দীপাবলি কথাটি এসেছে” দীপ” এবং “ওয়ালি”এই দুই শব্দের সন্ধি করে। দীপ কথার অর্থ প্রদীপ এবং ওয়ালি কথার অর্থ সারি ।অর্থাৎ দীপাবলি কথার অর্থ প্রদীপের সারি । সারি সারি প্রদীপ জ্বালিয়ে বাড়ির এবং চারপাশের সকল অন্ধকার দূর করা হয় এই উৎসব উপলক্ষে। দীপাবলি উত্তর ভারতে শরৎ আর দক্ষিণ ভারতে বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হয়। সারা ভারতে এক দিন নয়, পাঁচ দিন ধরে পালিত হয় এই উৎসব। ধনতেরাস, নরক চতুর্থী, অমাবস্যা, কার্তিক শুদ্ধ পদ্যমী বা বালি প্রতিপদা এবং ভাই দুঁজ বা ভাইফোঁটা।

দীপাবলি আমাদের দেশের সবচেয়ে প্রাচীন উৎসব। মহাভারতের যুগেও এই উৎসব ছিল। তারও পূর্বে রামায়ণের কাল থেকে জানা যায়, শ্রীরামচন্দ্র চোদ্দ বছর বনবাসের পরে দেশে ফেরার সময়ে রাজ্যবাসী প্রদীপ জ্বালিয়ে উৎসব পালন করেছিলেন। যদিও ঐ প্রদীপ জ্বালানোর সূচনা হয়েছিল অযোধ্যায় শ্রীরামচন্দ্রের জন্মদিন উপলক্ষে। আবার রাম-রাবণের যুদ্ধে রামের জয়ের সংবাদে অযোধ্যায় দীপাবলি উৎসব পালন করা হয়েছিল। আজও তাই উত্তর ভারতের মানুষ দীপাবলির উৎসব পালন করে থাকেন।

সারা ভারত তথা বিশ্বজুড়ে পালিত হয় দীপাবলি উৎসব। এই উৎসব প্রত্যেক হিন্দু বাড়িতে মহা ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়। এছাড়াও সমগ্র ভারত জুড়ে ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে এই উৎসব পালন করে থাকে। এই উৎসব কোন একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের উৎসব না থেকে থেকে বর্তমানে একটি “আন্তর্জাতিক” উৎসবে পরিণত হয়েছে, যেখানে বিশ্বের প্রায় সকল দেশ ধুমধামের সঙ্গে এই উৎসব পালন করে থাকে। সকল ভারতবাসীর কাছে তথা বিশ্ববাসীর কাছে দীপাবলি হল আলোর উৎসব।

বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’ গ্রন্থে প্রথম দীপাবলির উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে একে যমরাত্রি বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বৃন্দাবনে ব্রজবালারা দীপান্বিতা অমাবস্যায় গিরিরাজ গোবর্ধনের পুজো করে বৃন্দাবনকে দীপমালায় শোভিত করেছিল। এই বর্ণনা রয়েছে ‘শ্রীমদ্ভাগবত’-এ। শ্রীহর্ষ তাঁর ‘নাগানন্দ’ গ্রন্থে একে উল্লেখ করেছেন ‘দীপ প্রতিপাদ্য’ উৎসব হিসেবে। আলবিরুনি তাঁর ‘তাহকক ই হিন্দ’ গ্রন্থে একে ‘দীপাবলি’ বলেই বর্ণনা করেছেন।

দীপাবলির আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা

প্রত্যেক মানুষের মনের মধ্যে থাকে নানা রকম অন্ধকার। সেই অন্ধকার সৃষ্টি হয় বিভিন্ন কারণে ।যেমন লোভ,লালসা, মোহ, মায়া, মমতা, মাৎসর্য, এবং কামের মাধ্যমে হতে পারে। তেমনি অর্থ, ধন, প্রভাব-প্রতিপত্তি খ্যাতি এই সকল কিছুর ফলে আমাদের হৃদয়ে জন্ম নেয় নেয় অহংকার যা একপ্রকার নেগেটিভ এনার্জি ।এই অহংকারের অন্ধকার আমাদের চারিত্রিক উন্নতিতে অন্যতম অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।আর তাই দিপাবলী উৎসবে গৃহে প্রদীপ জ্বালিয়ে বাড়ির মধ্যে অন্ধকার দূর করার পাশাপাশি মনের গভীরে সকল অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করা হয় ।যাতে আমরা আমাদের পথে এগিয়ে যেতে পারি কোনরূপ অহংকার বা অন্য কিছু চারিত্রিক অধঃপতন ছাড়াই । এছাড়াও নিরক্ষরতা অন্ধকারকে দূর করতেও জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালাতে উৎসাহিত করা হয় দীপাবলি উৎসবের মাধ্যমে।তমশাময় নিশীতে একটা প্রদীপের আলোই যথেষ্ট হয় মনে সাহস জোগানোর জন্য।তেমনি শত শত প্রদীপের আলোয় আমরা আমাদের মনে সাহস ফিরে পাই।কাঙ্খিত লক্ষ্য ফিরে পেতে সাহায্য করে এই প্রদীপের আলো।

দীপাবলির পৌরাণিক ব্যাখ্যা

রামায়ণ অনুসারে রামচন্দ্র পিতার আদেশ রক্ষা করার জন্য চৌদ্দ বছরের জন্য বনবাসে গিয়েছিল সীতার সঙ্গে।সঙ্গে গিয়েছিল ভ্রাতা লক্ষণ। আর তারপর ঘটনা পরম্পরায় রাক্ষস রাজ লংকেশ রাবণ সীতাকে হরণ করে সোনার লঙ্কায় নিয়ে যায়।রাম সীতাকে ফিরে পাওয়ার জন্য রাবনের সঙ্গে লড়াই করে তাকে হত্যা করে হনুমান ,বিভীষণ,বানর রাজা সুগ্রীব এবং অন্যান্য বানর সেনার সাহায্য নিয়ে।আর তারপর তার প্রানের প্রিয়া সীতাকে ফিরে পান। শ্রীরামচন্দ্রের চৌদ্দ বছরের দীর্ঘ বিরহে অযোধ্যাবাসী যখন কাতর হয়েছিলেন, তখন তিনি বনবাসলীলা শেষ করে ভক্ত হনুমানের মাধ্যমে ভ্রাতা ভরতের কাছে অযোধ্যা নগরীতে ফিরে আসার বার্তা প্রেরণ করেন। অশুভ পরাশক্তিকে নাশ করার পর দামোদর মাসে (কার্তিক মাস) কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথিতে তিনি অযোধ্যা নগরীতে তার প্রাণপ্রিয় ভক্তদের মাঝে ফিরে আসবেন। তাই অযোধ্যাবাসী তাদের প্রাণপ্রিয় শ্রীরামচন্দ্রকে স্বাগত জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন।

কারণ তিনি প্রবেশ করে ধন্য করবেন এই নগরী। শ্রীরামচন্দ্রের আগমন বার্তা পেয়ে রাজা ভরত সমগ্র নগরে উৎসবের ঘোষণা দিলে সমগ্র নগরী আলোর উৎসবের সাজে সজ্জিত হয়ে ওঠে। সব অমঙ্গল, অকল্যাণ দূর হবে এই শুভ কামনায় পথে পথে, বাড়িতে বাড়িতে, গাছে গাছে সর্বত্রই মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন অযোধ্যাবাসী। শ্রীরামচন্দ্র অমাবস্যার অন্ধকারে প্রত্যাবর্তন করবেন, তাই সমগ্র অযোধ্যা নগরী আলোর প্রদীপ দিয়ে সাজানো হল যেন তাদের প্রাণপ্রিয় শ্রীরামচন্দ্র অমাবস্যার অন্ধকার দূর করে মঙ্গলময় আলোকে নগরীতে প্রবেশ করেন। লোকশিক্ষা দেয়ার জন্য অশুভ শক্তির প্রতীক, মহাপরাক্রমশালী অসুর রাবণকে বিনাশ করে এই পুণ্যলগ্নে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র তার প্রিয় ভক্তদের মাঝে ফিরে এসেছিলেন। আর আজ আমরা যেদিন দীপাবলি উৎসব পালন করছি ত্রেতা যুগে সেই দিনে পুনরায় অযোধ্যায় ফিরে আসেন । এই বিশেষ দিনে এছাড়াও তারা সেই নানা শব্দবাজি বা ফটকা ফোটান এবং রং মশাল জ্বালান।আর তাই এই শুভ দিনকে প্রত্যেক বছর মহা ধুমধামের সঙ্গে পালন করা হতে থাকে।যা পরবর্তীতে সারা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশেই পালিত হয়েছিল দীপাবলি

বরাহরূপী বিষ্ণুর ঔরসে ধরিত্রীর গর্ভে জন্ম হয় নরকাসুরের। কালক্রমে নরকাসুর তার পিতার কাছ থেকে লাভ করে প্রাগজ্যোতিষপুর অর্থাৎ কামরূপ রাজ্য। দেবী কামাখ্যাকে তুষ্ট করে তাঁর কৃপায় অসুররাজ নরক হয়ে ওঠে মহাপরাক্রমশালী। এমনকী, স্বয়ং দেবতাদেরও ত্রাস হয়ে ওঠে সে। স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালে তার দাপটে ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে। দেব দানব গন্ধর্ব নির্বিশেষে ষোল হাজার সুন্দরী রমণীদের বলপূর্বক হরণ করে এক পাহাড়ে নির্মিত বন্দিশালায় সে আটকে রাখে। শুধু তাই নয়, উদ্ধত নরক দেবরাজ ইন্দ্রকে পরাজিত করে দেবমাতা অদিতির কর্ণভূষণ লুন্ঠন করে।

এই সময়ে দ্বারকাধীশ শ্রীকৃষ্ণ নরকাসুরের নারকীয় কুকীর্তির কথা শুনে যুদ্ধাভিযান করেন প্রাগজ্যোতিষপুরের দিকে। যুদ্ধে সুদর্শন চক্রে নরকের মস্তক ছিন্ন করে শ্রীকৃষ্ণ ষোল হাজার বন্দিনীকে মুক্ত করেন। নরকাসুরের দানবীয় অত্যাচার ও নারী নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তিলাভ করে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গৃহ সাজিয়ে ছিল আলোকমালায়। প্রাগজ্যোতিষপুর থেকে দ্বারকা— পূর্ব পশ্চিমে প্রায় দু হাজার মাইল বিস্তৃত ভারত আত্মপ্রকাশ করেছিল দ্বীপান্বিতা রূপে। বলতে গেলে দীপাবলি উৎসবের সেই শুরু।

এছাড়াও পুরাণ মতে অনেকেই মনে করেন আজকের দিনে দেবী লক্ষ্মী পালন কর্তা বিষ্ণুর সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছিল।তাই অনেক হিন্দু বাড়িতে দীপাবলির দিনে বাড়িতে লক্ষ্মী নারায়ণের পূজাও হয়ে থাকে।অন্য মতে এই দিন মা লক্ষ্মী জন্মগ্রহণ করেন।আর তাই বাড়িতে মা লক্ষীর শুভ আগমনের জন্য এই দিন মা লক্ষীর পূজা করা হয়। কোথাও কোথাও দীপাবলির দিন হয় লক্ষ্মী ও অলক্ষ্মী পুজো। অলক্ষ্মীকে বিদায় জানিয়ে লক্ষ্মীকে সমারোহে ঘরে স্থাপন করা হয়, তাই প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁকে বরণ করা হয় ঘরে ঘরে। পূর্বদিন ভূত চতুর্দশী থেকে এর সূচনা হয়। অশুভ শক্তি যাতে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, তাই প্রদীপ জ্বালিয়ে সব আলো করা হয়। অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার দিন দীপাবলী। জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর এদিন পরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন। বিক্রমাব্দ অনুসারে দীপাবলি থেকে নতুন বছর আরম্ভ হয়।

৫ দিনের ভিন্ন ভিন্ন দিনের কার্যাবলীঃ

১ম দিনঃ ধনতেরাস

আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরাস দিয়ে এই উৎসবের শুরু। ধনতেরাসের দিন ভারতীয় অর্থ ব্যবসায়ীদের অর্থ বর্ষের শুরু। এইদিন নতুন বাসন, সোনার গয়না ইত্যাদি কেনার রীতি দেখা যায়।

২য় দিনঃ নরক চতুর্দশী বা ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দরকম শাক

দীপাবলীতে নরক চতুর্দশী বা ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দরকম শাকের (কেও, বেতো কালকাসুন্দা;নিম, সরিষা; শালিঞ্চা;বা;শাঞ্চে, জয়ন্তী, গুলঞ্চ, পটুক পত্র;বা;পলতা, ভন্টাকি(ঘেঁটু);বা;ভাঁট , হিলমোচিকা;বা;হিঞ্চে , সুনিষন্নক;বা;শুষুনী;বা;শুষনি, শেলু;বা;শুলকা) মিলিত একটি পদ খেয়ে থাকে, যা চোদ্দ শাক নামে পরিচিত। তবে;আয়ুর্বেদ;মতে প্রাচীন বাংলায় চোদ্দো শাকগুলি ছিল (পালং শাক, লাল শাক, সুষণি শাক, পাট শাক, ধনে শাক, পুঁই শাক, কুমড়ো শাক, গিমে শাক, মূলো শাক, কলমি শাক, সরষে শাক, নোটে শাক, মেথি শাক, লাউ শাক অথবা হিঞ্চে শাক) । পুরাণ মত অনুসারে ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দ শাক খাওয়ার রীতি প্রচলন করেন ঋক্ বেদের বাস্কল বা শাক দ্বীপি ব্রাহ্মণ’রা। ভেষজবিজ্ঞানী ছন্দা মণ্ডলের মতে, দীপাবলির এই মাসটায় ঋতু পরিবর্তনের ফলে নানান রোগের প্রকোপ বাড়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়।সেই জন্য;আশ্বিন;ও;কার্ত্তিক;মাস দুটিকে যমদংস্টা কাল বলা হত। চোদ্দরকম শাকের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা ছিল দারুণ। হয়ত বাঙালিকে এই শাকের গুনাগুন অন্যকোন ভাবে বোঝাতে না পেরে ধর্মের পালনীয় কর্তব্যের মোড়কের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা থেকেই এই রীতির শুরু। তখনকার দিনে বাংলার নব্য-স্মৃতিশাস্ত্রকার রঘুনন্দন (১৬ শতাব্দী) তাঁর অষ্টবিংশতি তত্ত্বের অন্যতম গ্রন্থ “কৃত্যতত্ত্বে” এই সময়কাল উল্লেখ করেছেন “নিৰ্ণয়া-মৃতের” (একটি প্রাচীন স্মৃতির গ্রন্থ) অভিমত অনুসরণ করে-

ওলং কেমুকবাস্তূকং, সার্ষপং নিম্বং জয়াং।
শালিঞ্চীং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলুকং গুড়ূচীন্তথা।
ভণ্টাকীং সুনিষন্নকং শিবদিনে খাদন্তি যে মানবাঃ,
প্রেতত্বং ন চ যান্তি কার্ত্তিকদিনে কৃষ্ণে চ ভূতে তিথৌ।”
 

ভূতচতুর্দশীতে ১৪ প্রদীপঃ

বাঙালির ১২ মাসের ১৩ পার্বনের অন্যতম হল কালীপুজো। আলোর রোশনাইয়ে মনের কালিমা ঘোচাবার উৎসবের মধ্য দিয়েই পালিত হয় এই মাতৃ আরাধনা। কালীপুজোর আগের দিন পালিত হয় ভূত চতুর্দশী। কার্তিক মাসের অমাবস্যায় চতুদর্শীর দিনের এই রীতি পালনে ঘরে ঘরে দেওয়া হয় ১৪ প্রদীপ। শাস্ত্র মতে, পূর্বপুরুষের উদ্দেশে ভূত চতুর্দশীর দিন বাড়ির ১৪ কোণায় ১৪ প্রদীপ জ্বালিয়ে বিভিন্ন অংশে সাজানো হয় যাতে পরিবার থেকে ভূত প্রেতকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়।। মনে করা হয়, । ১৪ প্রদীপ জ্বালানোর পেছনে কারণ স্বরূপ মনে করা হয় যে এই দিন পূর্বপুরুষের উর্জা নেমে আসে পৃথিবীর বুকে তাই প্রদীপ জ্বালিয়ে পিতৃ পুরুষ দের বাড়িতে আসবার আমন্ত্রণ জানানো হয় যাতে তারা মা কালীর আগমনের দিন উপস্থিত হয়ে বাড়ির সকল সদস্যকে আশীর্বাদ করতে পারেন এবং নিজেরাও মোক্ষ লাভ করতে পারেন। ভূতচতুর্দশীর দিন ১৪ টি মোমবাতির জায়গায় সরষের তেল সহযোগে যদি প্রদীপ দান করা যায়, তার থেকে ভালো আর কিছু হতে পারে না। কোন মন্ত্র জপ করতে হয়? প্রদীপের মুখ বাড়ির পশ্চিম দিকে রেখে, জপ করতে হবে এই মন্ত্র-

নম পিতৃভ্যে প্রেতেভ্যে নমো ধর্মায় বিষ্ণবে । নম ধূম্রায় রুদ্রায় কান্তার প্রত্যয়ে নমঃ।
 

৩য় দিনঃ দীপাবলি

দীপাবলির অর্থ-প্রদীপের সমষ্টি। দীপাবলি সারি সারি প্রদীপের আলোয় স্বর্গের দেবতাকে মর্ত্যের কুটিরে বরণ করে নেওয়ার উৎসব। এই দিন যখন উত্তর ভারতে লক্ষ্মীর পূজা চলে পশ্চিমবঙ্গে তখন আড়ম্বরে পালন করা হয় কালীপূজা। কালীপূজো বা শ্যামাপূজো হল হিন্দুদের বা বাঙালি হিন্দুদের একটি অন্যতম জনপ্রিয় পূজো যা কিনা কার্ত্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। এই পুজো কে দীপান্বিতা কালীপূজো বলে। সারা ভারতে এই দিন লক্ষ্মীপূজো হলেও বাংলা, আসাম ও ওড়িশাতে এইদিন কালীর আরাধনাই হয়। সাধারণত কালীপূজো আর দীপাবলি একসাথেই পড়ে প্রতিবছর। দীপান্বিতা কালীপূজো ছাড়াও আরও দুই ধরণের কালীপূজোর চল আছে। মাঘ মাসে ‘রটন্তী’ আর জ্যৈষ্ঠ মাসে ‘ ফলহারিণী’ কালীপূজো।

কালীপূজোর ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাব ১৭৬৮ সালে কাশীনাথ রচিত ‘কালী সপর্যাসবিধি’ গ্রন্থে দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালীপূজোর বিধান পাওয়া গেলেও বাংলায় কালীপূজোর প্রচলনের প্রমাণ কিন্তু তখনো তেমন পাওয়া যায়নি। নবদ্বীপের বিখ্যাত তান্ত্রিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ কে বাংলায় কালীমূর্তি ও কালীপূজোর প্রবর্তক বলেমনে করা হয়। কৃষ্ণানন্দই সর্ব প্রথম কালীপূজোকে সারা বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন। ওনার আগে গৃহস্হ ঘরে কালীপূজো নিষিদ্ধ ছিল। কালী পূজো তখন শ্মশানে কিংবা নদীতীরে বা গভীর; জঙ্গলে হত। অঘোরীদের আরাধ্য ভয়ংকরী দেবীকে কল্যাণময়ী মাতৃরূপ দান এই; কৃষ্ণানন্দ প্রথম করেন।; তবে অষ্টাদশ শতাব্দীতে কালীপূজোকে যিনি বাংলায় বিখ্যাত করে দিলেন তিনি নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। মুণ্ডমালা তন্ত্র অনুসারে দেবীর ‘ দশমহবিদ্যা’, অর্থাৎ দশটি বিশেষ রূপের একেবারে প্রথম রূপটি হল ‘কালী’। কালী হল ‘কালিকুল’ সম্প্রদায় বা শাক্ত ধর্মের প্রধান আরাধ্যা দেবী।কালীঘাট ও কামাখ্যা মন্দিরে দীপান্বিতা কালীপূজোর দিন কালী কে লক্ষ্মী হিসেবে আরাধনা করা হয়।জৈন মতে ৫২৭খ্রীঃ পূঃ এই দিনেই মহাবীর পাওয়াপুরিতে মোক্ষ লাভ করেছিলেন।আবার শিখদের ষষ্ঠগুরু হরগোবিন্দ ও বাহান্ন জন রাজপুত্র এই জাহাঙ্গীরের হাত থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছিলেন। এইদিনটি শিখদের কাছে ‘ বন্দী ছোড় দিবস’ নামে পরিচিত।

৪র্থ দিনঃ শুদ্ধ পদ্যমী বা বালি প্রতিপদা

এইদিনটি মহারাষ্ট্রে নববর্ষ, অন্ধ্রপ্রদেশে ‘উগাদি’ ও সিঁধরি বাসীদের কাছে চেট্টিনাদ নামে পরিচিত।এইদিন নববিবাহিত বধূ স্বামীর কপালে মৃত্যুঞ্জয়ী লাল তিলক পরিয়ে আরতির মাধ্যমে তার দীর্ঘায়ু কামনা করে থাকে। বৈষ্ণবরা আবার এইদিন গোবর্ধন পূজা বা অন্নকূট করে থাকে শ্রী কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে ১০৮টি পদ রান্না করা হয়।

৫ম দিনঃ ভাইফোঁটা

যম দ্বিতীয়া বা ভাইফোঁটা হয়ে এই উৎসবের শেষ।

সৌভাগ্য-সমৃদ্ধি ফেরাতে দিওয়ালিতে কতগুলি প্রদীপে বাড়ি সাজাতে হবেঃ

মনের অলক্ষ্মীকে দূর করে আলোর উৎসবে মনের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে তোলার উপলক্ষ্যে দীপাবলি। গোটা বাংলা যখন দিপান্বিতা অমাবস্যা উপলক্ষ্যে কালীপুজো নিয়ে ব্যস্ত, তখন দেশের বাকি অংশে লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়। মাতৃ আরাধনার এই মরশুমে লক্ষ্মীলাভ করতে, সৌভাগ্য-সমৃদ্ধি ফিরে পেতে কয়েকটি বিশেষ রীতি রয়েছে প্রদীপ সাজানোকে কেন্দ্র করে।

দীপান্বিতা কালীপুজোয় ক’টি প্রদীপ প্রয়োজনঃ

কালীপুজোর রাতে, বা এই আলোর উৎসব উপলক্ষ্যে ২৮ টি বা ১০৮ টি প্রদীপ দানের নিয়ম প্রচলিত। শাস্ত্র মতে, এই নির্দিষ্ট সংখ্যার প্রদীপ দিয়ে বাড়ি সাজালেই দীপাবলির মরশুমে দূর হয় অলক্ষ্মী ও বাড়িতে বিরাজ করে সমৃদ্ধি-সৌভাগ্য।
প্রদীপ দানের ফলাফলঃ দীপান্বিতা অমাবস্যায় ২৮ টি বা ১০৮ টি প্রদীপ দিয়ে বাড়ি সাজালে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয় শোক, দুঃখ, রোগ। শুধু তাই নয়। নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রদীপ দিয়ে বাড়ি সাজালে দারিদ্রতা নাশ হয়, শক্র বিনাশ হয়, ফেরে গৃহশান্তি।
প্রদীপ দানের রীতিঃ প্রদীপ দেওয়ার সময় কয়েকটি রীতি জেনে রাখা প্রয়োজন। যেমন প্রদীপ সরষের তেলে জ্বালানো উচিত। পাশাপাশি, একটি প্রদীপ থেকে অন্য প্রদীপে আলো জ্বালানো উচিত নয়। প্রদীপের মুখ কোনদিকে থাকবে? প্রদীপের মুখ এদিন অবশ্যই থাকবে উত্তরমুখী। শুধু তাই নয় , বাড়ির ৫ টি জায়গায় অবশ্যই রাখতে হবে প্রদীপ। বসার ঘর, পুজোর ঘর, বাড়ির যেকোনও গাছের নিচে দিতে হবে প্রদীপ, বাড়ির সদর দরজা, বাড়ির যেকোনও কোনে প্রদীপ দিয়ে সাজাতে হবে।

দীপাবলীতে লক্ষ্মী-গণেশের পুজোতে পদ্মফুলের মাহাত্ম্যঃ

দীপাবলীতে ঘরে ঘরে অলক্ষ্মীকে বিদায় জানাতে আরাধনা করা হয় লক্ষ্মী গণেশের৷ সেই পুজোতে পদ্মফুল ব্যবহার আবশ্যিক৷ এই ফুলটিকে ছাড়া দিওয়ালি পূজা কার্যত অসম্পন্ন৷ হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, এই বিষয়টি প্রচলিত৷ কিন্তু কেন প্রচলিত জানেন? ভগবান ব্রহ্মার সিংহাসনটি পদ্মফুল দিয়ে সাজানো৷ কথিত আছে, ধ্যানে বসার সময়ে এই সিংহাসনটিকে সাজানোর জন্য তিনি পদ্মফুলকেই বেছে নিয়েছিলেন৷ কথিত আছে, এই পদ্মফুল ভগবান বিষ্ণুর নাভি থেকে সৃষ্টি হয়েছে৷

এছাড়াও পদ্মফুলকে ঘিরে রয়েছে আরও অজানা বেশ কিছু সত্য ঘটনা৷ কাদামাটিতে এই পদ্মফুল জন্মায়৷ কিন্তু সেই নোংরা কাদামাটি কিন্তু পদ্মফুলকে স্পর্শ করতে পারেনা৷ এই ফুলটির সুবাসে বোঝাই দায় যে এই ফুলটি কোথায় জন্মায়৷ আপনার চারপাশে থাকা নেগেটিভ এনার্জি দূর হয়ে যায় এই ফুলের গুণে৷ আপনার চারপাশে থাকা নেগেটিভ মানুষ এবং নেগেটিভ কোনও শক্তি আপনার কোনও ক্ষতি করতে পারবেনা৷

লক্ষ্মী গণেশের পুজোয় পদ্মফুলের মাহাত্ম তো রইছেই৷ একইসঙ্গে বৌদ্ধধর্মেও এই ফুলটিকে ভীষণই পবিত্র হিসেবে মানা হয়৷ ভগবত গীতাতেও পদ্মফুলের গুনাগুণের কথা উল্লেখ রয়েছে৷ এটি সমস্তরকম লোভ, ঘৃণা, হিংসা, রাগ আপনার শরীর থেকে দূর করবে৷ কথিত আছে, পদ্মফুলেই জন্মেছিলেন নাকি লক্ষ্মী ঠাকুরও৷

দীপাবলির সপ্তাহে এই সাত কাজে ঘোর অমঙ্গল, জেনে নিয়ে বিরত থাকুন

দীপাবলি যেমন আলোর উৎসব তেমনই আনন্দেরও উৎসব। এই সময় কিছু কাজ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। শাস্ত্রমতেই এমনটা বলা হয়েছে। এই ৭ কাজ জেনে নিন
দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা: শাস্ত্রমতে দীপাবলির সপ্তাহে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা অনুচিত। সূর্যোদয়ের আগে শয্যাত্যাগ করা উচিত। তা না করলে মা লক্ষ্মীর কৃপা থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
বড়দের অসম্মান করা: শাস্ত্রে গুরুজনদের সর্বদাই সম্মান করতে বলা হয়েছে। কিন্তু দীপাবলির আগে-পরে বড়দের প্রতি অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন করা প্রয়োজন। না হলে দেবরোষের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ঘরদোর অপরিষ্কার রাখা: শাস্ত্র মতে, মা লক্ষ্মী এমন একজন দেবী যিনি অপরিচ্ছন্নতা কোনও মতেই সহ্য করতে পারেন না। কাজেই যদি লক্ষ্মীর কৃপালাভ করতে হয়, তা হলে দীপাবলির সময় ঘরের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী হোন।
মেজাজ খারাপ করা: কোনও কারণে আপনি মেজাজ খারাপ করলে বা মাথা গরম করলে তার কুপ্রভাব পড়ে আপনার আশপাশে সকলের উপরে। ফলে তাঁদের আনন্দেও ভাটা প়ড়ে। এই কারণে দেবতারা আপনার উপরে রুষ্ট হন। কাজেই দীপাবলি পর্বে মেজাজ ঠান্ডা রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সন্ধ্যায় ঘুমনো: আপনি যদি অসুস্থ হন কিংবা গর্ভবতী হন তা হলে আলাদা, নতুবা দীপাবলির আগে-পরে কয়েকদিন সন্ধ্যাবেলা না ঘুমনোই ভাল। সন্ধ্যাবেলা ঘুমোলে তার ফলে দারিদ্র্য ও দুর্ভাগ্য দেখা দেয় বলে মনে করছে শাস্ত্র।
ঝগড়া বা বিবাদ: দীপাবলির সময়ে অন্যদের সঙ্গে ঝগড়া বা বিবাদে জড়িয়ে পড়া একেবারেই অনুচিত। নিজেকে খুশি রাখার পাশাপাশি অন্যদের আনন্দকে সুনিশ্চিত করাও আপনার কর্তব্য, এমনটাই শাস্ত্রীয় উপদেশ।
নেশা করা: দীপাবলির সময়ে মদ্যপান কিংবা ধূমপান করার কাজ দেবী লক্ষ্মীকে রুষ্ট করে। তাতে আপনার আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দেয়। কাজেই দীপাবলির সপ্তাহে কোনও রকম নেশা করা থেকে বিরত থাকুন।

দীপাবলিতে রাশি অনুযায়ী গ্রহের কিছু প্রতিকার সম্বন্ধে জেনে নিন

দীপাবলি অর্থাৎ আলোর উৎসব। অমাবস্যার অন্ধকার রাতে চারিদিকে আলোর ঝলকানি। এই দীপাবলির শুভ দিনে অর্থ ভাগ্য তথা জীবনে সুখ, শান্তি, সাফল্য বজায় রাখতে রাশিগত ভাবে বিশেষ কিছু প্রতিকার জেনে নেব। জীবনে সুখ শান্তি ফিরে পেতে ঘরে ঠাকুরের সামনে ঘি-এর প্রদীপ জ্বালিয়ে, প্রদীপের তলায় আতপ চাল রাখুন। এই ভাবে সারা রাত প্রদীপটি জ্বালিয়ে রাখতে হবে।

মেষঃ দীপাবলির রাতে লাল চন্দন ও কেশর এক সঙ্গে বেটে চার ইঞ্চি বাই চার ইঞ্চি নতুন সাদা কাপড়ের ওপর ওই বাটা বস্তুটি রেখে দিন। ১০৮ বার মন্ত্র বলে উজ্জীবিত করে ওই কাপড়টি সর্বদা নিজের কাছে রেখে দিন। মন্ত্র— ‘ওঁ ঐং ক্লীং স্বঃ’ ।
বৃষঃ দুটো ঘি-এর প্রদীপ জ্বালান। প্রদীপ দুটির শিখাগুলো পরস্পরের সঙ্গে স্পর্শ করিয়ে মিলিয়ে রাখুন। প্রদীপের নিচে গম বা আটা রাখুন। ১০৮ বার মন্ত্র বলুন। মন্ত্র–‘ওঁ ঐং ক্লীং শ্রীং।
মিথুনঃ কাঁচা হলুদ গণেশ ও লক্ষ্মীর চরণে ছুঁইয়ে সবুজ কাপড়ে মুড়ে এমন জায়গায় রাখুন যাতে সারা বছর সরাতে যেন না হয়। ১০৮বার মন্ত্র বলুন। মন্ত্র–‘ওঁ ঐং ক্লীং স্বঃ’।
কর্কটঃ একটি নতুন ত্রিকোণ হলুদ কাপরে নিচের মন্ত্রটি লাল কালিতে লিখে, ১০৮ বার বলে ক্যাশ বাক্সে বা আলমারিতে রেখে দিন। মন্ত্র -‘ওঁ ঐং ক্লীং শ্রীং’।
সিংহঃ মৌলী নিয়ে হাতের কব্জিতে ছ’পাক ঘুরিয়ে বেঁধে নিন ও রোজ সকালে এটিকে নমস্কার করুন। মন্ত্র—ওঁ হ্রীং শ্রীং স্বঃ । ১০৮বার বলুন।
কন্যাঃ মন্ত্র— ‘ওঁ শ্রীং ঐং স্বঃ’ মন্ত্রটি ১০৮বার বলুন। তারপর আতপ চালের মিষ্টি ভাত বানান এবং তাতে অল্প হলুদ দিন। এই ভাতটিকে ছাদে রাতে রেখে দিন যাতে সকালে কাক খেতে পারে।
তুলাঃ মেটে সিঁদুর ও ঘি মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করে সেটি দিয়ে একটি বট পাতায় মন্ত্রটি লিখুন, এবং ঠাকুরের আসনে রেখে দিন। পরে গঙ্গায় বা পুকুরে দিয়ে দেবেন। মন্ত্র–‘ওঁ হ্রীং ক্লীং শ্রীং’।
বৃশ্চিকঃ ‘ওঁ ঐং ক্লীং স্বঃ’ মন্ত্রটি সাদা চন্দন কেশর বেটে বট গাছের পাতায় লিখে গঙ্গায় বা পুকুরে ফেলে দিন, সেদিন ফেলতে না পারলে পরের দিন ফেলুন। পাতাটি ঠাকুরের আসনে রেখে দিন।
ধনুঃ ১১টি পান পাতায় মেটে সিঁদুর ও ঘি দিয়ে ‘শ্রী শ্রী’ লিখে পানের ওপর পদ্ম ফুলের ১টি করে বীজ রাখুন, এবং লাল কাপরে মুড়ে ক্যাশ বাক্সে রেখে দিন।
মকরঃ একটি অশ্বত্থ পাতায় সাদা চন্দন দিয়ে ‘শ্রীং’ মন্ত্রটি লিখুন। তারপর সাদা কাপরে মুড়ে ক্যাশ বাক্সে রেখে দিন। মন্ত্র- ‘ওঁ ঐং ক্লীং শ্রীং’। ১০৮বার বলুন।
কুম্ভঃ একটি বট পাতায় ভাল করে লাল চন্দন লাগিয়ে, পাতাটিকে সাদা সুতো দিয়ে বেঁধে আলমারিতে রেখে দিন। মন্ত্র–‘ওঁ ঐং ক্লীং শ্রীং’। ১০৮ বার বলুন।
মীনঃ সাদা চন্দন ও হলুদ গুড়ো মিশিয়ে, একটি পান পাতার ওপর ‘ হ্রীং শ্রীং হ্রীং’ মন্ত্রটি লিখে, পাতাটি হলুদ কাপড়ে মুড়ে ক্যাশ বাক্সে রেখে দিন।

দীপাবলিতে দুর্ভাগ্য-অর্থ সংকট কাটিয়ে তুলুনঃ

দীপাবলি ঘিরে আলোর রোশনাইয়েরই শুধু উদযাপন হয় না, এই উদযাপন হয় মনের অন্ধকারকে দূর করার জন্যও। যাবতীয় অলক্ষ্মী দূর করে শান্তি, স্বস্তি, সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠান আয়োজন হয় দীপাবলিতে। তবে অনেক সময়ই শান্তি বা সমৃদ্ধি বিঘ্নিত হয় আর্থিক সংকটের কারণে। দেখে নেওয়া যাক কোন রাশির জাতকরা কীভাবে দীপাবলি পালন করলে তা উপযুক্ত হবে।
মেষঃ মেষ রাশির জাতকরা এই দিন আলমারির লকারে রেখে দিতে পারেন চন্দন বা কিছুটা কেশর। তবে সাদা কাপড়ে মুড়ে তা রাখতে হবে।
বৃষঃ বৃষ রাশির জাতকদের এদিন দুটি প্রদীপ জ্বালানোর পরামর্শ দিচ্ছেন জ্যোতিষশাস্ত্ররা। এই ঘিয়ের প্রদীপের সামনেই নিজের মনের ইচ্ছা জানাতে বলছেন জ্যোতিষবিদরা।
মিথুনঃ মিথুন রাশির জাতকরা দীপাবলির দিন একটি নারকোল ফাটিয়ে তা লাল কাপড়ে বেঁধে রাখুন বাড়ির কোনও উঁচু জায়গায়। অন্যদিকে
কর্কটঃ কর্কট রাশির জাতকরা দীপাবলির দিন যদি ত্রিকোণ কোনও পতাকা বিষ্ণুর সামনে স্থাপন করতে পারেন , তাহলে তা শুভ ফল দেবে।
সিংহঃ সিংহ রাশির জাতকদের জন্য একটি ঘিয়ের প্রদীপ এই দিন রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন জ্যোতিষবিদরা।
কন্যাঃ কন্যা রাশির জাতকরা যদি টাকা সঞ্চয়ের দিকে মন দিতে চান, তাহলে নারকেলের দুটি অংশ লাল কাপড়ে মুড়ে কোনও লকারে রাখতে পারেন। এমনই পরামর্শ দিচ্ছেন বাস্তুশাস্ত্রবিদরা।
তুলাঃ তুলা রাশির জাতকরা এই সময়ে অর্থ সংকট থেকে মুক্তি পেতে চাইলে দীপাবলির দিন মা লক্ষ্মীর পায়ে পদ্ম অর্পণ করুন।
বৃশ্চিকঃ বৃশ্চিক রাশির জাতকরা যেকোনও মন্দির চত্বরে কলাগাছ পুঁতে দিতে পারেন।
ধনুঃ ধনু রাশির জাতকরা যদি টাকা সঞ্চয়ের দিকে মন দিতে চান, একটি ঘিয়ের প্রদীপ এই দিন রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন জ্যোতিষবিদরা।
মকরঃ মকর রাশির জাতকরা এই দিন দিন যদি ত্রিকোণ কোনও পতাকা বিষ্ণুর সামনে স্থাপন করতে পারেন , তাহলে তা শুভ ফল দেবে।
কুম্ভঃ কুম্ভ রাশির জাতকরা দীপাবলির রাতে নারকেলের মধ্যে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালাতে পারেন। এতে অর্থ সম্পত্তি বাড়বে বলে মনে করা হয়।
মীনঃ মীন রাশির জাতকরা দীপাবলির দিন যদি নিষ্ঠা ভরে লক্ষ্মীর আরাধনা করেন তাহলে তাঁদের অর্থ উত্তোরোত্তর বাড়বে, বলে দাবি অনেক জ্যোতিষশাস্ত্রবিদের।

দীপাবলির রাতেই লক্ষ্মীলাভ কোন উপায়ঃ

বাড়িতে লক্ষ্মীর আগমন নিশ্চিত করতে অনেকেই বেশ কিছু দিন ধরে প্রস্তুতি নেন। ঘর ঝাড়পোছ করে সাফসুতরো করেন। সনাতন শাস্ত্র অবশ্য কিছু সংকেতের উল্লেখ করেছে, যাকে শুভ মনে করা হয়। দীপাবলির রাতে অর্থাগমের ইঙ্গিত পেতে পারেন আপনিও। কিছু প্রাণী এইদিন প্রত্যক্ষ করলে লক্ষীলাভ নিশ্চিত বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এই চার ঘটনা আপনার সঙ্গে ঘটলে বুঝবেন দীপাবলির রাতে আপনার ঘরে লক্ষ্মী এল:
লক্ষ্মীপ্যাঁচার দর্শনঃ দ্বীপান্বিতা আমাবস্যার দিনে লক্ষ্মীপ্যাঁচা দেখলে সারাবছর অর্থাগমের সুযোগ থাকে।
বেড়ালের দুধ খাওয়াঃ এই দিন ঘরের পোষ্য বেড়াল যদি দুধ খায় তবে তা সাক্ষাৎ মা লক্ষ্মীর আগমনের সংকেত।
টিকটিকির ডাকঃ শাস্ত্র মতে, দীপাবলির দিন টিকটিকি দেখা বা তার ডাক শোনা শুভ সংকেত।
ইঁদুর-দর্শনঃ দীপাবলির দিন ঘরে মেঠো ইঁদুর বা ছুঁচো দেখতে পাওয়াও শুভ সংকেত বলে মনে করেন অনেকে।

দীপাবলিতে বাড়িতে মেনে চলুন বাস্তুর কয়েকটি পরামর্শ

দীপাবলিতে ভাগ্য ফেরাতে অনেকেই অনেক কিছু করেন। নতুন জিনিস কেনা, প্রিয়জনকে উপহার দেওয়া, মিষ্টিমুখ করানোর মতো রীতি তো অনেকেই পালন করেন। কিন্তু বাস্তু মতে, বাড়ির ভিতরে কয়েকটি ছোট পরিবর্তন দীপাবলিতে ভাগ্য ফেরাতে খুবই সাহায্য করে।

‘মহাবাস্তু’ বইয়ের লেখক বাস্তু গুরু খুশদীপ বনশলও দীপাবলিতে ভাগ্য ফেরানোর জন্য কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন। একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকে সেই নরকমই চারটি পরামর্শের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

• বাড়ির উত্তর-পূর্ব দিকটি পরিষ্কার করতে হবে। বাড়ির ওই অংশে যাতে কোনও লাল রংয়ের বস্তু না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
• বাড়ির পশ্চিম দিকে মা লক্ষ্মী এবং শ্রী গণেশের রুপোর মূর্তি রাখলে প্রতিবন্ধকতা দূর হবে, আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি হবে।
• বাড়ির উত্তর দিকে সবুজ রংয়ের ফুলদানিতে টাটকা ফুল রাখুন।

দীপাবলীতে অতিথি আপ্যায়ণ করুন মিষ্টি দিয়ে

যাঁরা নতুনত্বের পূজারী তাঁরা এবারের দীপাবলি উদযাপন করুন ফিউশন মিষ্টি দিয়ে। দীপাবলি প্রায় দোড়গোড়ায়আলোর উৎসবে মিষ্টি মাস্টফিফশন ডেজার্ট দিয়ে এবার অতিথি আপ্যায়ন করুন। জুতা-পাতলুন-টুপি যে দেশেরই হোক ক্ষতি নেই। কিন্তু দিল হিন্দুস্থানি হতেই হবে। যদিও এখন উৎসবে-অনুষ্ঠানে সবকিছুই মিলেমিশে একাকার। তারই ছোঁয়া পোশাকে, খাবারেও। ইন্দো-ওয়েস্টার্নের মিলিজুলিতে ফিউশন গানে, পোশাকে, মিষ্টিতেও। যাঁরা নতুনত্বের পূজারী তাঁরা এবারের দীপাবলি উদযাপন করুন ফিউশন মিষ্টি দিয়ে। অতিথিকে তাক লাগান গুলাব জামুন চিজ কেক, হট পনীর সন্দেশ পুডিং, জাফরান-ইলাইচি পান্নাকোট্টা, গুলকান্দ কাপকেক, ওয়াইল্ড বেরিস অ্যান্ড ল্যাভেন্ডার ক্ষীর দিয়ে। আমন্ত্রিত খুশি, আপনার মুখে হাসি, দীপাবলির রোশনাই দ্বিগুণ—সব মিলিয়ে উৎসবের মৌতাত জমজমাট।

৫ ফিউশন মিষ্টিতে বাজিমাত
১. গুলাব জামুন চিজ কেক রেসিপিঃ দেশির সঙ্গে বিদেশি, আধুনিকতার সঙ্গে আভিজাত্য যদি এক সুরে বাঁধা পড়ে তাহলেই যেকোনও জিনিস হয়ে ওঠে শিল্প। হতেই পারে সেটা খাবার। যেমন, গুলাব জামুন চিজ কেক। গুলাব জামুনের মিষ্টত্ব আর চিজ কেকের স্বাদ এক হয়ে জন্ম দেয় এই বিশেষ মিষ্টির। ওপরে গোলাপের পাপড়ি, তবক জড়ালেই কেয়াবাত।
২. হট পনীর সন্দেশ পুডিং রেসিপিঃ তাজা ফ্রুট সস আর ছানার যুগলবন্দি। তাই দিয়ে ছানার পুডিং। ওপরে বাদাম আর স্ট্রবেরির টপিং। ডিশ পুরো চেটেপুটে সাফ।
৩. জাফরান-ইলাইচি পান্নাকোট্টা রেসিপিঃ শেষ পাত জমাতে ওস্তাদ পান্না কোট্টা। এলাচ-জাফরান মেশানো এই মিষ্টি এবার থাক দীপাবলির স্পেশ্যাল রেসিপিতে।
৪. গুলকান্দ কাপকেক রেসিপি রেসিপিঃ দুধে চিনি মিশিয়ে জ্বাল দিয়ে ঘন করে নিন। গোলাপজল ছড়িয়ে দিতে ভুলবেন না। এবার কাপ কেকের খোপে কেকের ওপরে ঢেলে ফ্রিজে ঠাণ্ডা করতে দিন। ওপরে ক্রিম দিয়ে গোলাপ ফুল এঁকে দিতে পারেন। জমে গেলে পরিবেশন করুন। জমজমাট টিফিন টাইম। পাবেন কাপ কেকের স্বাদ মিষ্টিতে।
৫. ওয়াইল্ড বেরিস অ্যান্ড ল্যাভেন্ডার ক্ষীর রেসিপিঃ বেরি আর ল্যাভেন্ডারের গন্ধ-স্বাদ এবার ভারতীয় পায়েসে। বেরির রস মেশান পায়েস নামানোর আগে। ল্যাভেন্ডার ছড়িয়ে দিন ওপরে। চেনা রেসিপি নতুন স্বাদে ধরা দেবে অতিথি আপ্যায়নে।

দীপাবলিতে মিষ্টি কেন খেতে হবে?

দীপাবলি উদযাপনের অন্যতম বড় অংশ হল নানা ধরনের মিষ্টি। সব ধরনের দীপাবলির মিষ্টি খাওয়া সম্পূর্ণ সুস্থ বিষয়। বাড়ির তৈরি লাড্ডু, হালুয়া এবং বরফি দীপাবলি উদযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং তাই আমাদের অবশ্যই এগুলি খাওয়া, প্রস্তুত করা শিখতে হবে এবং নতুন প্রজন্মের সাথেও ঐতিহ্য অনুযায়ী এই মিষ্টি তৈরির কৌশল বা জ্ঞান ভাগ করে নিতে হবে।

স্থানীয় মিষ্টির দোকান থেকে দীপাবলির মিষ্টি কিনুন

আপনার এলাকার স্থানীয় মিষ্টি বিক্রেতাদের কাছ থেকে আপনি লাড্ডু, বরফি ইত্যাদি মিষ্টি পেতে পারেন। দুপুরের খাবারের অংশ হিসাবেও মিষ্টি খাওয়া হয় দীপাবলিতে। সাধারণত থালার একেবারে মাঝে মিষ্টি রাখা হয়। ঐতিহ্যগতভাবে এবং সাংস্কৃতিকভাবে দীপাবলি উদযাপন করার এটাই পন্থা।

দীপাবলিতে মিষ্টিতে চিনি বেশি থাকলে কী করণীয়?

দীপাবলিতে ডায়াবেটিক মানুষ চিনির কথা চিন্তা করেই মিষ্টি খাওয়া এড়িয়ে যান। রক্তের চিনির মাত্রার ভারসাম্যের কথা ভেবেই তাঁরা উৎসবের বড় একটা অংশ থেকে নিজেদের দূরে রাখেন। বাড়িতে বানানো ঐতিহ্যগত মিষ্টিগুলি এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে এগুলিতে গ্লাইসমিক সূচক স্বাভাবিকভাবেই কম। এভাবে, ডায়াবেটিকরা বাড়িতে বানানো মিষ্টি খেতে পারে কারণ এটি রক্তে চিনির মাত্রা স্থিতিশীল রাখে।
অন্য খাবারের কম খেয়ে মিষ্টি দিয়ে পেট ভরানোর কথা না ভাবলেও চলবে। সাধারণত ৩ বা ৪ দিন ধরে চলে দীপাবলির উদযাপন। সুতরাং নিশ্চিন্তে মিষ্টি খান জমিয়ে।

অন্যান্য ধর্মালম্বীদের দীপাবলীঃ

শিখ ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য

এই বিশেষ দিনে শিখ ধর্মগুরু হরগোবিন্দজি যিনি স্বেচ্ছায় এক বছরের মতো সময় ধরে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কারাগারে বন্দী ছিলেন তিনি মুক্তি পান।তবে তিনি নিজের মুক্তির পরেও কারাগার ত্যাগ করে যেতে অস্বীকার করেন এবং শর্ত রাখেন তার সঙ্গে আরও যে ৫২টি হিন্দু রাজাকে মুঘল সম্রাট বন্দী করে রেখেছে তাদেরও মুক্তি দিতে হবে।মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর তার এই শর্ত মেনে নেন এবং তার সাথে ৫২জন হিন্দু রাজদেরও মুক্তি দেন এই বিশেষ দিনে।তাই এই দিনটি শিখ ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি স্মরণীয় দিন।তারা এই দিনটি মহা ধুম ধামের সঙ্গে” বন্দী ছোড় দিবস” হিসাবে পালন করে।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে

এই বিশেষ দিনে বুদ্ধদেব নির্বাণ লাভের জন্য তার গৃহ ত্যাগ করেছিলেন বলে অনেকেই মনে করেন।আর তাই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এই দিন প্রদীপ জ্বালিয়ে বা মোমবাতি জ্বালিয়ে বুদ্ধদেবকে স্মরণ করা হয়।

জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে

এই বিশেষ দিনে ৫২৭অব্দে জৈন ধর্মের প্রচারক এবং প্রবর্তক মহাবীর নির্বাণ বা মোক্ষ লাভ করেন।তাই এই দিনটি জৈন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা প্রদীপ বা মোমবাতি জ্বালিয়ে আলোক সজ্জা করেন।

এছাড়াও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনেকে মনে করেন পিতৃ পুরুষগণ এইদিনে যম লোক ছেড়ে স্বর্গলোকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন আর তাই তাদের যাত্রাপথের অন্ধকার দূর করার জন্য প্রদীপ এবং ফটকা এবং রং মশাল জ্বালানো হয়। এছাড়াও অনেক জায়গায় ফসল উৎপাদনের উৎসব হিসাবেও পালন করা হয়।

শুধুমাত্র ভারত বর্ষেই নয়, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, মায়ানমার, মরিশাস, নেপাল, গায়ানা, সিঙ্গাপুর, সুরিনাম, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং ফিজিতেও দেওয়ালিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ভারত বর্ষের বাইরে ইংল্যান্ডের লেস্টার শহরে সবচেয়ে বড় দেওয়ালি উৎসব পালিত হয়। তাই জাতি ধর্ম দেশ বর্ণ নির্বিশেষে আসুন মেতে উঠি আজকের শুভ দীপাবলি উৎসবে এবং সকল প্রকার ধার্মিক গোঁড়ামি এবং সাম্প্রদায়িক শক্তিকে হারিয়ে সংহতি এবং ভাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তুলি এই উৎসবের মাধ্যমে। সকলকেই জানাই “বাংলা পঞ্জিকা”র পক্ষ থেকে দীপাবলির আন্তরিক শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন।