্রজাদেরকে পুত্রের মতো পালন করেছি, ধর্ম অনুযায়ী পৃথিবী শাসন করেছি। দুষ্টদের যথানুরূপ দন্ড দিয়েছি, সজ্জন ব্যক্তিদের যথাযোগ্য সম্মান করতেও কখনও অবহেলা করিনি। তাই হে ব্রাহ্মণগণ, এই প্রকার ধর্মপথ অবলম্বন করা সত্ত্বেও কেন আমার পুত্র লাভ হল না, তা আপনারা কৃপা করে অনুসন্ধান করুন।

রাজার এই প্রকার কাতর উক্তি শ্রবণে ব্যথিত রাজভক্ত পুরোহিত ব্রাহ্মণগণ রাজার মঙ্গলের জন্য গভীর বনে ত্রিকালজ্ঞ মুনিঋষির কাছে যেতে মনস্থ করলেন। বনের মধ্যে ঋষিদের আশ্রমসকল দেখতে দেখতে তারা এক মুনির সন্ধান পেলেন। তিনি দীর্ঘায়ু, নীরোগ, নিরাহারে ঘোর তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। সর্বশাস্ত্র বিশারদ ধর্মতত্ত্বজ্ঞ ও ত্রিকালজ্ঞ সেই মহামুনি লোমশ নামে পরিচিত। ব্রহ্মার এক কল্প অতিবাহিত হলে মুনিবরের গায়ের একটি লোম পরিত্যাক্ত হোত। এই কারণে এই মহামুনির নাম লোমশ। তাকে দেখে সকলেই ধন্য হলেন। তারা পরস্পর বলতে লাগলেন যে, আমাদের বহু জন্মের সৌভাগ্যের ফলে আজ আমরা এই মুনিবরের সাক্ষাৎ লাভ করলাম। তারপর ঋষিবর তাদের সম্বোধন করে বরলেন- কি কারণে আপনারা এখানে এসেছেন এবং কেনই বা আমার এত প্রশংসা করছেন, তা স্পষ্ট করে বলুন। আপনাদের যাতে মঙ্গল হয়, আমি নিশ্চয়ই তার চেষ্টা করব।

ব্রাহ্মণেরা বললেন- হে ঋষিবর! আমরা যে উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি আপনি তা কৃপা করে শুনুন। এ পৃথিবীতে আপনার মতো শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি আর কোথাও নেই। মহিজীৎ নামে এক রাজা নি:সন্তান হওয়ায় অতি দু:খে দিনযাপন করছে। আমরা তার প্রজা, তিনি আমাদেরকে পুত্রের মতো পালন করেন। কিন্তু তিনি পুত্রহীন বলে আমরাও সবাই মর্মাহত। তার দু:খ দূর করতে আমরা এই বনে প্রবেশ করেছি।হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ! রাজা যাতে পুত্রের মুখ দর্শন করতে পারেন, কৃপা করে তার কোন উপায় আমাদের বলুন।

তাদের কথা শুনে মুনিবর ধ্যানমগ্ন হলেন। কিছু সময় পরে রাজার পূর্বজন্মবৃত্তান্ত বলতে লাগলেন। এই রাজা পূর্বজন্মে এক দরিদ্র বৈশ্য ছিলেন। একবার তিনি একটি অন্যায় কার্য করে ফেলেন। ব্যবসা করবার জন্য তিনি এক গ্রামথেকে অন্য গ্রামে যাতায়াত করতেন। এক সময় জৈষ্ঠ্য মাসে শুক্লপক্ষের দশমীর দিনে কোথাও যাওয়ার পথে তিনি অত্যন্ত তৃষ্ণার্থ হয়ে পড়েন। গ্রাম প্রান্তে একটি জলাশয় তিনি দেখতে পান। সেখানে জলপানের জন্য যান। একটি গাভী ও তার বাছুর সেখানে জলপান করছিল। তাদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে তিনি নিজেই জলপান করতে লাগলেন। এই পাপকর্মের ফলে তিনি পুত্রসুখে বঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু পূর্বজন্মের কোন পুণ্যের ফলে তিনি এইরকম নিষ্কণ্টক রাজ্য লাভ করেছেন।

হে মুনিবর! শাস্ত্রে আছে যে পুণ্য দ্বারা পাপক্ষয় হয়। তাই আপনি এমন একটি পুণ্যব্রতের উপদেশ করুন যাতে তার পারব্ধ পাপ দূর হয় এবং আপনার অনুগ্রহে তিনি পুত্রসন্তান লাভ করতে পারেন।

লোমশ মুনি বললেন- শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের পবিত্রারোপণী একাদশী ব্রত অভিষ্ট ফল প্রদান করে। আপনারা যথাবিধি তা সকলে পালন করুন।

লোমশ মুনির উপদেশ শুনে আনন্দ চিত্তে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে তাঁরা রাজাকে সে সকল কথা জানালেন। তারপর সকলে মিলে মুনির নির্দেশ অনুসারে ব্রত পালন করলেন। তাদের সকলের পুণ্যফল রাজাকে প্রদান করলেন। সেই পুণ্য প্রভাবে রাজমহিষী গর্ভবতী হলেন। উপযুক্ত সময়ে বলিষ্ঠ, সর্বাঙ্গসুন্দর এক পুত্রসন্তানের জন্ম দান করলেন।

ভবিষোত্তরপুরাণে এই মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। এই ব্রত মাহাত্ম্য যিনি পাঠ বা শ্রবণ করবেন তিনি সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হবেন এবং পুত্রসুখ ভোগ করে অবশেষে দিব্যধাম প্রাপ্ত হবেন।

যাঁরা ঈশ্বরের চিন্তাভাবনা নিয়ে ইহলোক এবং পরলোকে আনন্দ পেতে চান, তাঁরা এই ব্রত শাস্ত্র অনুযায়ী এবং একনিষ্ঠ ও ভক্তিভরে পালন করবেন।

“কর্তব্যা সুখমিচ্ছদ্ভিরিহলোকে পরত্র চ”।

—ভবিষ্য-পুরাণ, একাদশী-১৮।৪০

দেবশয়নী একাদশীর গুরুত্ব

বিশ্বাস করা হয় যে, সঠিক আচার মেনে বিবাহিত দম্পতি যাদের বিয়ের পর দীর্ঘদিন ধরে তাদের পুত্র সন্তান হয় না তারা যদি এই একাদশী পালন করে তাহলে তাদের মনস্কামনা পূর্ণ হয়।