কোজাগরী শব্দটি এসেছে ‘কো জাগর্তি’ থেকে, যার অর্থ ‘কে জেগে আছো?’। এই পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী বরদান করার উদ্দেশে জগৎ পরিক্রমা করে দেখেন, কে নারকেল জল পান করে সারারাত জেগে আছেন ।

কথিত, দেবী এও বলে থাকেন,’আজ রাতে যে ব্যক্তি জেগে থেকে পাশাখেলা করবে তাকে আমি ধনবান করব ।’ তাই ভক্তিপূর্ণ চিত্তে এদিন লক্ষ্মীর পুজো করার পরে প্রথমে বালক, বৃদ্ধ ও আতুরদের আহার করাতে হয় ।

পরে ব্রাহ্মণ ও বন্ধুবান্ধবদের নারকেল জল ও চিঁড়ে আহার করিয়ে তবে তা নিজে গ্রহণ করতে হয় । বলা হয়, জগৎ শেঠ অল্প বয়সে বিদ্বান হয়ে উঠলে দিল্লীশ্বরের কানে তা পৌঁছয় । তিনি তাঁকে দেখতে চান ।

এরপর জগৎ শেঠ দিল্লি গেলে রাজা তাঁর কথাবার্তায় খুশি হয়ে তাঁকে দিল্লিতে থাকতে বলেন । জগৎ শেঠও দিল্লিতে থেকে যান । কিছুদিন পরে রাজা তাঁকে বলেন, তোমার উপর আমি অত্যন্ত প্রীত । তুমি যা চাইবে আমি দান করব ।

তখন জগৎ শেঠ বাড়ি ফিরে মাকে সব বলেন । বুদ্ধিমতী জননী পুত্রের মঙ্গলের জন্য বলেন, আগে রাজাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করিয়ে নিয়ে তারপর জানাতে যে কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে দিল্লিতে কোনও গৃহস্থ বাড়িতে যেন আলো না জ্বালায় ।

রাজার নির্দেশে ওই রাতে কেউ আলো জ্বালালো না । জগৎ শেঠের মা ঘি-এর প্রদীপ জ্বেলে ঘর আলো করে দরজা খুলে বসে থাকল । যথাসময়ে দেবী এলেন এবং বললেন, আমি খুব পরিশ্রান্ত । আমাকে একটু আশ্রয় দেবে ?

জগৎ শেঠের মা দেবীর ছলনা বুঝতে পারলেন । তিনি দেবীকে ঘরে আশ্রয় দিলেন এবং বললেন, আমি নদীতে স্নান করতে যাচ্ছি । ফিরে না আসা অবধি আপনি এখানে থাকুন । দেবী তাতে রাজি হলেন ।

এবার জগৎ শেঠের মা নদীতে স্নান করতে গিয়ে প্রাণত্যাগ করলেন । ফলে সেদিন থেকে দেবী জগৎ শেঠের ঘরে থেকে গেলেন । আজও ধন সম্পদের দেবী লক্ষ্মীকে পাওয়ার জন্য গৃহস্থ বাড়িতে সারারাত ঘি-এর প্রদীপ জ্বালানো হয় । তবে ছেলেরা অনেকেই ওই রাতে জুয়া (পাশার পরিবর্তে) খেলে থাকেন ।

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন বাংলার ঘরে ঘরে শঙ্খধ্বনি মুখরিত সন্ধ্যায় লক্ষ্মীর আরাধনা হলেও ভারতের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে লক্ষ্মীপুজো হয় দীপাবলির সন্ধ্যায়। গবেষকদের মতে, বাংলার কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে রয়েছে কৃষি সমাজের গভীর প্রভাব। অবশ্য তার প্রমাণও মেলে পুজোর উপকরণ আর আচার অনুষ্ঠানে।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে আলপনা। পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে লক্ষ্মীপুজোর আলপনাতেও দেখা যায় আঞ্চলিকতার প্রভাব। এখনও গ্রামাঞ্চলে ঘরের দরজা থেকে দেবীর আসন, ধানের গোলা পর্যন্ত আলপনায় ছোট ছোট পায়ের ছাপ দেওয়া হয়।

পুজো হয় মূলত প্রতিমা, সরা, নবপত্রিকা কিংবা কলার পেটোর তৈরি নৌকায়। একে বলে বাণিজ্যের নৌকা কিংবা সপ্ততরী নৌকা। লক্ষ্মী সরাও হয় নানা রকম, যেমন ঢাকাই সরা, ফরিদপুরি, সুরেশ্বরী এবং শান্তিপুরী সরা।

নদিয়া জেলার তাহেরপুর, নবদ্বীপ এবং উত্তরচব্বিশ পরগনার বিভিন্ন স্থানে লক্ষ্মীসরা আঁকা হয়। তবে আঞ্চলিকতা ভেদে লক্ষ্মী সরায় তিন, পাঁচ, সাত পুতুল আঁকা হয়। এতে থাকে লক্ষ্মী, জয়া বিজয়া সহ লক্ষ্মী, রাধাকৃষ্ণ, সপরিবার দুর্গা ইত্যাদি।

ফরিদপুরের সরায় দেবদেবীরা সাধারণত একটি চৌখুপির মধ্যে থাকেন। আবার সুরেশ্বরী সরায় উপরের অংশে মহিষমর্দিনী আঁকা হয় আর নীচের দিকে থাকেন সবাহন লক্ষ্মী।

কৃতজ্ঞতাঃ oneindia