কার্তিক পূজা হিন্দুদের একটি পুজো। কার্তিক হল হিন্দু যুদ্ধদেবতা। দেবাদিদেব মহাদেব শিব ও দশভুজা দুর্গার আদরের ছোট পুত্র কার্তিক। গণেশ তাঁর দাদা। তবে কোনও কোনও পুরাণে কার্তিককে বড় এবং গণেশকে ছোট পুত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নিয়ে নানা মতপার্থক্যও আছে। কার্তিক বৈদিক দেবতা নন; তিনি পৌরাণিক দেবতা।

ব্রহ্মার বরে মহাবলী তারকাসুরের নিধনের জন্যই নাকি অমিত বিক্রম যোদ্ধা কার্তিকের জন্ম হয়েছিল। কেউ বধ করতে পারছিলনা তারকাসুরকে। তার অত্যাচারে দেবকুল অতিষ্ঠ । আর দৈববলে অজেয় শক্তি সম্পন্ন এই দেবশিশু কার্তিকেয় তারকাসুর নিধন করেছিলেন । আর এই তারকাসুর নিধন করে দেবকুলে কার্তিক গেলেন দেবসেনাপতি। তাই কার্তিকের পুজো হয় মহাসমারোহে। দেবতারূপে কার্তিক একসময়ে সারা ভারতীয় উপমহাদেশেই খুব জনপ্রিয় ছিলেন। ভারতীয় পুরাণগুলির মধ্যে স্কন্দ পুরাণে কার্তিকের বিষয়ে সবিস্তারে লেখা আছে। তাছাড়াও মহাভারতে এবং সঙ্গম তামিল সাহিত্যে কার্তিকের নানা বর্ণনা রয়েছে। ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে বারোটি হাত যুক্ত কার্তিকের একটি অভিনব মূর্তি রক্ষিত আছে।

 

কার্ত্তিকেয় পূজা ফর্দ

সিন্দুর, গুরু, পূজক ও আচার্য্য বরণ ৩, বরণাঙ্গুরীয়ক ৩, যজ্ঞোপবীত ১০, তিল, হরিতকী ১, পঞ্চগুড়ি, পঞ্চশস্য, পঞ্চরত্ন, পঞ্চপল্লব ১, বরণডালা, ঘট ১, কুণ্ডহাড়ি ১, একসরা আতপ তণ্ডুল, দৰ্পণ ১, তেকাঠা ১, সশীষ ডাব ১, তীর ৪, ঘটাচ্ছাদন গামছা, পুষ্প প্রভৃতি, আসনাঙ্গুরীয়ক ৬, মধুপর্কের বাটী ৬, ঘৃত, মধু, দধি, নৈবেদ্য ও কুচা নৈবেদ্য ৪ হিঃ চন্দ্ৰমাল্য ৪ তীর-ধনুক ১, লৌহ, খঙ্গ ১, কার্তিকেয় পূজার ধুতি ৪, ময়ূর পূজার ধুতি ১, বিষ্ণুপূজার ধুতি ১, থালা ৪, ঘটি ৪, পুষ্পমাল্য ৪, খেলনা ১, ভেটা বা ভাড় ১, মাদুর ১, বালিশ ১, বালি, কাষ্ঠ, গব্যঘুত আধ সের ; খােড়কে, হােমের বিল্বপত্র ১০৮ বা ২৮, ভােজ্য ৪, ভােগের দ্রব্যাদি, রচনা ৪, পূর্ণপাত্র ১, দক্ষিণা।

 

কার্তিক ব্রত

পূর্ববঙ্গে সন্তানবতী মায়েরা পালন করতেন এই ব্রত; এখনও এপার-ওপার বাংলার বহু নারী এই ব্রত করেন কার্তিক সংক্রান্তিতে। ব্রতের প্রধান অঙ্গ কার্তিকের প্রতিমা পুজো। সায়ংকালে শুরু হয় পুজো — চার প্রহরে চারবার পুজো আর কথা শ্রবণ; অশক্ত হলে একবারই পুজো এবং প্রাতঃকালে বিসর্জন, যদিও পূর্ববঙ্গে প্রতিমা জলে দেওয়ার নিয়ম নেই। লোকমানসে মূলত সন্তান কামনায়, বিশেষত পুত্র সন্তান কামনায় বন্ধ্যা নারীরা ভক্তিভরে এই দেবতার পুজো করেন। কার্তিকের একাধিক মূর্তি পূজিত হয়। পুজোর শেষে সন্তানহীনা নারী এক-একটি কার্তিক মূর্তি কোলে নিয়ে ঘরে খিল এঁটে দেয়। অনেক সময় সংক্রান্তির আগের রাতে পাড়ার অত্যুত্‍সাহী যুবকেরা নৈশ গোপনতায় নবদম্পতির দুয়ারে কার্তিকের মূর্তি রেখে আসে; উদ্দেশ্য অপুত্রক দম্পতিকে কার্তিক পুজোয় বাধ্য করানো। শুদ্রকের ‘মৃচ্ছকটিক’ নাটকে দেখা যায় কার্তিক ‘চোরের দেবতা’ ইমেজে পূজিত হচ্ছেন। ‘কথাসরিতসাগর’-এর কার্তিকও চোরের দেবতারূপে চিহ্নিত। লোকবিশ্বাস, কার্তিক সিঁধ কাটার বিভিন্ন পদ্ধতির উদ্ভাবক। বাংলার অনেক অঞ্চলে বারবণিতাদের হাত ধরে কার্তিক পুজোর প্রচলন হয়েছে।

এই কার্তিক পুজোর মনস্তাত্ত্বিক কারণ তিনটি– প্রথম, ‘আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক’ — এরকম একটা হৃদয়ের ব্যাকুলতা; দ্বিতীয়, অনাস্বাদিত মাতৃত্বের স্বাদ মেটাতে ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো’র প্রচেষ্টা। তৃতীয়, কার্তিককে ভ্রূণের দেবতারূপে মান্যতা দিয়ে আকস্মিক ভ্রূণ উত্‍পাদন বন্ধ করতে বারবণিতারা কার্তিক পুজো করেন। লোকসমাজে কার্তিক শস্য দেবতাদের অন্যতম। তাই বাংলার অনেক অঞ্চলে কৃষি দেবতাকে এইদিন পুজো করা হয়। সারারাত ধরে গাওয়া হয় গান। ফসলের কীটশত্রু, জীবজন্তু তাড়িয়ে দেওয়াই গানের মূল বিষয়। পুজোর পর মূর্তিটি বিসর্জন না দিয়ে শস্যক্ষেত্রে রেখে দেওয়া হয় শস্য রক্ষাকর্তা হিসাবে। কার্তিক ব্রতে কার্তিক প্রতিমার পাশে রাখা হয় ‘হালা’। হালা হচ্ছে মাটির সরায় মাটিতে লাগানো নানান শস্য চারা। সম্ভবত কার্তিক কৃষি দেবতা বলেই এই সরার শস্যক্ষেত্র। অনেক সময় উঠোনে মন্ডল করে তার চারপাশে চারা তৈরি করেও মাঝখানে কার্তিক প্রতিমা রাখা হয়। পুজোর ঘট ছাড়াও প্রতিমার সামনে কতকগুলো ছোটো ঘট রেখে তাতে চাল ও ফল দেওয়া হয়।

 

কার্তিকের মন্ত্র ও পরিচিতি

কার্ত্তিক দেবতার ধ্যান :

ওঁ কার্ত্তিকেয়ং মহাভাগং ময়ুরোপরিসংস্থিতম্।
তপ্তকাঞ্চনবর্ণাভং শক্তিহস্তং বরপ্রদম্।।
দ্বিভুজং শক্রহন্তারং নানালঙ্কারভূষিতম্।
প্রসন্নবদনং দেবং কুমারং পুত্রদায়কম্।।
অনুবাদ : কার্ত্তিকদেব মহাভাগ, ময়ূরের উপর তিনি উপবিষ্ট। তপ্ত স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল তাঁর বর্ণ। তাঁর দুটি হাতে শক্তি নামক অস্ত্র। তিনি নানা অংলকারে ভূষিত। তিনি শত্রু হত্যাকারী। প্রসন্ন হাস্যোজ্জ্বল তাঁর মুখ।

 

প্রণাম মন্ত্র :

ওঁ কার্ত্তিকের মহাভাগ দৈত্যদর্পনিসূদন।
প্রণোতোহং মহাবাহো নমস্তে শিখিবাহন।
রুদ্রপুত্র নমস্ত্তভ্যং শক্তিহস্ত বরপ্রদ।
ষান্মাতুর মহাভাগ তারকান্তকর প্রভো।
মহাতপস্বী ভগবান্ পিতুর্মাতুঃ প্রিয় সদা।
দেবানাং যজ্ঞরক্ষার্থং জাতস্ত্বং গিরিশিখরে।
শৈলাত্মজায়াং ভবতে তুভ্যং নিত্যং নমো নমঃ।
 

অনুবাদ : হে মহাভাগ, দৈত্যদলনকারী কার্ত্তিক দেব তোমায় প্রণাম করি। হে মহাবাহু, ময়ূর বাহন, তোমাকে নমস্কার। হে রুদ্রের (শিব) পুত্র, শক্তি নামক অস্ত্র তোমার হাতে। তুমি বর প্রদান কর। ছয়। কৃত্তিকা তোমার ধাত্রীমাতা। জনক-জননী প্রিয় হে মহাভাগ, হে ভগবান, তারকাসুর বিনাশক, হে মহাতপস্বী প্রভু তোমাকে প্রণাম। দেবতাদের যজ্ঞ রক্ষার জন্য পর্তবতের চূড়ায় তুমি জন্মগ্রহণ করেছ। হে পর্বতী দেবীর পুত্র তোমাকে সতত প্রণাম করি।