জিতা

ত্রেতাযুগে চম্পক নগরে এক ধার্মিক ব্রাহ্মণের সুভদ্রা নামে এক কন্যা ছিল। একবার রাজ্যে খুব অকাল বৃষ্টি দেখা দিল, রাজা ঘোষণা করলেন, তার বাবার শ্রাদ্ধের জন্য যে আতপ চাল তৈরী। করে দেবে, তাকে তিনি একটি সোনার তাল পুরস্কার দিবেন।

কিন্তু কেউ সাহস করলো না, শুধু সেই ব্রাহ্মণ কন্যা সুন্দ্রা রাজী হলো। সে উপবাসী থেকে ভক্তিসহকারে সূর্যের আরাধনা করতে লাগলো। সূর্যদেব তার স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বর দিলেন আর তার ঘরে কিরণ দান করলেন। তার ফলে চাল তৈরী, হলো। সুন্দ্রা রাজাকে চাল দিয়ে সোনার তাল নিল।

এদিকে ঘটলো এক দৈব ঘটনা। সুন্দ্রার রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে সূর্যদেব তার দেহে তেজ দান করলেন। তার ফলে সুভদ্রার গর্ভে একটি ছেলে জন্মাল। দশ মাস দশ দিন পরে ছেলেটি চার হাত, তামার মতো গায়ের রং, মাথায় জটা আর কানে জ্যোতির্ময় কুণ্ডল নিয়ে ভূমিষ্ঠ হলো। তার নাম হলো জীমূতবাহন।

ছেলেটি বড় হয়ে তার বাবাকে দেখার জন্য বায়না ধরলো। তখন সুভদ্রা ছেলের হাত ধরে সূর্যদেব যে পথে উদয়গিরি যান সেই পথে গিয়ে দাড়ালো। সূর্যের রথ আসতেই মা ও ছেলে রথ টেনে ধরলো। সূর্যদেব ধ্যানে সব জেনে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন-বস জীমূতবাহন।

জগতের সকলে আশ্বিন মাসে কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমীতে, বিশেষ করে মেয়েরা তোমার পূজা করবে বটমূলে, প্রাঙ্গণে বা দেব মন্দিরে। যে নারী আগের দিন হবিষ্যি করে ব্রতের দিন উপবাসী থেকে শুদ্ধাচারে তোমার পূজা করবে তার ছেলে-পলে অকালে মরবে না। সুন্দ্রাকেও বললেন— সতী। পুত্রের সঙ্গে লোকে তোমারও পূজা করবে। এবার ঘরে ফিরে। যাও। এই বলে সূর্যদেব চলে গেলেন।

জিতাষ্টমী

একটা বটগাছের নীচে ইন্দ্রের মা অদিতি জীমূতবাহনের পূজা করছেন, এমন সময় সেই গাছে যে লকনি বাস করতো। সেও দেখাদেখি পূজা করলে। তাই দেখে এক শিয়ালী বললে — সই। তুমি কি করছো? শকুনি বললে-জীমূতবাহনের পূজা করছি। এই ব্রত করলে ছেলেমেয়ে দীর্ঘজীবী হয়। ব্রতের দিন উপোস থাকতে হয়।

শিয়ালী সব শুনে উপবাসী রইলো, সারাদিন কাটার পর সে আর থাকতে না পেরে প্রথম প্রহরে মাছ খেয়ে ফেললে। দ্বিতীয় প্রহরে কতকগুলো পোকা-মাকড় খেয়ে ফেললে। তৃতীয় প্রহরে সে যখন মড়ার মাংস খাচ্ছে, তাই দেখে শকুনি রেগে বললে-পাপিনী! খিদে সহ্য করতে পারবি না যদি ব্ৰত কেন? নিয়েছিলি? এর শাস্তি পাবি।

jitaastomi

এরপর শিয়ালীর এক বছরের মধ্যে যতগুলি সন্তান হলো, সব মরে গেল। শকুনির ছেলেগুলি সব বেঁচে রইলো। তাই দেখে শিয়ালী রাগে হিংসায় জ্বলতে লাগল। শকুনি বুঝতে পেরে শিয়লীকে বললে-জীমূতবাহনের অপমান করার ফলে তোমার এই অবস্থা। তাই শুনে শিয়ালী ক্রোধে শনিকে মারতে যেতেই একটি গুরম ক্ষারসিদ্ধ জলের কড়াইতে পড়ে গিয়ে শিয়ালী আর শকুনি দুইজনেই মরে গেল। ধোপা নদীতে ভাসিয়ে দিল।

দৈব ঘটনায় সেই ক্ষারসিদ্ধ জলে দুটি পদ্মফুল জন্মালো। একটি নীল আর একটি শ্বেতপদ্ম। ফুল দুটি ভাসতে ভাসতে কর্নাট রাজ্যে এলো। সেই সময় কর্নাটের রানী প্রভাবতী ও পাত্র পত্নী কুমুদ্বতী নদীতে স্নান করছিল। তারা দুটি ফুল ধরে খেয়ে ফেললো ফলে তারা গর্ভবতী হলো। যথাসময়ে তাদের দুই জনের দুটি মেয়ে হলো। রানীর মেয়ের নাম চম্পাবতী আর পাত্র পরীর মেয়ের নাম মনোরমা। বড় হয়ে তাদের দুই জনের খুব ভাব হলো।

jitaastomi

কিন্তু এ জন্মে শিয়ালী হলো চম্পাবতী আর শকুনি মনোরমা হয়ে জন্মাল। একসময় কনকগড়ের রাজার সঙ্গে চম্পাবতীর আর পাত্রের ছেলের সঙ্গে মনোরমার বিয়ে হলো। কিছুদিনের মধ্যে দুই জনেরই দুটি। ছেলে হলো, কিন্তু চম্পাবতীর ছেলেটি হঠাৎ মারা গেল।

এই রকম আরও কয়েকবার হলো। চম্পাবতীর খুব হিংসা হলো। চুপি চুপি সে মনোরমার ছেলেদের নাক কেটে কামরাঙা বলে মনোরমার কাছে পাঠিয়ে দিল। মনোরমা তখন জীমূতবাহনের পূজা করছিল। সে কামরাঙা ভেবে জীবমূতবাহকে নিবেদন করতেই তার। ছেলেদের আগের মতো নাক হলো।

তারপর একদিন চম্পা মনোরমার ছেলেদের এক একটি অঙ্গ কেটে পাঠাতে লাগল। কিন্তু জীমূতবাহনের কৃপায় সব কাটা অঙ্গ জোড়া লেগে গেল। চম্পাবতী বার বার চেষ্টা। করে মনোরমার কোন ক্ষতি করতে না পেরে অবশেষে নিজে আত্মহত্যা করতে গেল।

এদিকে শিব-পার্বতী সব দেখছিলেন, পার্বতী বললেন প্রভু ওকে বাঁচিয়ে দাও। যতই হােক, আত্মহত্যা মহাপাপ। পার্বতীর অনুরোধে মহাদেব ছদ্মবেশে চম্পাবতীর কাছে এসে বললে—বাছা তুমি আত্মহত্যা কোর না। এটা খুবই পাপ কাজ।

তুমি আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে উপবাসী থেকে জিতাষ্টমী ব্রত কর, তোমার ছেলে দীর্ঘজীবী হবে। শুনে চম্পাবতী ঘরে ফিরে এলো আর হিংসা ভুলে খুব ভক্তি সহকারে জিতাষ্টমী ব্রত করলে। তার ফলে তার অনেকগুলো ছেলে দীর্ঘজীবি হলো। তারপর সমস্ত সুখভোগ করে দেহান্তে স্বর্গলাভ করলো।

যে নারী আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমীতে ভক্তি সহকারে, জিতাষ্টমী ব্রত করে, সে অনেক দীর্ঘজীবী সন্তান লাভ করে। পূজা শেষে রাত্রি জাগরণ ও পরদিন পারণ করতে হয়।

—অথ জিতাষ্টমী ব্রতকথা সমাপ্ত।