জগন্নাথদেবের রথযাত্রা

গত আলোচনায় রথযাত্রার ইতিহাস সম্পর্কে নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। সেখানে আমরা জেনেছিলাম কিভাবে মালবর রাজ ইন্দ্রদ্যুম্নের হাত ধরে এই রথযাত্রার সূচনা হয়েছিলো। আজ আমরা রথ নিয়ে জানানোর চেষ্টা করব।

রথ ছাড়া রথযাত্রা আমদের কল্পনাতীত!

একটা রথের বিভিন্ন অংশ থাকে। সংক্ষেপে আমরা সেগুলোর সাথে আগে পরিচিত হয়ে নেই। রথ যে নির্মান করেন তাকে বলা হয় রথকর। আর যে রথ চালনা করে তাকে বলা হয় রথযুক। রথের চাকা কে বলা হয় রথচরন। পুরীতে যে রথ উৎসব হয় সেখানে প্রধানত তিনটি রথ থাকে। আসুন জেনে নেয়া যাক সেই রথ তিনটি সম্পর্কে।

তালধ্বজ

প্রথমে যাত্রা শুরু করে বড় ভাই বলভদ্রের রথ। এই রথের নাম তালধ্বজ। এই রথের উচ্চতা ৪৩ ফুট ৩ ইঞ্চি। চাকা ১৪টি। পরিধি ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি। অশ্ব কালো রঙের। চারটি অশ্বের নাম যথাক্রমে ত্রিব্রা,  ঘোরা, দীর্ঘশর্মা  এবং স্বর্ণাভা। বলভদ্রের রথের সারথির নাম মাতলি। রথ যে রশির সাহায্যে টানা হয় সেই রশির নাম বাসুকিনাগ এবং রথের উপরে যে পতাকা রয়েছে তার নাম উন্নয়নী। জগন্নাথের রথের পতাকার নাম ত্রৈলোক্য মোহিনী। 

দর্পদলন

এরপরেই যাত্রা যাত্রা করে বোন সুভদ্রার রথ। সুভদ্রার রথের নাম দেবদলন। রথের উচ্চতা ৪৩ ফুট ৩ ইঞ্চি। এতে থাকে বারোটি চাকা চাকার পরিধি ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি। এতে থাকে রথের রং কালো এবং লাল। রথের অশ্ব লাল রঙের। চারটি অশ্বের নাম যথাক্রমে রোচিকা, মোচিকা, জিতা এবং অপরাজিতা। সুভদ্রার সারথির নাম অর্জুন। সুভদ্রার রথের রশির নাম স্বর্ণচূড় নাগিনী। সুভদ্রা রথের পতাকার নাম নদাম্বিকা। 

নন্দীঘোষ

সর্বশেষে থাকে শ্রী কৃষ্ণ বা জগন্নাথদেবের রথ। রথটির নাম নন্দীঘোষ। পতাকায় কপিরাজ হনুমানের মূর্তি আঁকা রয়েছে তাই এই রথের আর একটি নাম কপিধ্বজ। রথের সারথির নাম দারুকা। এই রথের উচ্চতা ৪৪ ফুট ২ ইঞ্চি। রথে  থাকে ১৬ টি চাকা। চাকার পরিধি ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি। অশ্বের রং সাদা। চারটি অশ্বের নাম যথাক্রমে নাম শঙ্খ, বলাহক, শ্বেতা এবং হরিদশ্ব। জগন্নাথের রথের রশির নাম শঙ্কচূড়।

এছাড়াও এই পবিত্র রথযাত্রাকে ঘিরে ভক্তদের মাঝে নানা লোকবিশ্বাস , কাহিনী প্রচলিত আছে।

জগন্নাথদেবের রথযাত্রা

যেমন-

১. জগন্নাথ প্রতিবছর নব রথে উঠে। নব মানে নতুন আবার নব মানে নববিধা ভক্তি। মানে ভক্তির রথে জগন্নাথ উঠে। ভক্তি দিয়ে গড়া রথ।

২. পুরীর রথ চলার সময় রাস্তায় চাকার তিনটি দাগ পড়ে – তা হল গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী। যারা বার্ধক্যজনিত কারণে বা অন্যান্য কারণে রথের দড়ি ধরতে পারেন না, তারা যদি চাকার এই তিনটি দাগের ধুলি গ্রহণ করেন, বা এই ত্রিদাগে গড়াগড়ি দেন, তাহলে গঙ্গা – যমুনা – সরস্বতীতে অবগাহনের ফল লাভ করেন।

৩. সম্পূর্ণ রথ শুধুমাত্র কাঠের তৈরি, ফলে রথ চলার সময় কাঠের কড়কড় শব্দ হয়, এটিকে বলা হয় বেদ।

৪. সম্পূর্ণ রথ শুধুমাত্র কাঠের তৈরি, ফলে রথ চলার সময় কাঠের কড়কড় শব্দ হয়, এটিকে বলা হয় বেদ। ২০৬ টি কাঠ দিয়ে জগন্নাথের রথ হয়। ঠিক আমাদের দেহেও ২০৬ টি হাড়।

৫. পুরীতে, রথের সময় এমন কোনো বছর নেই যে সময় রথের দিন বৃষ্টি হয়নি।

৬. কোনো রকম আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়াই রথ নির্মাণ করা হয়। বর্তমান সময়ের এত উন্নত প্রযুক্তির বিন্দুমাত্র সহায়তা নেওয়া হয় না রথ নির্মাণে।

৭. রথ নির্মাণের নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য মাপগুলো হাতে নেওয়া হয়, কোনো গজ ফিতের সাহায্যে নয়। কোনো প্রকার পেরেক, নাট বল্টু, ধাতু- কিছুর ব্যবহার নেই এখানে।

৮. প্রায় চৌদ্দশ’ কর্মী রথ নির্মাণ করেন। এখানে কাউকে আলাদা করে নিয়োগ করতে হয় না, কেননা সেই আদিকাল থেকে বংশপরম্পরায় যারা রথ তৈরি করে আসছিলো, তারা আজও রথ তৈরি করে যাচ্ছে।

৯. রথ তিনটিতে বলরাম, সুভদ্রা এবং জগন্নাথের মূর্তি থাকে ভেতরে, যা নিমকাঠ দিয়ে তৈরি এবং প্রায় ২০৮ কেজি সোনা দিয়ে সজ্জিত।

১০. রথ নির্মাণে যে সমস্ত কাঠ ব্যবহার করা হয়, তার উৎস হলো পুরীর কাছেই দাশপাল্লা ও রানাপুর নামের দুটি জঙ্গল। যে পরিমাণ গাছ কাটা হয়, তার দ্বিগুণ পরিমাণ গাছ প্রতি বছর রোপণও করা হয় জঙ্গলে।

১১. রথ যখন চলে প্রথমে থাকে বলদেবের রথ। কারণ বলদেব দাদা। আবার জগত গুরুতত্ত্ব। তিনিই তো নিত্যানন্দ । সবার জীবনে আগে গুরুকৃপা আসতে হবে। তারপর চলে সুভদ্রার রথ। সুভদ্রা হল ভক্তি তত্ত্ব। গুরুকৃপার পর আসে ভক্তিমহারাণী। কারণ ভক্তির ঠিকানা শ্রীগুরুপদে। “শ্রীগুরুচরণপদ্ম কেবল ভকতিসদ্ম। বন্দো মুই সাবধান মতে।” গুরুদেব হল ভগবানের করুনার মুর্তি। তারপর যায় জগন্নাথের রথ। প্রথমে গুরুদেব, তারপর ভক্তি, তারপর ভগবান জগন্নাথ।

১২. রথের দর্শনে শ্রী চৈতন্যমহাপ্রভু নৃত্য করছেন। অপলক নয়নে দর্শন করছেন জগন্নাথ। রথ চলতে চলতে মাঝে মাঝে থেমে যায়। এর কারন রাধা ভাবে বিভোর মহাপ্রভুকে ভাল করে দেখার জন্য রথ একটু থামে আবার চলে। অনেক ভক্তের মাঝে মহাপ্রভুকে না দেখে জগন্নাথ থেমে যায়। রথ অপ্রকৃতি কারন তা প্রভু জগন্নাথের ইচ্ছা শক্তিতে রথ চলে।

এই ছিলো এবারের আয়োজন।

প্রথমপর্বঃ জগন্নাথদেবের রথযাত্রার এসব ইতিহাস আপনি জানেন কি?-পর্ব ১

সূত্রঃ

১. সোনেলা ব্লগ

২. নিউজবাজার২৪.কম

৩. রোর.মিডিয়া